অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, আইন-আদালতের দহলিজ পেরিয়ে গত বছরের জুলাইয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটি অব বাংলাদেশের (এনপিসি, বাংলাদেশ) নতুন সদস্যরা। দেশের অন্য ক্রীড়া ফেডারেশন-অ্যাসোসিয়েশনের মতো এনপিসি বাংলাদেশও চলছে অ্যাডহক কমিটির দ্বারা।
এনপিসির মহাসচিব ড. মারুফ আহমেদ মৃদুলের নেতৃত্বাধীন কমিটি এরই মধ্যে বেশ কিছু কাজ করেছে। তাদের অর্জনের খাতাটাও বিশাল। এশিয়ান প্যারা ইয়ুথ গেমস থেকে ৫টি পদক জেতা, দেশব্যাপী ক্রিকেটার খুঁজে ফ্যাজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ক্রিকেট দল বা জাতীয় দল গঠনসহ আর অনেক কাজ। সেসবের ফিরিস্তিসহ সময়ের আলোকে আরও অনেক বিষয়ে বলেছেন এনপিসি মহাসচিব ড. মারুফ আহমেদ মৃদুল।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সময়ের আলোর সিনিয়র রিপোর্টার মামুন হোসেন
সময়ের আলো : ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটির (এনপিসি, বাংলাদেশ) ইতিহাসে ডিসেম্বরে এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমস থেকে সবচেয়ে বড় সাফল্য আপনাদের কমিটির হাত ধরে এলো। এ ব্যাপারে কী বলবেন?
মারুফ আহমেদ মৃদুল : গত ৭-১৪ ডিসেম্বর দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত হয় এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমস। সেখানে বাংলাদেশ তিনটি স্বর্ণ এবং দুটি ব্রোঞ্জ পদক জেতে। এটি নিঃসন্দেহে অনেক বড় অর্জন, বিশাল প্রাপ্তি। বিশ্বের ৪৫টি দেশ সেখানে অংশ নেয়। এটি শুধু আমাদের কমিটির নয়, বাংলাদেশের প্যারালিম্পিক কমিটির ইতিহাসে সেরা অর্জন। ইন্টারন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কিংবা এশিয়ান প্যারালিম্পিকের মাধ্যমে যে গেমসগুলোতে বাংলাদেশ আগে অংশ নিয়েছিল সেখানে কোনো অর্জন ছিল না। এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসের মাধ্যমে প্রথমবার বিশ্বদরবারে সাফল্যের পদচিহ্ন আঁকেন আমাদের প্যারা অ্যাথলেটরা।
সময়ের আলো : এত বড় অর্জনের পরও সরকারের তরফ থেকে কোনো সংবর্ধনা কিংবা সম্মাননার আয়োজন দেখলাম না। অথচ আগে ছোট আসরে সাফল্য আনলেও সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে প্যারা অ্যাথলেটদের উৎসাহিত করা হতো। এবার না হওয়ার কারণ কী?
মারুফ আহমেদ মৃদুল : আমরা সরকারের কাছে বারবার বলেছি। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কেও অবহিত করেছি। কিন্তু এর মধ্যে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ চেঞ্জ হয়ে গেলেন। এনএসসি থেকে বলা হয়েছিল পদকজয়ী অ্যাথলেটদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে। আমরা ওয়েট করছিলাম যে, জাতীয় পর্যায় থেকে যেন কোনো কিছু দেওয়া হয়। এখন এনএসসি এবং ক্রীড়া মন্ত্রণালয় যদি আয়োজন করতে না পারে তা হলে আমরাই স্পেশালি ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটি প্ল্যান করছি যে, আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে নিয়ে ছোট্ট পরিসরে হলেও পদকজয়ী অ্যাথলেটদের সংবর্ধনার ব্যবস্থা করব।
সময়ের আলো : ২০২৩ সালে প্যারা শাটলাররা জাপান থেকে পদক জেতার পর প্যারা ব্যাডমিন্টন দলকে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপান রাষ্ট্রদূত তার বাসভবনে ডেকে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন, মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা করেছিলেন। আগের কমিটির মতো আপনার কমিটির সঙ্গেও কি জাপানসহ অন্য দেশের সেই সম্পর্ক রয়েছে?
মারুফ আহমেদ মৃদুল : জাপানসহ অন্য দেশের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক বলবৎ আছে। বরং বলতে পারেন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। এই প্রথম জাপান প্যারা ব্যাডমিন্টন এবং জাপান দূতাবাস মিলে বিশেষ করে মিৎসুবিশি করপোরেশন আমাদের সাত দিনের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। সেখানে সবচেয়ে আধুনিক এবং মানসম্পন্ন ট্রেনিংয়ের সুযোগ পেয়েছিল আমাদের প্লেয়ার-কোচরা।
সময়ের আলো : অতীতে আমরা প্রতিবন্ধী অ্যাথলেটদের দেখেছি নানান বিষয়ে আন্দোলন করতে, এনপিসির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে, দলাদলিতে জড়াতে। তারা মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত ছিল। তাদের কাউন্সিলের জন্য কিংবা মানসিক-শারীরিক উন্নতির জন্য আপনার কমিটির কোনো পরিকল্পনা আছে কি না?
মারুফ আহমেদ মৃদুল : আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে সাইকোলজিতে অনার্স-মাস্টার্স এবং স্পেশাল এডুকেশনে মাস্টার্স করেছি। পিএইচডি করেছি ডিজঅ্যাবিলিটি স্পোর্টসের ওপর। ২০০০ সাল থেকে আমি প্রতিবন্ধীদের অর্থাৎ বিশেষ চাহিদা সম্পন্নদের নিয়ে ফিল্ডে কাজ করছি। স্পেশাল অলিম্পিকসের চিফ কো-অর্ডিনেটরও ছিলাম। তা ছাড়া আমার আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইন্ডিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মাস্টার্স বা অন্যান্য ডিজঅ্যাবিলিটি রিলেটেড ট্রেনিং আছে। আমি অবশ্যই মনে করি তাদের মেন্টাল সাপোর্ট ভীষণ জরুরি। এর পাশাপাশি সাামাজিক এবং মানসিকভাবে যদি পরিপূর্ণ সহায়তা দেওয়া যায়, তা হলে তারা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। দেশের জন্য আরও গৌরব ও সম্মান বয়ে আনতে পারবে।
সময়ের আলো : জাতীয় নির্বাচনে পর ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটির নির্বাচন। সে সম্পর্কে জানতে চাই?
মারুফ আহমেদ মৃদুল : আমরা আইপিসি মানে ইন্টারন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটি এবং এশিয়ান প্যারালিম্পিক কমিটির কনস্টিটিউশন অনুযায়ী চলি। আমরা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) একটি অনুমোদিত সদস্য ফেডারেশন এবং জাতীয় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় অধীনস্থ। আমাদের রুলস এবং কনস্টিটিউশন অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রথমে ইন্টারন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটি এবং এশিয়ান প্যারালিম্পিক কমিটির অনুমোদন লাগবে। পরবর্তীকালে ওই রুলস বা কনস্টিটিউশন অনুযায়ী আমাদের সবকিছু জমা দিতে হবে এনএসসিতে। আইপিসি এবং এপিসির রুলস মেনটেইন করে নির্বাচন আয়োজন করাই আমাদের বর্তমান অ্যাডহক কমিটি বলেন কিংবা মহাসচিব হিসেবে আমার কাজ হচ্ছে নির্বাচন আয়োজন করা। জাতীয় নির্বাচনের পরই আমরা সেই কাজে নেমে পড়ব।
সময়ের আলো : আপনি মহাসচিব হিসেবে দায়িত্বে আসার পর নতুন কী কাজ করলেন?
মারুফ আহমেদ মৃদুল : আমি চাইব যে ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক সবসময় এগিয়ে যাক। স্পেশালি প্রতিবন্ধী যারা ক্রীড়াবিদ আছেন, আমাদের যারা ন্যাশনাল ক্রীড়াবিদ আছেন তারা। আগে খেলার সংখ্যা কম ছিল। মাত্র ৮টি খেলা ছিল। আমি সেটা ১৫টি করেছি। আমি এবার তায়কোয়ান্দো যোগ করেছি, সামনে সিটিং ভলিবল তারপর বোচিয়া নামে একটা খেলা আছে সেটা চালু করব। যে ইভেন্ট থেকে পদক পাওয়ার সুযোগ আছে, সেগুলোকে আমরা দ্রুততর সময়ে অন্তর্ভুক্ত করব। এ ছাড়া গোলবলও করব। কারণ ব্লাইন্ডদের কোনো স্পোর্টস নেই। আমি গোলবল এবং ব্লাইন্ড ফুটবলটা এগিয়ে নিতে কাজ করব।
সময়ের আলো : বিগত সরকার প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়দের উন্নয়নে ১০ কোটি টাকার একটা ফান্ড দিয়েছিল। অনেকে সেটা ফ্যাজিক্যালি ক্রিকেট দলের টাকা বলে দাবি করেন? এ ব্যাপারে কী বলবেন?
মারুফ আহমেদ মৃদুল : প্রথম কথা হচ্ছে, ১০ কোটি টাকা ১০ কোটি টাকার জায়গাতেই আছে। বিগত সরকার টাকা ফ্যাজিক্যালি ক্রিকেট দলকে নয় এনপিসিকে দিয়েছি। এটার একটা চিঠির কপিও আমরা আপনাকে দিয়েছি। যেখানে স্পষ্ট লেখা আছে ওই টাকা কীভাবে, কোন খাতে খরচ করা যাবে। আমি প্রতিটি খরচের হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে চেক করি। আমাদের অডিট টিম আছে, সিইও আছে, এক্সিকিউটিভ অফিসার আছে। এক কাপ চা খেলে সেটার হিসাবও খাতায় টুকে রাখা হয়। আমি কারও সমালোচনা করতে চাই না, আগের কমিটির অনেক হিসাব কিন্তু আমরা বুঝে পাইনি। কিন্তু যে কেউ চাইলে আমাদের কমিটির হিসাব অফিসে এসে চেক করে যেতে পারেন। আমি সারা জীবন স্বচ্ছ থেকে কাজ করেছি, সততার সঙ্গে কাজ করেছি, ভবিষ্যতেও করব ইনশাআল্লাহ।
এফআর