বিহারিদের ভোট জয়-পরাজয় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন ঢাকা-১৬। রাজধানীর অন্য এলাকার মতো সংসদীয় এই আসনেও সমস্যার অন্ত নেই। বরাবরের মতো এবারও এসব

2026-01-31T01:58:18+00:00
2026-01-31T01:58:18+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
বিহারিদের ভোট জয়-পরাজয় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:৫৮ এএম   (ভিজিট : ১৮৯)
ফাইল ছবি
রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন ঢাকা-১৬। রাজধানীর অন্য এলাকার মতো সংসদীয় এই আসনেও সমস্যার অন্ত নেই। বরাবরের মতো এবারও এসব সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েই ভোটারদের ভোট চাইছেন প্রার্থীরা। তবে তাদের প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখতে পারছেন না অনেকেই।

চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অকেজো ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা ও মাদকসহ বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা-১৬ আসনের এলাকাগুলো। এখানে যেমন রয়েছে সুপরিকল্পিত সুউচ্চ ভবন, তেমনই প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো রয়েছে বেশ কিছু বস্তি ও বিহারি ক্যাম্প। রূপনগর, কালশী ও পল্লবী এলাকাজুড়ে যেন সমস্যার শেষ নেই। মাদক ও ছিনতাইয়ের পাশাপাশি অহরহই ঘটে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ঘটনা। তাই বরাবরের মতো এবারও নির্বাচনের মাঠে প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এসব সমস্যা সমাধানের।

আসনটিতে মোট ভোটারের উল্লেখযোগ্য একটি অংশের বসবাস বিহারি ক্যাম্পগুলোতে। নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী এ ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে পারেন ভোটের হিসেবে। 

পল্লবী ও রূপনগর থানার আওতায় পড়েছে এ আসনভুক্ত এলাকা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২, ৩, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৬ আসনটি। মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১ হাজার ১৬৮, নারী ভোটার ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩২৩ ও হিজড়া ভোটার ৮ জন।

রাজধানীর এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন দলটির ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আহ্বায়ক ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাবেক সেনা কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন। এ ছাড়া প্রার্থী হয়েছেন লাঙ্গল মার্কায় জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. সুলতান আহম্মেদ সেলিম, হাতপাখা মার্কায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাইফুল ইসলাম, আনারস মার্কায় বাংলাদেশ লেবার পার্টির মোয়াজ্জেম হোসেন, কাঁচি মার্কায় বাসদ (মার্কসবাদী) রাশিদুল ইসলাম, মুক্তিজোটের আব্দুল কাদের জিলানী, গণঅধিকার পরিষদের মো. মামুন হোসেন ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) মো. নাজমুল হক।

গত বুধবার সরেজমিন রূপনগর, পল্লবী ও দুয়ারীপাড়া ঘুরে দেখা যায়, বিএনপি-জামায়াতসহ অন্য প্রার্থীদের প্রচারে সরগরম এসব এলাকা। কোথাও মাইকে বাজছে দলীয় প্রতিশ্রুতি ও ভোট দেওয়ার আহ্বান। কোথাও প্রার্থীরা বিলি করছেন লিফলেট। কোথাও আবার দলবেঁধে কথা বলছেন ভোটারদের সঙ্গে। তবে সহাবস্থান বজায় রেখে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। এখনও এই আসনের কোথাও সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। এমনকি কিছু এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের পাশাপাশি নির্বাচনি ক্যাম্পও দেখা গেছে।

জামায়াতে ইসলামীর দুয়ারীপাড়া ইউনিটের সেক্রেটারি শেখ রিয়াদ হোসেনের সঙ্গে কথা হয় দুয়ারীপাড়া নির্বাচনি ক্যাম্পে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের দেওয়া আচরণবিধি মান্য করে সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছেন তারা। তবে প্রচার কার্যক্রমে কোথাও কোথাও প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নেতাকর্মীদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। 

রিয়াদ জানান, নির্বাচনের ব্যানার ও ফেস্টুনসহ অন্যান্য প্রচার কার্যক্রমে তুলনামূলক ব্যয় কমিয়ে এমনভাবে তারা ব্যয় করছেন যাতে ভোটারদের মন জয় করা যায়। এই আসনে জামায়াতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে যেন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ অনুভব করছেন তারা।

গত বৃহস্পতিবার জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ২ নম্বর ওয়ার্ড কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে নির্বাচনি সমাবেশ করেন। তবে কোনো চ্যালেঞ্জ অনুভব না করার কথা বলেছেন ঢাকা-১৬ আসনের বিএনপির নেতাকর্মীরা। 

রূপনগর থানা বিএনপির সদস্য রেজাউল করিম রেজা জানান, তাদের প্রার্থী আমিনুল হক এতটাই শক্তিশালী প্রার্থী যে তারা কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী বলেই মনে করছেন না।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী মো. রুবেল শিকদার বলেন, বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অবদান, বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুদৃঢ় নেতৃত্ব এবং ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থী আমিনুল হকের ক্লিন ইমেজ অন্য সব প্রার্থী থেকে তাদের এগিয়ে রেখেছে। তবে সামনের দিনগুলোতে যেই ক্ষমতায় আসুক তাকে জনগণের জন্য কাজ না করে টিকে থাকা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাবেক সেনা কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন সময়ের আলোকে বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায়। অতীতে সব সরকারের সময়েই ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতায় চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস হয়েছে কিন্তু জামায়াতে ইসলামী সবসময়ই এসবের বিরোধী। এ ধরনের কোনো অভিযোগ নেই আমাদের বিরুদ্ধে।

অন্য প্রার্থীদের তুলনায় নিজেকে কেন অধিক যোগ্য বলে মনে করছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ আছে। মানুষ এসব পছন্দ করে না। তার বিপরীতে নিজের ব্যক্তিত্ব ও ব্যক্তিগত সাধারণ জীবনযাত্রা ভোটারদের আকৃষ্ট করছে। সর্বোপরি মানুষ এখন পরিবর্তন চাচ্ছে। তাই ভোটের মাধ্যমে নীরব ভোট বিপ্লব হবে বলে মনে করেন তিনি।

প্রচার কার্যক্রমে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির পক্ষ থেকে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোথাও আমরা সমাবেশ করলে তার পাশ দিয়ে বিএনপি স্লোগান দেয়, কোথাও কোথাও ব্যানার লাগাতেও বাধা দিয়েছে।

এলাকার উন্নয়নে নিজের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, তার নির্বাচনি এলাকায় রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ সমস্যাসহ অনেক ধরনের সমস্যা আছে। তবে উন্নয়ন বাজেটের অপচয় না করলে খুব দ্রুতই এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে জানান তিনি।

জামায়াত কখনো টাকা দিয়ে ভোট কেনে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণ ভালোবেসে আমাদের ভোট দেয়। আমাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আসলে আমাদের জনপ্রিয়তায় একটি বড় দলের পক্ষ থেকে এসব অপপ্রচার করা হচ্ছে।

এই আসনে প্রায় ৫০ হাজার বিহারি ভোটারের বসবাস। এ ৫০ হাজার ভোট জয়-পরাজয় নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। দীর্ঘদিন মানবেতর জীবনযাপন করছে এসব ক্যাম্পগুলোতে বসবাসকারীরা। বসবাসকারীদের অভিযোগ- অতীতেও ভোটের আগে সবাই তাদের সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কিন্তু কেউ কথা রাখেননি।

উর্দু স্পিকিং পিপলস ইয়ুথ রিহ্যাবিলিটেশন মুভমেন্টের সভাপতি সাদাকাত খান বলেন, কেউ আমাদের খোঁজ রাখে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ কোনো মৌলিক অধিকারই আমাদের নেই। মাদকও এসব ক্যাম্পের আরকেটি বড় সমস্যা। দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাসীনরা সবসময় আমাদের সন্তানদের ব্যবহার করেছে। আর এসব সমস্যা সমাধান হবে একমাত্র স্থায়ী পুর্নবাসনের মধ্য দিয়ে। তাই এবারের নির্বাচনে যে প্রার্থী তার ইশতেহারে ক্যাম্পের বাসিন্দাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি রাখবেন তিনিই আমাদের ভোট পাবেন। এবার নির্বাচনে সব প্রার্থীই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এসব সমস্যা সমাধানে।

বিহারিদের সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল বাতেন বলেন, বিহারিরা ইচ্ছা করে এখানে আসেনি। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর তারা এখানে এসেছেন এবং তারা এখন বাংলাদেশেরই ভোটার। তাদের আবাসন সংকট নিরসনের জন্য কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। 

বিহারি ক্যাম্পের সমস্যা নিয়ে বিএনপি প্রার্থী আমিনুল হক বলেন, আগে অনেকেই ক্যাম্পে গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমি ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা সরকার গঠন করলে পর্যায়ক্রমে ক্যাম্পের বাসিন্দাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের কাজ শুরু করব। এটা করতে পারলে সেখানে অপরাধসহ অন্যান্য সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে।

বিএনপি প্রার্থী আমিনুল হক বলেন, এলাকার উন্নয়নে আমরা আমাদের সব কর্মপরিকল্পনা করে ফেলেছি। এর আগে আমি এলাকাবাসীর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করে তাদের সমস্যা ও চাওয়া শুনে তা নোট করেছি। আমি নির্বাচিত হলে ক্রমান্বয়ে সব সমস্যা সমাধানে কাজ করব। তিনি বলেন, আমি এই মিরপুরেই বড় হয়েছি। খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে এই এলাকার মানুষ বহুদিন ধরেই আমাকে চেনেন। রাজনীতিতে আসার পরও তাদের সেই ভালোবাসা ও সমর্থন পাচ্ছি। 

তিনি আরও বলেন, আমি ভ্রাতৃত্ববোধ, আন্তরিকতা ও ভালোবাসার রাজনীতি করতে চাই। সব মতের সবাই মিলেমিশে থাকবে। সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তবে সাধারণ ভোটাররা নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে বলে বিশ্বাস করছেন না। 

স্থানীয় রিকশাচালক, মো. হেলাল হাওলাদার বলেন, আমাদের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনো আশা নেই। ৫ আগস্টের আগে আড়াই হাজার টাকা দিয়ে রিকশার কার্ড নিতে হতো, নির্বাচনের পর আবারও নিতে হবে। মুখ চিনে দেবে সরকারি সাহায্য। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদের কথা অতীতেও আমরা বিশ্বাস করতাম না, এখনও করি না।

দুয়ারীপাড়ায় স্থানীয় এক চা বিক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি অফিসে আগে লাগত ঘুষ, এখন লাগে হাদিয়া। আমাদের দুর্ভোগ কখনোই শেষ হবে না। ফল বিক্রেতা ফজলু বলেন, যোগ্য মানুষ দেখে ভোট দিতে হবে কিন্তু সেই যোগ্য মানুষ কোথায়। কাকে বিশ্বাস করব আমরা। কেউ তো কথা রাখে না। কার জন্য ব্যবসা বন্ধ করে ভোট দিতে যাব।

এএডি/


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: