রাজাধানী ঢাকায় প্রায় আড়াই কোটি জনসংখ্যার শহরে পাবলিক টয়লেট অপ্রতুল। টয়লেট সংকটের কারণে প্রাকৃতিক কাজে নগরবাসী শিকার হন নানা বিড়ম্বনার। এতে করে অনেকেই রাস্তার পাশে, গাছের আড়ালে, এমনকি ফুটপাথেই প্রাকৃতিক কাজ সারেন। সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনার শিকার হন নারীরা। নগরীতে সচল পাবলিক টয়লেট রয়েছে ১৫০টি। এর বেশিরভাগই ব্যবহার অনুপযোগী। এতে প্রাকৃতিক কাজ না সারতে পেরে বিশেষ করে নারীরা বেশি রোগাক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি প্রজনন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে নারীদের।
বেসরকারি সংস্থা ওয়াটার এইডের তথ্যমতে, রাজধানী ঢাকায় প্রায় আড়াই কোটি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে বসবাসরত ও বহিরাগত মিলিয়ে প্রায় এক কোটি মানুষ প্রতিদিন বাড়ির বাইরে বের হন। কিন্তু তাদের প্রস্রাব-পায়খানার জন্য পর্যাপ্ত টয়লেট নেই। ঢাকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ ভাগ প্রতিদিন বাইরে যাতায়াত করে। এর মধ্যে ৫০ ভাগ ভাসমান মানুষ। প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করেন। শহরের মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় প্রায় দেড় লাখ মানুষের জন্য রয়েছে একটি পাবলিক টয়লেট। শহরের মোট ভাসমান মানুষ বিবেচনায় প্রায় ৭৫ হাজার মানুষের জন্য রয়েছে একটি টয়লেট।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ও উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) সূত্র মতে, মোট ৭০টি পাবলিক টয়লেট রয়েছে ডিএসসিসি এলাকায়। এর মধ্যে পরিত্যক্ত, নির্মাণাধীন, সংস্কারাধীন ও বন্ধ রয়েছে ২০টি। সে ক্ষেত্রে ৫০টি টয়লেট রয়েছে প্রাকৃতিক কাজে ব্যবহার উপযোগী। আরডিএনসিসিতে ১২০টি পাবলিক টয়লেট রয়েছে। এর মধ্যে পরিত্যক্ত, নির্মাণাধীন, সংস্কারাধীন ও বন্ধ রয়েছে ২০টি।
ডিএনসিসির ১২০টি পাবলিক টয়লেটের মধ্যে ১৭টি মোবাইল টয়লেট। আর ৪০টি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। দুই সিটিতে মোট মোট ১৯০টি টয়লেট রয়েছে। এর মধ্যে সচল পাবলিক টয়লেট রয়েছে ১৫০টি। আর অচল অবস্থায় রয়েছে ৪০টি। তবে ঢাকা উত্তরের সবগুলোতে নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকলেও ঢাকা দক্ষিণের অধিকাংশতে নেই।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থান যেমন বাস স্টপেজ, মার্কেট ও পার্কিং এরিয়াসহ যেসব স্থানে মানুষের বেশি প্রয়োজন সেখানে পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা খুবই কম। এর মধ্যে এয়ারপোর্ট, মিরপুর, ফার্মগেট, গুলশান-২, উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, খিলক্ষেত, ভাটারা, বাড্ডা, তেজগাঁও, রামপুরা, হাতিরঝিল, সদরঘাট, ভিক্টোরিয়া পার্ক ও গুলিস্তানসহ উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বেশ কয়েকটি জনবহুল এলাকায় পাবলিক টয়লেট রয়েছে। এগুলোতে ভেতরে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। এর মধ্যে দুয়েকটির অবস্থা স্বাস্থ্যকর থাকলেও বেশিরভাগেরই অবস্থা অস্বাস্থ্যকর। অধিকাংশ টয়লেটের পরিবেশই নোংরা, দুর্গন্ধ, যত্রতত্র মেঝের ওপর পানি, দেয়ালজুড়ে রয়েছে অশ্লীল কথা। কোথাও কোথাও আবার দেয়ালজুড়ে লেখা রয়েছে ফোন নম্বর, পানি ব্যবহারের পাত্র ভাঙা ও দরজা ভাঙা। ঢাকায় পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে নারীদের জন্য যে কয়েকটি টয়লেট আছে, সেগুলোর অধিকাংশই বন্ধ, নষ্ট বা এতটাই অস্বাস্থ্যকর যে ভেতরে ঢোকা মানেই যেন শাস্তি। ব্যবহারকারী শ্বাস বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। বিশেষ করে অফিসগামী নারী, পোশাকশ্রমিক, ট্রাফিক পুলিশ, পথশিশু, শিক্ষার্থী ও যানবাহন চালকরা চরম দুর্ভোগের শিকার হন।
ঢাকার পাবলিক টয়লেটগুলো সিটি করপোরেশন বেসরকারি পর্যায়ে ইজারা দিয়ে পরিচালনা করে থাকে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পাবলিক টয়লেটগুলো বিভিন্ন এনজিও ও ইজারার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হয়েছে পরিচালনার জন্য। কিন্তু সরকারি নজরদারি না থাকায় ইজারাদাররা বেশি টাকা আয়ের জন্য পাবলিক টয়লেটের পানি বিভিন্ন পানি ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করছে। অনেকেই আবার টয়লেটগুলোকে মাদক ব্যবসায়ীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। এগুলো মাদক ব্যবসায়ীদের লেনদেনের জন্যও নিরাপদ স্থান। কোথাও কোথাও পাবলিক টয়লেটের কাছেই গড়ে উঠেছে ছোট ছোট ভ্রাম্যমাণ টং দোকান। এতে টয়লেট ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হন নারীরা। অস্বাস্থ্যকর পাবলিক টয়লেট হলেও এর ব্যবহারকারীকে গুনতে হয় ৫ থেকে ১০ টাকা। কিন্তু নিম্ন আয়ের এবং ভবঘুরে ব্যক্তিরা টাকা খরচ করে পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে চান না।
স্থপতি ও নগর বিশেষজ্ঞ ইকবাল হাবিব বলেন, ঢাকার পাবলিক টয়লেট সংকট শুধু অপ্রতুল সংখ্যার সীমাবদ্ধতায় নয়, বরং পরিচ্ছন্নতার অভাব, স্থাপত্যিক দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বলতা ও মানবিক সৃজনশীলতার অনুপস্থিতিতে বিদ্যমান। একজন স্থপতি হিসেবে এটিকে দেখি গভীর নকশাগত দেউলিয়াত্ম ও মানবিক সৃজনশীলতার অনুপস্থিতি। পাবলিক টয়লেটগুলো কেন অধিকাংশই বিশ্রী, অন্ধকার ও ভীতিকর কংক্রিটের বাক্স? এগুলোর নকশায় প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের খেয়াল রাখা হয় না, ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা, প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীর সহজগম্যতা কিংবা একজন মায়ের জন্য শিশুর ডায়াপার পরিবর্তনের মতো ন্যূনতম মানবিক সুযোগও ভাবা হয় না।
জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক হাসিনাতুল জান্নাত বলেন, ঢাকায় পর্যাপ্ত টয়লেট না থাকা বা অস্বাস্থ্যকর হওয়ার কারণে অনেকেই দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব-পায়খানা চেপে রাখেন। এ কারণে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের রোগাক্রান্ত হচ্ছেন। টয়লেট চেপে রাখার কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন নারীরা। তবে সময়মতো টয়লেট ব্যবহার না করার কারণে শুধু নারীরাই নয়, পুরুষরাও নানাভাবে রোগাক্রান্ত হন। এতে মূত্রনালির সংক্রমণসহ নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি হয় ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন বা ইউটিআই, যাকে বলা হয় মূত্রনালির সংক্রমণ। এটা হয়ই বেশিক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখলে ব্লাডারে যে জীবাণু জন্মায় তা থেকে। যেমন বারবার যদি কারও ইউটিআই হয়, তা হলে তা নারীর প্রজনন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রস্রাবে ইউরিয়া এবং অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো টক্সিন জাতীয় পদার্থ থাকে। ফলে বেশিক্ষণ চেপে রাখার ফলে বিষাক্ত পদার্থ কিডনিতে পৌঁছে স্টোন তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া প্রস্রাব চেপে রাখার কারণে ব্লাডার ফুলে যেতে পারে। সে সঙ্গে কিডনিতে কোনো সমস্যা থাকলে নিয়মিত প্রস্রাব চেপে রাখলে ক্রমেই কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। এ জন্য রক্তের বিভিন্ন সংক্রমণসহ নানা ধরনের সংক্রমণ হতে পারে। কেবল টয়লেট চেপে রাখার কারণে শ্বাসকষ্ট এবং ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণও হতে পারে।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান বলেন, এই সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা অনেক কম। আবার যেগুলো আছে তার মধ্যে অনেকগুলো ব্যবহার উপযোগী না। এ জন্য সবারই স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়। আমরা বাড়িতে যেভাবে শৃঙ্খলা মেনে টয়লেট ব্যবহার করি, বাইরে গিয়েও সেই শিষ্টাচার বজায় রাখলে এই টয়লেটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ আরও সহজ হবে। এ জন্য শুধু কর্তৃপক্ষই দায়ী নয়, যারা টয়লেট ব্যবহার করবেন, প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সচিবালয়ের দেয়াল ঘেঁষে প্রাকৃতিক কাজ সারছিলেন এক পথচারী। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক কাজ সারার জায়গা না থাকলে তো রাস্তার পাশে, আড়ালেই করতে হবে। এতক্ষণ যানজটে বসে ছিলাম, এখানে নেমে কোনো পাবলিক টয়লেট না পেয়ে রাস্তার পাশেই কাজ সারতে হয়েছে।
আপনার অপর প্রান্তে পাবলিক টয়লেট রয়েছে সেখানে গেলেন না কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি জানতাম না। আর জানলেও যেতাম না। ওখানের যে অবস্থা। আবার প্রস্রাব করার জন্যও ৫ টাকা গুনতে হয়। গুলিস্তানে পবলিক টয়লেট ব্যবহারকারী সুমন সরকার বলেন, এখানে পাবলিক টয়লেট আছে জানতাম না। জ্যামে বসে থেকে টয়লেটে যাওয়া নিয়ে চিন্তা হচ্ছিল। পরে হাঁটতে গিয়ে টয়লেটের খোঁজ পেলাম। কিন্তু বাইরে থেকে দেখতে পাবলিক টয়লেট সুন্দর হলেও ভেতরের অবস্থা খারাপ। ভেতরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। সিটি করপোরেশন যদি এসব টয়লেট ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে তা হলে মানুষ টাকা খরচ করেও ব্যবহার করতে আগ্রহী হবেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ঢাকার পাবলিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা এখন আধুনিক করা হয়েছে। এতে সমাজের দায়িত্বশীল মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে একা সরকারের পক্ষে কাজ করা কঠিন। আমাদের উদ্যোগ আছে দুই সিটি করপোরেশনের সম্মিলিতভাবে ঢাকা শহরে ৬৫০টি স্থানে আধুনিক টয়লেট নির্মাণ করার। তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় টয়লেটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে যারা দায়িত্বরত ও যারা ব্যবহার করছেন, প্রত্যেককেই সচেতন হতে হবে।
এএডি/