ইরানমুখী মার্কিন বিমানবাহী রণতরী পাঠানোকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পাল্টা জবাবে আগামীকাল থেকে হরমুজ প্রণালীতে সশস্ত্র মহড়া চালানোর ঘোষণা দিয়েছে ইরান। এর প্রতিক্রিয়ায় ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজের আশপাশে কোনো সন্দেহজনক তৎপরতা বরদাস্ত করা হবে না।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, হুমকি ও চাপের পরিবেশে কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। তবে ন্যায়সংগত ও সম্মানজনক সংলাপের জন্য তেহরান প্রস্তুত। উত্তেজনার মধ্যেই রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
ইরানকে চাপে রাখতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পারস্য উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একের পর এক যুদ্ধজাহাজ ও নৌবহর পাঠানো হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। সর্বশেষ ইসরায়েলের ইলাত বন্দরে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি বহুমুখী মিসাইল ডেস্ট্রয়ার জাহাজ ভিড়েছে। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে ইসরায়েলি বন্দরে এই যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।
এর মধ্যেই শুক্রবার ট্রাম্প দাবি করেন, সম্ভাব্য মার্কিন হামলা এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করতে আগ্রহী তেহরান। এ জন্য ইরানের নেতৃত্বকে নির্দিষ্ট সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন তিনি। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক অভিযান চালানো হবে কি না, এ প্রশ্ন এড়িয়ে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের কাছাকাছি অবস্থান করা মার্কিন নৌবহর ভেনেজুয়েলায় মোতায়েন করা নৌবহরের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও বৃহৎ। ট্রাম্পের ভাষায়, ইরান অভিমুখে পাঠানো যুদ্ধজাহাজগুলো অত্যন্ত ক্ষমতাধর।
এদিকে চলমান উত্তেজনার মধ্যে তুরস্ক সফর করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি জানান, ধারাবাহিক হুমকির পরিবেশে কোনো সংলাপে বসবে না তেহরান। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ন্যায়সংগত আলোচনায় তারা প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
আরাঘচির মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা প্রশ্নে ইরান আপস করবে না এবং এ বিষয়ে অন্য কোনো দেশের হস্তক্ষেপ অগ্রহণযোগ্য। উত্তেজনা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ন্যায়ভিত্তিক সংলাপই একমাত্র পথ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে আঙ্কারা তেহরান ও ওয়াশিংটনকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরাতে চেষ্টা করছে। তবে তুরস্কের অভিযোগ, ইসরাইল ইচ্ছাকৃতভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলায় উসকানি দিচ্ছে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যে রাশিয়াও ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখছে। শুক্রবার মস্কোতে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন।
অন্যদিকে, ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)–কে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করায় ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এর মূল্য দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের বিচার বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা। এর জবাবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া হবে।
সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হামলার প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি ইরানের ভেতরেও বাড়ছে সংকট। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের ফলে দেশটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১০ লাখের বেশি অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, লেনদেন কমেছে প্রায় ৮০ শতাংশ। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা।
/ইউএমএইচ