‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ বাদ’- আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) এক সিদ্ধান্ত এখন গড়াচ্ছে অলিম্পিক রাজনীতির ময়দানে। বাংলাদেশের সঙ্গে ক্রিকেট সম্পর্কের ভাঙন শুধু টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেই নয়, বরং ভারতের ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের স্বপ্নেও বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। খেলাধুলার রাজনীতিকরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) উদ্বেগের মাঝেই বাংলাদেশের সরে দাঁড়ানো ভারতের জন্য বাজছে সতর্কবার্তা।
বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ভারতের ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের নিলামে (বিডে) নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খেলাধুলায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) ইতিমধ্যেই উদ্বিগ্ন- এমন একসময়ে এই সংকট ভারতের জন্য অস্বস্তিকর বার্তা হয়ে এসেছে বলে প্রতিবেদন ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর।
গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ঘোষণা দেয়, এ মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) বাংলাদেশের গ্রুপ ম্যাচগুলো ভারত থেকে সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় সরানোর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার পরই এই সিদ্ধান্ত আসে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপড়েনের প্রেক্ষাপটে কলকাতা নাইট রাইডার্স তাদের আইপিএল দল থেকে বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার পর বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করে।
গত এক মাসে দুই দেশের সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে গেছে। বাংলাদেশে এক হিন্দু নাগরিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতা নাইট রাইডার্র্স কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হয়, তারা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) নির্দেশনায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে পাকিস্তানও বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে আজ সোমবার।
বাংলাদেশের জায়গায় টুর্নামেন্টে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও আইসিসি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, সিদ্ধান্তটি তাদের নিজস্ব, তবে বিসিসিআই ম্যাচ স্থানান্তরের বিরোধিতা করে আইসিসিতে জোরালো লবিং করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইসিসি নিজেদের স্বাধীন সংস্থা হিসেবে দাবি করলেও অতীতে বিসিসিআইয়ের পক্ষে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার নজির রয়েছে। ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সম্প্রচার ও আর্থিক কারণে ভারতের জন্য গায়ানায় নিশ্চিত সেমিফাইনালের ব্যবস্থা তারই একটি উদাহরণ।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিসিসিআইয়ের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ভারত সরকারের সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। আইসিসির বর্তমান চেয়ারম্যান জয় শাহ আগে বিসিসিআইয়ের সচিব ছিলেন এবং তার বাবা অমিত শাহ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আইসিসির প্রধান নির্বাহী সঞ্জোগ গুপ্তাও আগে জিওস্টারের শীর্ষ নির্বাহী ছিলেন, যারা ভারতে আইসিসি ইভেন্টগুলোর একচেটিয়া সম্প্রচার স্বত্বাধিকারী।
এই রাজনৈতিক টানাপড়েন এমন একসময়ে সামনে এলো, যখন ভারত গত মাসেই দিল্লিতে ২০৩০ কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের দায়িত্ব নিশ্চিত করেছে এবং এখন ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের জন্য আহমেদাবাদকে ভেন্যু হিসেবে প্রস্তাব দিয়েছে। এই দৌড়ে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী কাতার।
তবে আইওসি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে আইসিসির চেয়ে অনেক বেশি কঠোর। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, যদি অন্য দেশগুলোর বর্জনের আশঙ্কা থাকে, তা হলে ভারতের হাতে অলিম্পিক তুলে দেওয়ার কথা কল্পনাও করা যায় না। অলিম্পিক চার্টার অনুযায়ী ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে হয়। একই সঙ্গে অলিম্পিকে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মত প্রকাশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
আইওসির এই ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির উদাহরণ মিলেছে গত অক্টোবরে। ইসরাইলি দলকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ইন্দোনেশিয়াকে ভবিষ্যৎ অলিম্পিক আয়োজন সংক্রান্ত সব আলোচনার বাইরে রাখা হয়। ইন্দোনেশিয়াও একসময় ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের দৌড়ে ছিল, কিন্তু শুরুতেই ছিটকে যায়।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রাজনীতি তাই ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের লড়াইয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক ১৯০০ সালের পর ২০২৮ অলিম্পিকে আবারও ফিরছে ক্রিকেট। ২০৩২ ব্রিসবেন অলিম্পিকেও ক্রিকেট থাকবে। ভারতীয় বাজারকে আকৃষ্ট করতেই ক্রিকেটকে অলিম্পিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তবে যেকোনো মূল্যে নয়- এমন বার্তাই দিচ্ছে আইওসি।
উল্লেখ্য, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ বন্ধ থাকায় পাকিস্তানের বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করা হচ্ছে। আইওসির ওই সূত্র আরও জানিয়েছে, ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের বিশ্বাসযোগ্য দাবিদার হতে হলে ভারতকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। সব মিলিয়ে ক্রিকেট রাজনীতিতে তৈরি হওয়া এই কূটনৈতিক সংকট এখন ভারতের অলিম্পিক স্বপ্নের পথেও বড় পরীক্ষার নাম।
এএডি/