ফুটবল মানেই আবেগ, বিস্ময়, কান্না, উল্লাস আর অগণিত গল্পের জন্ম। আর এই মঞ্চটা যদি হয় বিশ্বকাপের আসর, তা হলে তার মাহাত্ম্য বেড়ে যায় বহুগুণে। প্রতিবারই বিশ্বকাপে রচিত হয় নতুন নতুন গল্প আর ইতিহাস। রেখে যায় নানাবিদ স্মৃতি আর ভিন্নতার ছাপ। সেই রকম একটি গল্পেরই মহাকাব্যিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে। আর মেগা ফাইনাল দিয়ে ৩৯ দিনের দীর্ঘ যাত্রা শেষে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, দীর্ঘতম আর সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বাজবে স্পেন ও আর্জেন্টিনার মহারণে। ৪৮ দলের অংশগ্রহণে ১০৪ ম্যাচের এই বিশ্বকাপ শুধুই নতুন চ্যাম্পিয়নের সন্ধানই দেবে না; ইতিমধ্যে অবিশ্বাস্য অঘটন, চমক, বিতর্ক, সমালোচনা, প্রযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন, দর্শক উন্মাদনা এবং বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে তীব্র আলোচনারও জন্ম দিয়েছে।
উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপ শুরু থেকেই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাট, অতিরিক্ত ম্যাচ, দীর্ঘ সূচি এবং বিশাল ভ্রমণ দূরত্ব নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেক কোচ, খেলোয়াড় ও বিশ্লেষক। তবে মাঠের লড়াই যত এগিয়েছে, ফুটবলের নাটকীয়তা সব সমালোচনাকেই অনেকাংশে ছাপিয়ে গেছে।
গ্রুপ পর্ব থেকেই শুরু হয় অঘটনের মিছিল। তুলনামূলক দুর্বল দলগুলোর চোখে চোখ রেখে লড়াই, শক্তিশালী দলগুলোর হোঁচট এবং নবাগতদের সাহসী পারফরম্যান্স বিশ্বকাপকে দিয়েছে অন্যরকম মাত্রা। বিশেষ করে কেপভার্দের দুর্দান্ত যাত্রা ছিল এবারের অন্যতম বড় বিস্ময়। বড় দলকে পেছনে ফেলে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে নকআউটে উঠে ইতিহাস গড়ে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে আসা দলটি। দীর্ঘদিন পর বিশ্বকাপ খেলতে আসা ডিআর কঙ্গোও নকআউটে উঠে চমক দেখায়। মরক্কো আবারও প্রমাণ করেছে, বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে তারা আর কেবল চমকের নাম নয়। অন্যদিকে অপ্রত্যাশিতভাবে ব্রাজিল, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগালের মতো কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী ও ফেবারিট দলের আগেভাগে বিদায় অনেক সমর্থকের হৃদয় ভেঙেছে।
নকআউট পর্বে নাটকীয়তার যেন শেষ ছিল না। পেনাল্টি শুটআউট, শেষ মুহূর্তের গোল, প্রত্যাবর্তনের গল্প প্রতিটি রাউন্ডেই ছিল নতুন নাটক। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা শেষ মুহূর্তের দুর্দান্ত লড়াইয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয়। এবারের বিশ্বকাপে পরপর চার ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে অনন্য নজির গড়েছে মেসিরা, যেটা নতুনভাবে অলোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন ধারাবাহিক ফুটবল খেলে ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে। ফলে শেষ পর্যন্ত শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছে টুর্নামেন্টের দুই সেরা দল। র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ দুদল ফাইনাল খেলছে যেটা বিশ্বকাপের ইতিহাসেই প্রথমবারের মতো দেখা যাবে।
তবে মাঠের খেলার মতোই মাঠের বাইরের বিতর্কও ছিল এবারের বিশ্বকাপের বড় আলোচনার বিষয়। সবচেয়ে বেশি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে ভিএআর এবং রেফারিং। একাধিক ম্যাচে অফসাইড, পেনাল্টি ও লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু সিদ্ধান্তকে ঘিরে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে, যদিও সেসবের অনেকগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলেনি। বিশ্বকাপজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্কও ছিল আলোচনায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতি, শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এবং ফিফার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। যদিও ফিফা কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সমালোচনার আরেকটি বড় বিষয় ছিল টিকেটের মূল্য। ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই আসরে অনেক ম্যাচের টিকেট সাধারণ দর্শকের নাগালের বাইরে চলে যায়। ফিফার ডায়নামিক প্রাইসিং নীতির কারণে ফাইনালের কিছু টিকেট কয়েক হাজার থেকে শুরু করে দশ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছে, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের নয়, ধনীদের উৎসবে পরিণত হচ্ছে।
এবারের বিশ্বকাপের আরেকটি আলোচিত সিদ্ধান্ত ফাইনালে সুপার বোলের আদলে হাফটাইম শো আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে এটি কতটা মানানসই সেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেক সাবেক খেলোয়াড়, কোচ ও সমর্থক। দীর্ঘ বিরতি খেলোয়াড়দের ছন্দ নষ্ট করতে পারে বলেও মত দেন অনেকে। নিরাপত্তা, ভিসা জটিলতা এবং দীর্ঘ ভ্রমণ নিয়েও ছিল সমালোচনা। বিশেষ করে মেক্সিকোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে ভিসা জটিলতা এবং এক শহর থেকে আরেক শহরে দীর্ঘ যাত্রা খেলোয়াড় ও সমর্থকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ইরান জাতীয় ফুটবল দলকে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয়েছে এই বিষয়টি নিয়ে।
তবে এত বিতর্কের মাঝেও ফুটবলই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে। দর্শক উপস্থিতি, বৈশ্বিক আগ্রহ, অসংখ্য স্মরণীয় গোল, তরুণ তারকাদের উত্থান এবং অভিজ্ঞদের শেষ নৃত্য- সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো একটি আসর হয়ে থাকবে। এখন সব হিসাব-নিকাশের শেষ অধ্যায়। একদিকে স্পেনের দুর্দান্ত পাসিং ফুটবল, শৃঙ্খলা ও তরুণ প্রতিভার মিশেল; অন্যদিকে আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা, লড়াকু মানসিকতা এবং টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। ৩৯ দিনের মহারণ শেষে বিশ্ব ফুটবল আজ অপেক্ষায় কার হাতে উঠবে সোনালি ট্রফি, আর কে লিখবে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়।
সময়ের আলো/এসএকে