প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:০৯ এএম আপডেট: ০২.০২.২০২৬ ২:১১ এএম
রাজধানীতে জাতীয় কবিতা পরিষদের র্যালি। ছবি : সময়ের আলো‘সংস্কৃতিবিরোধী আস্ফালন রুখে দিবে কবিতা’- এই স্লোগান নিয়ে দুই দিনব্যাপী জাতীয় কবিতা উৎসব শুরু হয়েছে। এই কবিতা উৎসবের আয়োজন করেছে জাতীয় কবিতা পরিষদ।
রোববার সকালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে জাতীয় কবিতা উৎসবের সূচনা করা হয়। পরবর্তীতে পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত, একুশের গান ও উৎসব সংগীত পরিবেশন করা হয়।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, আমাদের সামনের দিনে এগিয়ে যেতে একটাই রাস্তা সেটা হচ্ছে সবার জন্য কালচারাল স্পেসটা ওপেন করে দেওয়া। এটা অত্যন্ত জরুরি। অর্থাৎ, একটা রিপাবলিকে নানান মতের মানুষ থাকবে।
আপনি এক মতে বিশ্বাস করবেন, আমি আরেক মতে বিশ্বাস করব, আরেকজন আরেক মতে বিশ্বাস করবে। এখন একেকজন একেক মতে বিশ্বাস করার অর্থ যদি এই দাঁড়ায় তুমি যদি আমার মতে বিশ্বাস না করো তা হলে তোমার চেয়ে খারাপ আর কেউ নেই। এটা থেকে আমাদেরকে বের হয়ে আসতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, আমাদের অনেক ক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যর্থতা আছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে সফলতা আছে। সেটা আমি মনে করি ১০-১৫ বছর পরে ইতিহাস বিচার করবে যে আমরা আসলে কী করতে চেয়েছি বা কী করতে পেরেছি। কালচারালি আমরা যে কাজটা করার চেষ্টা করেছি সেটা হচ্ছে কে, কোন, জাতিগোষ্ঠীর, কে বাঙালি, কে চাকমা, কে মারমা, কে গারো এ বিভাজন আমরা করতে চাইনি। আমরা প্রত্যেককে এক জায়গায় নিয়ে আসতে চেয়েছি।
ফারুকী বলেন, যেকোনো জাতির জন্য সামনে যাওয়ার রাস্তা দেখায় পেছনের রাস্তা। পেছনের রাস্তাটা যদি আমরা সবসময় খেয়াল রাখি যে আমরা কোথা থেকে এখানে আসলাম, কেন আজকে আমরা চব্বিশে এ রকম একটা বড় গণঅভ্যুত্থানের মুখোমুখি হলাম এটা যদি আমরা খেয়াল রাখি তা হলে আমরা আমাদের সামনের রাস্তা খুঁজে পাব যে সামনে কী কী করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস বা যেকোনো জাতির ইতিহাসেই এর নানান রকমের ন্যারেটিভ থাকে। বাংলাদেশে চব্বিশে যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে এই গণঅভ্যুত্থানটাকে আমি মনে করি একটা সাংস্কৃতিক ঘটনা। সাংস্কৃতিক ঘটনা বলতে আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে এটা অবশ্যই একটা পলিটিক্যাল এক্সপ্রেশন ছিল গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু এর ভেতরে যে ক্ষোভ ছিল সেটি সাংস্কৃতিক ক্ষোভ। এই ক্ষোভকে যদি আমরা শনাক্ত করতে ভুল করি তা হলে আমরা সামনের রাস্তাও খুঁজে পাব না।
নিজের দেশে তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে না বাঁচার জন্য লড়াই ছিল চব্বিশের লড়াই। এটা যেন আমরা ভুলে না যাই। আপনি একটা জাতিকে বেশিদিন পরাধীন রাখতে পারবেন না। যত রকম ন্যারেটিভ, কালচারাল ন্যারেটিভ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নানান কথা বলেন কিন্তু তাকে আপনি পরাধীন বেশিদিন রাখতে পারবেন না। এটা এখনও পারবেন না, ভবিষ্যতেও পারবেন না। অতীতেও পারা সম্ভব হয় নাই।
অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন শহীদ মীর মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, মানুষের জন্য মানুষ , সবার উপরে মানুষ তার উপরে নাই।
আপনারা মানুষ পাশে দাঁড়াবেন এই আশাবাদ ব্যক্ত করি। কবিতা হলো মানুষের মনের কথা। এই উৎসবে আমি আহ্বান জানাবো আগামী দিনে যেন আবু সাইদ, ওয়াসিম, মীর মুগ্ধ সহ যারা শহীদ হয়েছে চব্বিশের আন্দোলনে, একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলনে এবং পৃথিবী সৃষ্টির পর যারা দেশ জাতির জন্য শহীদ হয়েছে সবার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং আগামী দিনে আর যেন কারো মায়ের বুক খালি না হয়, কারো স্বামী যেন চিরবিদায় না নেয়, কারো বোনের ভাই যেন শহীদ না হয়।
সকলের প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এই দেশের পরিবর্তনের জন্য , এদেশের স্বার্থের জন্য, এদেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য, এ দেশের দেশপ্রেমের জন্য আপনারা আপনাদের আত্মনিয়োগ করবেন এবং সব দায়িত্ব পালন করবেন।
সভাপতির বক্তব্যে কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন, ১৯৮৭ সালে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্রের সড়ক মোহনায়, রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে যাত্রা শুরু করেছিল জাতীয় কবিতা পরিষদ ও জাতীয় কবিতা উৎসবের।
পরবর্তী সময়ে এই উৎসব স্থানান্তরিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সংলগ্ন হাকিম চত্বরে। সেখানে দীর্ঘদিনের সেই আয়োজনে এবার অনুমতি মেলেনি। কারণ সময় বদলেছে। আর সেই বদলে যাওয়া সময়কে আজ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে অন্ধকারের অশুভ শক্তি। যারা আলোর সাম্পানে ভাসমান হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতিকে মেনে নিতে পারে না, আজ তাদেরই আস্ফালন চারদিকে।
তিনি আরো বলেন, আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে উদ্যত দক্ষিণপন্থী উগ্র মৌলবাদী অপশক্তিকে প্রতিহত করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের জাতীয় কবিতা উৎসব।
সময়ের আলো/এআর