বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেছেন, কবিরা আমাদের বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করার জন্য কিছু করতে পারেনি। ১৯৫৪ সালের ২১ দফার মধ্যে ছিল একটা দাবি ছিল বাংলা একাডেমি করতে হবে। বাংলা একাডেমি হয়েছে। কিন্তু বাংলা সিভিল সোসাইটিতে চালু হয়নি। অর্থাৎ বাংলা এদেশের এলিট শ্রেণীর ভাষায় আপনি পরিণত করেননি।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় কবিতা উৎসবের শেষ দিনে ‘৭১ থেকে ২৪ : গণআন্দোলনে কবিতার ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, আমরা কেউ সম্ভবত ইংরেজি শিক্ষার বিরোধিতা করিনি এবং করবও না। কারণ দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য আমাদের একটা না একটা বিদেশী ভাষা দরকার।
প্রশ্ন হচ্ছে ইংরেজি কোথায় থাকবে? বাংলা কোথায় থাকবে? কোনটা থাকবে কেন্দ্রে? কোনটা থাকবে প্রান্তে? আপনারা দেখেন ইংরেজরা বাংলাকে নিষিদ্ধ করেনি। ওরা ইংরেজিকে এক প্রান্তে নয় কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল। ইংল্যান্ডে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ প্রতিষ্ঠার আগে ভারতের কলকাতা ইংরেজি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
ইংরেজিকে কেন্দ্রে রাখার জন্যে তারা অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে, জাতীয় ভাষাগুলোকে ভার্নাকুলার (দাসদের ভাষা) বলত। ইউরোপের ভাষা তো সেই দাসদের ভাষা হিসেবেই বাংলা, হিন্দি, অহমিয়া, উড়িয়া, গুজরাটি, মারাঠি, তামিল, সব ভারতবর্ষে ভাষা ছিল। অথচ এই ভাষাগুলো ইতিহাসের দিক থেকে প্রত্যেকটাই ইংরেজি, ফরাসি, জার্মানির চেয়ে সমবয়সী অথবা জ্যেষ্ঠ ভাষা।
সলিমুল্লাহ খান বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো আমরা তারপরেও বাংলাকে প্রান্ত থেকে টেনে কেন্দ্রে আনতে পারি নাই। ১৯৫২ এর শহিদরা কি এটাই বলেছিলেন? কই আমাদের কবিদের পক্ষ থেকে তো আমি কোন প্রতিবাদ দেখিনি। শুধু এরশাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া, হাসিনার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া এটা অত্যন্ত পবিত্র কাজ কিন্তু আসল কাজে আপনারা পিছনে। দেশের সমস্ত সিভিল সোসাইটির প্রতিষ্ঠানে দেখেন না কেন একমাত্র সরকারি জায়গা ছাড়া কোথাও বাংলা নাই।
ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে আমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ প্রথম ভাষা হিসেবে নয়। যেকোনো পদ্ধতিতে লেখাপড়ার জন্য মাতৃভাষা শ্রেষ্ঠ কিন্তু উচ্চবিদ্যার জন্য মাতৃভাষা যথেষ্ট নয়। তাহলে বিদেশ থেকে কি করবেন? আপনি আনবেন, অনুবাদ করবেন, ছড়িয়ে দেবেন, আলোচনা করবেন। বাংলার জায়গায় ইংরেজিকে বসানোর যে নিয়ম করছি এটা হচ্ছে আবর্জনা যার মাধ্যমে আমরা আত্মহত্যার পথে চলেছি।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যদি বাংলা ভাষার স্থান কেন্দ্র ক্রমশ থেকে প্রান্তে চলে যায়, শূণ্য থেকে শূণ্যতার ভাষা হয়ে যায় তখন আমাদের ভয় হয় এটা প্রাদেশিক ভাষা হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, কবিতার সূত্রপাত হয় কখন? যখন আর ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমরা বলি আমি তোমাকে এমন ভালোবাসি যেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ওই যে সীমা ভাষায় প্রকাশ করা যায় এবং ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এই দুইটার যে সীমা এখানে কবিত্বের উদ্ভব হয়।
আলোচনায় কবি–প্রবন্ধকার সাখাওয়াত টিপু বলেন, কবিতা ভাষা দিয়ে নির্মাণ হয় কিন্তু ভাষার ভিতরে যে অধিকারটা থাকে কবিতা সে অধিকারের কথা বলে। কবিতার ইতিহাস হচ্ছে মানুষের সঙ্গে থাকার ইতিহাস। মানুষের মনোজগতের সঙ্গে থাকার ইতিহাস। কবিতার ইতিহাস হচ্ছে মানুষের ভবিষ্যৎ ভাষা নির্মাণের ইতিহাস। জুলাই আন্দোলনে পরে অনেক শব্দ রিভাইভ করেছে যেমন ইনকিলাব, ইনসাফ এই শব্দগুলো ৬০ এর আন্দোলনে পাবেন মাওলানা ভাসানীর কথায়, ৭০ এর দশকেও পাবেন। এখন আবার এই জুলাই আন্দোলনের ভিতর দিয়ে ভাষার একটা নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, কবিতা একটা গণতান্ত্রিক চেহারা দেয় সমাজে। কবিতা হচ্ছে সে গণতান্ত্রিক ভারসাম্যটাকে রক্ষা করতে চায়। যখন কোন অন্যায়, যখন কোন অবিচার, যখন কোনো স্বৈরাচার মাথা দিয়ে উঠে আপনি দেখবেন যে ভাষাটা বিদ্রোহ করে। মানুষের মধ্যে প্রথম বিদ্রোহ করে তার ভাষা। তারপর হচ্ছে তার রাজনীতি। কবিতা হচ্ছে যে প্রাথমিক ভিত্তি যে ভাষাটাকে নির্মাণ করে দেয়।
বাংলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক, লেখক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম বলেন, আমরা যদি গণ আন্দোলন নিয়ে আলাপ করি এবং তার সঙ্গে সাহিত্যের বিশেষ করে কবিতার একটা সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে চাই তাহলে সেটার খুব ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে ।
বাংলাদেশের কবিতা নিয়ে যারা আলাপ আলোচনা করেন তারা এটা খুব কমনলি বলেন যে বাংলাদেশের কবিতা নানান ধরনের গণআন্দোলন সংগ্রাম এগুলোর ব্যাপারে সবসময় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং একই সঙ্গে এই আন্দোলনগুলোকে প্রভাবিত করেছে। এই কথা বাংলাদেশের কবিতার আলোচনায় সবসময় একটা প্রতিষ্ঠিত ব্যাপার। সমাজে যদি গণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজের কোন তাৎপর্যপূর্ণ রূপান্তর হয়েই থাকে তাহলে নিঃসন্দেহে সে আন্দোলনগুলোর কোন না কোন মাত্রায় কবিদের কবিতার একটা প্রভাব থাকবেই।
সময়ের আলো/এসকে/