সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শাহপরাণ হলের ক্যানটিনের খাবারের মান নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অভিযোগ করায় এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে। মারধরের সময় ভুক্তভোগীকে ‘থাপড়িয়ে দাঁত ফেলে দেব’ বলে হুমকি দেওয়া হয় বলেও জানা গেছে।
শনিবার (১৮ জুলাই) রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন এলাকার একটি দোকানের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম খাইরুল খন্দকার। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র।
অভিযুক্ত দুই ছাত্রদল নেতা হলেন, পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের সহ-দফতর সম্পাদক তারেক রহমান এবং পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের একই বর্ষের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের যোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক হাসিবুর রহমান। ক্যাম্পাসে তারেক শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাড়ম সরকার এবং হাসিবুর সভাপতি রাহাত জামানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তরা সবাই শাহপরাণ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে খাবারের মান নিয়ে খাইরুলের দেওয়া একটি পোস্টের জেরে শনিবার রাতে তাকে ডেকে পাঠান হাসিবুর ও তারেক। সেখানে তাদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয় এবং একপর্যায়ে খাইরুলকে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে তিনি বুক, মাথা ও হাতে গুরুতর আঘাত পান।
ভুক্তভোগী খাইরুল খন্দকার ঘটনার বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে জানান, গত ১৬ জুলাই (বৃহস্পতিবার) তিনি হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ক্যানটিনের খাবারের বাজে অবস্থা নিয়ে প্রাধ্যক্ষকে (প্রভোস্ট) ‘মেনশন’ করে একটি অভিযোগ দেন। এর জেরে পরদিন ১৭ জুলাই (শুক্রবার) রাত সাড়ে ১১টার দিকে তারেক ও হাসিবুর তাকে প্রাধ্যক্ষের কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন।
শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে খাবার খেতে গেলে হাসিবুর আমাকে ডেকে পাঠায়। আমি কেন প্রাধ্যক্ষের কাছে ক্ষমা চাইনি, সে তা জানতে চায় এবং হুমকি দেয়। এ সময় তারেক বলে, ‘এই ব্যাটা তুই আমারে চিনস থাপড়িয়ে দাঁত ফেলে দেবো’ এরপরই হাসিবুর ও তারেক আমাকে বেধড়ক মারধর শুরু করেন।
পরে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা খাইরুলকে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা উপস্থিত হয়ে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ছাত্রদল নেতা হাসিবুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে অন্য অভিযুক্ত তারেক রহমান মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করে একে ‘হাতাহাতি’ বলে দাবি করেন।
হলের গ্রুপে খাবারের বিষয়ে কথা বলায় প্রাধ্যক্ষ স্যার একটু মন খারাপ করেছিলেন। আমরা এ নিয়ে খাইরুলকে বোঝাচ্ছিলাম। কিন্তু সে জুনিয়র হয়েও আমাদের সঙ্গে খুব বাজে আচরণ করেন, যা সিনিয়র হিসেবে আমাদের খারাপ লেগেছে। একপর্যায়ে সে তেড়ে এসে আমার গায়ে হাত তোলে। হাসিবুর বাধা দিতে গেলে হাতাহাতি হয়। এতে হাসিবের চশমা ভেঙে গেছে, হাত কেটে গেছে এবং ফোন নষ্ট হয়ে গেছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রাহাত জামান বিষয়টিকে সাংগঠনিক রূপ না দিয়ে বলেন, এটি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট হলের প্রাধ্যক্ষ ও তিনজন শিক্ষার্থীর মধ্যকার একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
শাহপরাণ হলের প্রাধ্যক্ষ ইফতেখার আহমদ এই ঘটনায় তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন। তবে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে খাইরুলের করা অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে তিনি হাসিবুর ও তারেকের সঙ্গে কথা বলেছিলেন বলে স্বীকার করেন।
প্রাধ্যক্ষ বলেন, শিক্ষার্থী যখন অভিযোগ করেছে, তখন আমি ক্যান্টিন পরিচালককে ডেকে এনে আলাপ করেছি এবং তাকে ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলতে বলেছি। এখানে আমার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সত্য নয়।
এই ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র শক্তির কয়েকজন নেতা-কর্মী এবং ছাত্রদলের একাংশের নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন। জড়িতদের শাস্তির দাবিতে মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অতিথি ভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়।
সেখানে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল হোসেন উপাচার্যের কাছে তিনটি দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো, দ্রুততম সময়ের মধ্যে মারধরের ঘটনার তদন্ত। জড়িত ব্যক্তিদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কার। আহত শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
উপাচার্য অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের সামনে এসে দাবি পূরণের আশ্বাস দিলে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন। উপাচার্য জানান, ঘটনা তদন্তে ইতোমধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে এই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা হবে।
সময়ের আলো/জোই