টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে যে উত্তেজনা, তা কেবল ক্রিকেটীয় নয়; এটি এক বিশাল অর্থনৈতিক শক্তির গল্পও। পাকিস্তান সরকার ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দেওয়ার মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) যে নরম-গরম প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, তার আড়ালে লুকিয়ে আছে এই ম্যাচের বিপুল আর্থিক গুরুত্ব। ‘সুদূরপ্রসারী প্রভাব’ এবং ‘গ্রহণযোগ্য সমাধান’-এর কথা বলে আইসিসি মূলত সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছে এই একটি ম্যাচ না হলে ক্ষতির অঙ্ক শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ থাকবে না, কাঁপিয়ে দেবে পুরো বিশ্বক্রিকেটের অর্থনীতিকে।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তানের লড়াইকে অনেকেই বলেন ‘ট্রফির চেয়েও বড় ম্যাচ’। আবেগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতা সেই কথাকেই আরও জোরালো করে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির দাবি অনুযায়ী, শুধু এই একটি ম্যাচকে ঘিরেই বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৬ হাজার ১২০ কোটি টাকারও বেশি। বিস্ময়কর হলেও সত্য, পুরো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাকি সব ম্যাচ মিলিয়ে যে বাজার তৈরি হয়, অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি ওজন এই এক ম্যাচের।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের মোট আর্থিক মূল্য নির্দিষ্ট কোনো হিসাব দিয়ে মাপা কঠিন। তবে সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, টিকেট বিক্রি এবং আনুষঙ্গিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম মিলিয়ে রক্ষণশীল হিসাবেও অঙ্কটা প্রায় ৫০ কোটি ডলার। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ম্যাচে প্রতি ১০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন বিক্রি হয় ২৫ থেকে ৪০ লাখ ভারতীয় রুপিতে। শুধু এই তথ্যই বোঝাতে যথেষ্ট, ম্যাচটি না হলে ক্ষতির অঙ্ক কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
এই বয়কটের ধাক্কা সবচেয়ে আগে লাগবে সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। আইসিসি থেকে বিপুল অর্থ দিয়ে স্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠানগুলো একটি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ থেকেই বিজ্ঞাপন বাবদ আনুমানিক ৩০০ কোটি রুপি আয় করে থাকে। ম্যাচটি না হলে এই আয়ের বড় অংশ সরাসরি উধাও হয়ে যাবে।
বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্বাধিকারী জিওস্টার ইতিমধ্যেই লোকসানের কারণ দেখিয়ে আইসিসির কাছে অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ না হলে সেই দাবি আরও জোরালো হবে। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের গড় অভ্যন্তরীণ মূল্য ধরা হয় প্রায় ১৩৮.৭ কোটি রুপি এমন বাস্তবতায় সবচেয়ে দামি ম্যাচটি বাদ পড়া মানেই বড় ধরনের আর্থিক ধাক্কা।
সম্প্রচারকারীরা যদি আইসিসির কাছে ক্ষতিপূরণ চায়, তার চাপ সরাসরি পড়বে সংস্থাটির আয়ে। আর আইসিসির আয় কমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সদস্য দেশগুলোও। অর্থাৎ ভারত বা পাকিস্তান নয়, অনুদানের ওপর নির্ভরশীল সহযোগী দেশ এবং ছোট পূর্ণ সদস্যরাই সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বে।
ম্যাচটি না হলে ভারত ও পাকিস্তান দুই বোর্ডই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০০ কোটি রুপি করে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। বিসিসিআই আইসিসির মোট আয়ের প্রায় ৩৮.৫ শতাংশ পায়। যদিও তাদের আয়ের বড় উৎস আইপিএল ও দ্বিপক্ষীয় সিরিজ। অন্যদিকে পিসিবি পায় আইসিসির মোট আয়ের ৫.৭৫ শতাংশ, যা বছরে প্রায় ৩.৪৫ কোটি ডলার। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ ও নির্ধারিত ম্যাচ খেলা অনুদান পাওয়ার অন্যতম শর্ত। ভারত ম্যাচ বর্জনের প্রভাব তাই পাকিস্তানের আয়ে সরাসরি পড়তে পারে।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তান স্বেচ্ছায় ম্যাচ বর্জন করায় বিষয়টি ‘ফোর্স মাজিউর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির আওতায় পড়বে না। ফলে আইনি সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগও সীমিত। আইসিসির ‘মেম্বার পার্টিসিপেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ ভঙ্গের অভিযোগে জরিমানা, এমনকি টুর্নামেন্টের পাওনা অর্থ আটকে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়তো টাকার নয়, সুনামের। নির্ধারিত সূচির ম্যাচ একবার বাতিল হলে ভবিষ্যতে এমন ম্যাচগুলো বিনিয়োগকারীদের চোখে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হয়ে উঠবে। স্পনসরদের আগ্রহ কমবে, সম্প্রচারমূল্যও নামতে পারে। আর সেটাই হবে বিশ্বক্রিকেটের জন্য সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি।