চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব সাফল্যের সাক্ষী হলো বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্রে ৩৩ বছর বয়সি এক যুবক নিজের দুটি ফুসফুস শরীর থেকে সম্পূর্ণভাবে অপসারণের পরও ৪৮ ঘণ্টা বেঁচে ছিলেন একটি বাহ্যিক কৃত্রিম ফুসফুস ব্যবস্থার সহায়তায়। দ্বৈত ফুসফুস প্রতিস্থাপন সম্ভব হওয়া পর্যন্ত এই প্রযুক্তিই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির এক চিকিৎসক দল ৩৩ বছর বয়সি এক পুরুষ রোগীকে ৪৮ ঘণ্টা ফুসফুস ছাড়াই জীবিত রাখতে সক্ষম হয়। রোগীর সংক্রমিত দুটি ফুসফুস শরীর থেকে সরিয়ে ফেলার পর তার দেহে সংযুক্ত করা হয় দলটির তৈরি একটি বাহ্যিক কৃত্রিম ফুসফুস ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার সাহায্যেই তিনি বেঁচে ছিলেন, যতক্ষণ না তার জন্য ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়।
এর আগেও কয়েকটি ক্ষেত্রে রোগীর ফুসফুস অপসারণ করে বাইরে থাকা যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করে অক্সিজেন সরবরাহ বজায় রাখা হয়েছিল। তবে সেসব যন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে ‘কৃত্রিম ফুসফুস’ বলা যায় না, কারণ সেগুলো হৃদযন্ত্রের ভেতর দিয়ে স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ বজায় রাখতে পারে না। ফলে হৃদযন্ত্র স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না বলে জানান শিকাগোর নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ফাইনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনের থোরাসিক সার্জন অঙ্কিত ভরত। তিনিই এই কৃত্রিম ব্যবস্থাটি তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ভরত বলেন, তাদের তৈরি ব্যবস্থার বিশেষত্ব হলো এটি হৃদযন্ত্রে রক্তের ভারসাম্যপূর্ণ ও ধারাবাহিক প্রবাহ নিশ্চিত করে। এতে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমে, যা হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারত। এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী গবফ-এ। অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ওয়েস্টমিড হাসপাতালের ট্রান্সপ্লান্ট চিকিৎসক নাতাশা রজার্স বলেন, ফুসফুস ছাড়াই হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন। তার ভাষায়, ‘ওরা সত্যিই খুব সাহসী ছিল।’
কৃত্রিম ফুসফুস ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার আগে ওই ব্যক্তি অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিস্ট্রেস সিনড্রোমে (অজউঝ) আক্রান্ত হন। এটি একটি প্রাণঘাতী অবস্থা, যেখানে ফুসফুস পর্যাপ্ত অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে না। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস থেকে এই জটিলতা তৈরি হয়। তাকে ভেন্টিলেটরে রাখা হলেও পরে তার শরীরে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দেখা দেয়।
সংক্রমণের ফলে ফুসফুসে পুঁজ জমে যায় এবং তিনি সেপটিক শকে চলে যান। তখন তার হৃদযন্ত্র ও কিডনিও বিকল হতে শুরু করে। ভরত বলেন, তিনি এতটাই গুরুতর অসুস্থ ছিলেন যে, একসময় তার হৃদযন্ত্র থেমে যায়, তিনি কার্যত মৃত্যুপথযাত্রী ছিলেন। যেহেতু তার শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে তখন ফুসফুস প্রতিস্থাপন সম্ভব ছিল না, তাই চিকিৎসক দল সংক্রমণের মূল উৎস হিসেবে তার ফুসফুস দুটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। আশ্চর্যজনকভাবে এর পরপরই রোগীর অবস্থার দ্রুত উন্নতি হতে থাকে।
ভরত জানান, ‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তার রক্তচাপ ঠিক রাখতে ব্যবহৃত সব ওষুধ বন্ধ করা যায়, কিডনি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে এবং হৃদযন্ত্র স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে শুরু করে।’ এরপর তার শরীরে সফলভাবে দ্বৈত ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা হয়। প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও তার শরীরে অঙ্গ প্রত্যাখ্যানের কোনো লক্ষণ নেই, ফুসফুসের কার্যকারিতাও স্বাভাবিক। ভরত বলেন, ‘প্রায় তিন বছর হতে চলল, রোগী খুব ভালো আছেন।’
কোভিড-১৯ মহামারির সময় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য কৃত্রিম ফুসফুস ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছিলেন ভরত ও তার দল। লক্ষ্য ছিল, রোগীদের এমন অবস্থায় নেওয়া, যাতে তারা ফুসফুস প্রতিস্থাপনের উপযোগী হন। প্রচলিত ইসিএমও প্রযুক্তি রক্তে অক্সিজেন যোগ ও কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ করলেও ফুসফুস শরীরের ভেতরেই রেখে দেওয়া হয়, যাতে হৃদযন্ত্র স্থিতিশীল থাকে। নতুন এই ব্যবস্থা ইসিএমওর পরিবর্তিত রূপ, যা হৃদযন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকে রক্তচাপ ও প্রবাহ বজায় রাখে।
রজার্সের মতে, তাত্ত্বিকভাবে ভবিষ্যতে ফুসফুস সাময়িকভাবে শরীরের বাইরে রেখে চিকিৎসা করে আবার প্রতিস্থাপনও সম্ভব হতে পারে। যদিও এতে একাধিক বিশেষজ্ঞ দলের প্রয়োজন, ফলে আপাতত বড় হাসপাতালেই এর ব্যবহার সম্ভব। ভরত আশা করছেন, ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হবে এবং আরও বেশি হাসপাতালে ব্যবহার করা যাবে। আপাতত নর্থওয়েস্টার্নে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের জন্য এটি প্রয়োগ করা হবে এবং রোগীদের ফলাফল সংরক্ষণের জন্য একটি রেজিস্ট্রি রাখা হবে।