ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে অন্তত ৫৫ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছেন।
বুধবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল ফ্রান্স ২-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতি, কূটনৈতিক পরিস্থিতি এবং ইউক্রেনের বর্তমান সামরিক অবস্থার কথা তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং এমন কিছু পরিসংখ্যান প্রকাশ করেন, যা সাধারণত প্রকাশ্যে খুব কম বলা হয়। তিনি বলেন, ইউক্রেনে সরকারি হিসাবে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সেনার সংখ্যা ৫৫ হাজার। এর পাশাপাশি আরও অনেক মানুষ রয়েছেন, যাদের নিখোঁজ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
তবে এই সংখ্যাটি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বেশ কয়েকটি স্বাধীন গবেষণা সংস্থা মনে করে, নিহত ইউক্রেনীয় সেনার প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নিহত সেনার সংখ্যা এক লাখ থেকে এক লাখ চল্লিশ হাজারের মধ্যে হতে পারে।
এ সময় আবুধাবিতে নতুন ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরুর প্রসঙ্গ তুলে ধরে জেলেনস্কি রাশিয়ার কৌশলের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ইউক্রেনীয় জনগণের দুর্ভোগ বাড়াতে চায়, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্র যাকে ‘সমঝোতা’ বলে, তা মেনে নিতে বাধ্য হয়। তবে তার মতে, এটি আসলে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে চাপ প্রয়োগের একটি কৌশল বা আল্টিমেটাম।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আমরা যদি এই যুদ্ধে হেরে যাই, তাহলে আমরা আমাদের স্বাধীনতা হারাব।
রাশিয়ার নতুন করে হামলার মধ্যেই এসব মন্তব্য করেন জেলেনস্কি। বুধবার ইউক্রেনের ডিনিপ্রোপেট্রোভস্ক অঞ্চলে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় অন্তত দুইজন নিহত হন। এর আগের দিন রুশ বাহিনী ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায়। সে সময় দেশের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি।
কূটনৈতিক বিষয়ে জেলেনস্কি বলেন, এই যুদ্ধ ইউক্রেনের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। পশ্চিমা মিত্রদের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমরা ভালো বন্ধু। তিনি আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে সংলাপ আবার শুরু করার কথা ভাবছেন। তিনি জানেন আমি কী ভাবি। পুতিনের লক্ষ্য ইউরোপকে দুর্বল করা। তবে শান্তি আনার জন্য ইমানুয়েলের উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
জেলেনস্কির মতে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউরোপীয় দেশগুলোকে খুব একটা ভয় পান না, কারণ ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে বসবাস করছে। তবে তিনি দাবি করেন, পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভয় পান।
তার ভাষায়, ট্রাম্পের কাছে অর্থনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং অস্ত্রের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে।
সম্প্রতি কিয়েভে ব্যাপক হামলার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের প্রভাব শুধু তার দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তিনি বলেন, ইউক্রেনের প্রতিবেশী দেশগুলো বুঝতে পারছে যে, তারাই পুতিনের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে। ইউরোপে যারা এই বিষয়টি উপলব্ধি করেছে, তারা ইউক্রেনকে কার্যকরভাবে সহায়তা করছে। আমরা সবাই ইউরোপীয় জীবনধারা রক্ষার জন্য লড়াই করছি, বলেন তিনি।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেনের জন্য অতিরিক্ত ব্রিটিশ-নির্মিত অস্ত্র কেনার অনুমোদন দিয়েছে। ২৪টি ইইউ সদস্য রাষ্ট্র ইউক্রেনকে যে ৯০ বিলিয়ন ইউরো ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, তার অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের মতো কিছু অ-ইইউ দেশকেও আর্থিক অবদানের বিনিময়ে এই উদ্যোগে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
/ইউএমএইচ