শিল্পকলা পদকপ্রাপ্ত ময়মনসিংহ অঞ্চলের খ্যাতিমান বাউল শিল্পী সুনীল কর্মকার আর নেই।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড়ে চারটার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ময়মনসিংহ জেলা বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আসলাম তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ময়মনসিংহের সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, সুনীল কর্মকার বাউল মালজোড়া গান, মহাজনী গান ও লোকসংগীত অঙ্গনের একজন সুপরিচিত ও প্রভাবশালী শিল্পী ছিলেন। দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও সাধনা, কণ্ঠের শক্তি ও সুরের গভীরতায় তিনি লোকসংগীতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন।
১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি পূর্ব ময়মনসিংহে জন্ম নেওয়া সুনীল কর্মকারের বাড়ি বর্তমানে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার বারনাল গ্রামে। তার বাবা দীনেশ কর্মকার এবং মা কমলা কর্মকার। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। দ্বিতীয় ভাই দীলিপ কর্মকার স্বর্ণশিল্পী এবং সর্বকনিষ্ঠ ভাই শ্রীমল কর্মকার। তাদের বাবা দীনেশ কর্মকার ও ছোট ভাই শ্রীমল কর্মকার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে শরণার্থী শিবিরে অসুস্থ হয়ে মারা যান।
ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, মাত্র সাত বছর বয়সেই সুনীল কর্মকারের জীবনে সংগীত গভীরভাবে প্রবেশ করে। পাশের গ্রামে প্রখ্যাত গীতিকবি জালাল উদ্দিন খাঁ-এর বাড়িতে বসা নিয়মিত গানের আসর তাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করত। গ্রাম থেকে গ্রামে যেখানেই গান হতো, সেখানেই ছুটে যেতেন তিনি।
পরবর্তীতে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। তবে চোখের আলো নিভে গেলেও সংগীতের প্রতি তার অনুরাগ একটুও কমেনি। ছেলের প্রবল আগ্রহ দেখে বাবা তাকে নিয়ে যান পাশের গ্রামের বাউল শিল্পী ইসরাইল মিয়ার কাছে। শৈশবেই সিংহের গাঁয়ের ইসরাইল মিয়ার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন সুনীল কর্মকার।
গুরুর স্নেহে বড় হয়ে ওঠা সুনীল সেখানে কণ্ঠসংগীতের পাশাপাশি দোতারা বাজানোতেও দক্ষতা অর্জন করেন।
পরে ৯–১০ বছর বয়সে বাদল পণ্ডিতের কাছে হারমোনিয়াম শেখেন এবং তবলার তালিম নেন কাকা গোবিন্দ কর্মকারের কাছ থেকে। এছাড়া লখনৌ ঘরানার সৌখিন বেহালাবাদক মীর হোসেনের কাছে বেহালা বাদনের শিক্ষা গ্রহণ করেন।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেশি ও বিদেশি নানা বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করেন। একতারা, দোতারা, স্বরাজ, হারমোনিয়াম যেমন তার হাতে প্রাণ পেত, তেমনি খমক, খঞ্জনি, ঢোল, ঢোলক ও ঢাকেও সমান দক্ষতায় বাজাতেন তিনি।
লোকসংগীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২২ সালে সুনীল কর্মকার শিল্পকলা পদকে ভূষিত হন।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন বলে জানান ময়মনসিংহ বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম।
বাউল শিল্পী রাসেল সরকার জানান, শুক্রবার দুপুরে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার পাশে হযরত কালু শাহ ফকিরের মাজার প্রাঙ্গণে সুনীল কর্মকারের মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়।
তার মৃত্যুতে নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজের সভাপতি মাহাবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক তানভীর চৌধুরী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
/ইউএমএইচ