প্রকাশ: রোববার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫:৫৪ এএম (ভিজিট : ২০৬)
সংগৃহীত ছবিবাংলাদেশহীন এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ যেন শুরুতেই নিজের শূন্যতাটুকু প্রকাশ করে দিল। মাঠে আলো, ক্যামেরা, ব্যানার সবই আছে; নেই শুধু প্রাণ। বহুল প্রতীক্ষিত আসর শুরু হলেও বাংলাদেশ ছাড়া এই বিশ্বকাপ যে কতটা সুনসান, তার প্রমাণ মিলেছে প্রথম দিনেই।
বাংলাদেশ খেলছে না এ কথা বলা আসলে পুরো সত্যটা বলে না। বরং বলা উচিত বাংলাদেশকে খেলতে দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা তুলে ভারতের মাটিতে খেলতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
ভেন্যু পরিবর্তন করে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজনের অনুরোধ জানানো হলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সেই প্রস্তাব আমলে নেয়নি। উল্টো বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকেই ছেঁটে ফেলা হয়। নিরাপত্তা প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের মূল্য দিতে হয় টুর্নামেন্টের বাইরে বসেই।
এই সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। ঠিক তখনই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয় পাকিস্তান সরকার। তারা জানায়, গ্রুপপর্বে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলবে না। এই ঘোষণার পর আইসিসির অবস্থান কিছুটা নরম হলেও সিদ্ধান্ত বদলায়নি। সাবেক ক্রিকেটার থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সমর্থকরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানাতে থাকেন।
এমন জটিল বাস্তবতা মাথায় নিয়েই শনিবার পর্দা উঠে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের। কলম্বোয় দিনের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হয় পাকিস্তান ও নেদারল্যান্ডস। তবে মাঠে ম্যাচের উত্তেজনা থাকলেও গ্যালারিতে ছিল হতাশাজনক দৃশ্য। হাতেগোনা কিছু পাকিস্তানি সমর্থক ছাড়া প্রায় ফাঁকা স্টেডিয়ামেই শুরু হয় বিশ্বকাপ যাত্রা। দর্শক টানতে আইসিসি দুটি গ্যালারি শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেও তাতেও খুব একটা সাড়া পাওয়া যায়নি।
মাঠের লড়াই অবশ্য একপেশে হয়নি। ১৪৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে একসময় চাপে পড়ে যায় পাকিস্তান। হারের শঙ্কা যখন স্পষ্ট, তখন ফাহিম আশরাফ ১১ বলে ২৯ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে দলকে টেনে তোলেন। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান জয় পেলেও গ্যালারির নীরবতা পুরো ম্যাচজুড়েই চোখে পড়েছে।
দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে চিত্রটা ছিল আরও হতাশাজনক। কলকাতার ঐতিহাসিক ইডেন গার্ডেন্স; যে মাঠে বাংলাদেশ থাকলে গ্যালারি কানায় কানায় ভরে যাওয়ার কথা, সেখানেই দেখা গেল শূন্যতার ভয়াবহ রূপ। বাংলাদেশের বদলে বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া স্কটল্যান্ড মাঠে নামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। অথচ সেই ম্যাচে গ্যালারি ছিল মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করা। বিশাল স্টেডিয়ামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে থাকা অল্প কয়েকজন দর্শক পুরো দৃশ্যটাকে আরও বেমানান করে তোলে।
মাঠে অবশ্য স্কটল্যান্ড খেলেছে দারুণ সাহসী ক্রিকেট। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেওয়া ১৮৩ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নিয়ে নেয় তারা। কিছু সময়ের জন্য হলেও মনে হচ্ছিল অঘটনের সম্ভাবনা আছে। তবে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার জোরে ম্যাচ নিজেদের করে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। রোমারিও শেফার্ড হ্যাটট্রিকসহ মোট পাঁচ উইকেট নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন।
দুটি ম্যাচ, দুটি ভেন্যু কিন্তু একই চিত্র। দর্শকহীন গ্যালারি আর নিস্তব্ধ পরিবেশ। বাংলাদেশ না থাকায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা ঢাকতে পারছে না কোনো দল, কোনো প্রচার। ক্রিকেটপ্রেমীদের বড় অংশের আগ্রহ যে বাংলাদেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, প্রথম দিনের দৃশ্যই তার বাস্তব প্রমাণ।
বিশ্বকাপ মানেই উত্তেজনা, উন্মাদনা আর গ্যালারির গর্জন। কিন্তু বাংলাদেশহীন এই বিশ্বকাপে সেই পরিচিত আবহ নেই। মাঠে খেলা চলছে, ফল আসছে, পয়েন্ট টেবিল বদলাচ্ছে; তবু কোথাও যেন একটা বড় ফাঁক রয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠছে, নিরাপত্তা ও নীতির লড়াইয়ে বাংলাদেশকে বাইরে রেখে কি আদৌ বিশ্বকাপের সেই পূর্ণতা পাওয়া সম্ভব? প্রথম দিনের সুনসান চিত্রই যেন সেই প্রশ্নের নীরব উত্তর দিয়ে দিচ্ছে।
সময়ের আলো/এআর