আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আগেই বলা হয়েছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থান করে নেবে। তবে তাদের কথায় খুব বেশি আস্থা রাখতে পারেননি সাধারণ মানুষসহ অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু দিন শেষে সব অশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে নির্বিঘ্নে নিরাপদে নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন সাধারণ ভোটারসহ সংশ্লিষ্ট সবাই।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পক্ষ থেকে এই সফলতাকে পেশাদারিত্বের বহিঃপ্রকাশ, সেই সঙ্গে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা বলে জানানো হয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইচ্ছা করলেই যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পেশিশক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এই নির্বাচন সেই উদাহরণটিই সৃষ্টি করেছে। তবে রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করছেন তারা।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, পূর্বঘোষণা অনুযায়ী কেন্দ্রের ভেতর বডিওর্ন ক্যামেরা নিয়ে অবস্থান করছিলেন পুলিশ সদস্যরা। প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষের সামনে অস্ত্র হাতে অবস্থান করছিলেন একজন করে আনসার সদস্য। তারা জানালেন সকালেই তারা বিশেষ অ্যাপ ‘সুরক্ষা’ রেজিস্ট্রেশন করেছেন। এই অ্যাপসহ কেন্দ্রের সিসি ক্যামেরা তাদের আত্মবিশ্বাসী করেছে। কেন্দ্রের বাইরে কিছুক্ষণ পরপরই কখনো সেনাবাহিনী, কখনো পুলিশ, কখনো বা র্যাব সেই সঙ্গে নৌ ও বিমানবাহিনী এবং বিজিবি সদস্যদেরও টহল দিতে দেখা যায়। ফলে অধিকাংশ কেন্দ্রের সামনেই অযাচিত জটলা করতে দেখা যায়নি কাউকে।
সরেজমিন দেখা যায়, বেলা ১১টার দিকে ঢাকা-৬ আসনে শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় কেন্দ্রে একজন প্রার্থীর পক্ষের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন কর্মী-সমর্থক প্রবেশের চেষ্টা করেন। দলবদ্ধভাবে বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেখে আগত ভোটারদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়। কিন্তু কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও আনসার সদস্যরা কঠোরভাবে তাদের প্রবেশে বাধা দেন। বাধা পেয়ে তারা আর ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন ভূমিকার প্রকাশ্যে প্রশংসা করেন ভোটাররা। হাটখোলার বাসিন্দা ভোটার নীলিমা বলেন, পুলিশ-আনসার সদস্যরা এভাবে তাদের কর্তব্য পালন করলে ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে এসে তাদের ভোট দিতে পারে। আমরা এমন পুলিশই চাই।
শের-ই-বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে সেলফি তুলছিলেন হায়দার আলী। ভোটের পরিবেশ কেমন ছিল জিজ্ঞেস করলে হাসি মুখে বললেন, ‘চমৎকার, দীর্ঘদিন পর ভোট দিতে পেরেছি। আর এই ভয়মুক্ত পরিবেশ উপহার দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খরা রক্ষাকারী বাহিনীর সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
বেলা সোয়া ৩টা। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের জটলা। যদিও ভোটার উপস্থিতি ছিল বেশ কম। এরই মধ্যে সাইরেন বাজিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুটি মাইক্রোবাস এবং একটি জিপ এসে থামে সেখানে। মুহূর্তে কেন্দ্রের সামনে থেকে জটলা সরে যায়। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সবাইকে আইন অনুযায়ী কেন্দ্রের সামনে থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থান করতে অনুরোধ জানানো হয়। সবাই বিনাবাক্যে তা পালনও করেন। প্রায় ৩০ মিনিট এই কেন্দ্রের সামনে অবস্থান করে দেখা যায় দুবার পুলিশের জিপ এবং একবার সেনাবাহিনীর টহল টিম কেন্দ্রের সামনে দিয়ে টহল দেয়।
এই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং অফিসার মাহমুদুল হাবিব বলেন, ভোটের আগের দিন থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। কেন্দ্রের আশপাশে অস্থায়ী যেসব দোকান ছিল সবই আগের দিনই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের সামনে কোনো জটলা সৃষ্টি করতে দেননি তারা। প্রার্থীদের কোনো কর্মী-সমর্থককে অযাচিত প্রবেশ রোধ করতে কঠোর ছিলেন তারা ।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে কথা হয় স্থানীয় বিএনপি নেতা মারুফ হোসেনের সঙ্গে। ঢাকা-১২ আসনে বিএনপিদলীয় একজন প্রার্থীর পক্ষে কর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। জানালেন, কার সঙ্গে আমরা মারামারি করব? এই আসনে জামায়াত, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সবাই তো আমরা এক। একসঙ্গে দীর্ঘ ১৫ বছর নির্যাতন ও কারাভোগ করেছি। জেলখানায় একসঙ্গে এক কাপ চা ভাগ করে খেয়েছি। আজকের নির্বাচনের পর সবাই আমরা এক হয়ে যাব।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সরকার, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই নির্বাচনটিকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে তাদের সর্বোচ্চটা করেছেন বলেই শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই নির্বাচনটা একটা উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। আর তা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইচ্ছে করলেই নির্বাচনে অর্থ ও পেশিশক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। দায়িত্বশীলরা তাদের দায়িত্বটা যথাযথভাবে পালন করতে পারলে যেকোনো পরিস্থিতিই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এই অপরাধ বিশেষজ্ঞের মতে, এবারে নির্বাচন প্রায় সংঘাতমুক্ত হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে অংশগ্রহণকারী প্রধান দুটি দলই তাদের বিজয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। ফলে কোনো দলই চাননি কোনা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম হোক। যাতে ভোটারদের ভেতর ভীতির সঞ্চার হয়।
যেকোনো নির্বাচনই দুপর্বের খেলা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি হচ্ছে নির্বাচন কালীন এবং অপরটি হচ্ছে ফলাফলের পর। প্রথম পর্বে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক ছিল। এখন ফলাফল পরবর্তী দ্বিতীয় পর্বও যদি সংঘাতমুক্ত হয় তা হলেও আমরা একটি শান্তিপূর্ণ ভোট উপহার পেয়েছি বলে ধরে নিতে পারব।
পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক, এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশ পুলিশ সন্তোষ প্রকাশ করছে। নির্বাচনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল এই সফলতা।
এফআর