নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আলোচনায় মার্কিনিরা আগ্রহী হলে পরমাণু চুক্তিতে পৌঁছাতে তেহরানও ছাড়ের বিষয়টি বিবেচনা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন ইরানি এক মন্ত্রী। যুক্তরাষ্ট্র নয়, দুই পক্ষের আলোচনায় অগ্রগতি ইরানের কারণেই থমকে আছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা বারবারই দাবি করে আসছেন। শনিবার তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি করতে আগ্রহী, কিন্তু ইরানের সঙ্গে চুক্তি করা খুব কঠিন। তবে তেহরানে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভাঞ্চি বলেছেন উল্টো কথা। তার মতে, ‘বল এখন আমেরিকার কোর্টে রয়েছে, যেখান থেকে তারা যে চুক্তি চায় তা তারা প্রমাণ করতে পারে। যদি তারা আন্তরিক হয়, আমি নিশ্চিত যে আমরা একটি চুক্তির পথে অগ্রসর হতে পারব।’
তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা নিয়ে কোনো চুক্তিতে উপনীত না হলে ইরানের ওপর হামলার হুমকি রয়েছে ট্রাম্পের। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটন ক্রমশ তাদের সামরিক শক্তিও বৃদ্ধি করে চলেছে। তার মধ্যেই ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে উপসাগরীয় দেশ ওমানে পরোক্ষ আলোচনায় বসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মঙ্গলবার জেনেভায় ওই আলোচনার দ্বিতীয়পর্ব হবে বলে নিশ্চিত করেছেন তাখত-রাভাঞ্চি। তিনি বলেছেন, দুই পক্ষকেই আলোচনায় মোটামুটি ইতিবাচকই দেখা যাচ্ছে, তবে এখনও এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। ট্রাম্পও ওমানের আলোচনাকে ইতিবাচক বলেছিলেন। ইরানি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ছাড়ে যে আগ্রহ আছে তার প্রমাণস্বরূপ তেহরান এরই মধ্যে তাদের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে।
অস্ত্র বানানোর কাছাকাছি পর্যায়ের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরানের হাতে থাকায় শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর পথে রয়েছে বলে অনেকের সন্দেহ। ইরান অবশ্য শুরু থেকেই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে আসছে। ‘আমরা এটি এবং আমাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ক অন্যান্য বিষয় নিয়েও আলোচনা করতে প্রস্তুত, যদি তারা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কথা বলতে প্রস্তুত থাকে’, বিবিসিকে বলেছেন তাখত-রাভাঞ্চি। তবে নিষেধাজ্ঞা বলতে তিনি কী সব নিষেধাজ্ঞাই বুঝিয়েছেন, না সামান্য কিছু তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
২০১৫ সালের চুক্তির মতো ইরান তার চার শতাধিক কেজির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে রাজি হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ইরানি এ মন্ত্রী বলেন, ‘আলোচনার পথে কখন কী ঘটে যায় তা নিয়ে আগে থেকে কিছু বলা মুশকিল।’ এক দশকেরও বেশি সময় আগেকার বহুপক্ষীয় ওই চুক্তিতে রাশিয়া ইরানের কাছ থেকে কম সমৃদ্ধ ১১ হাজার কেজির ইউরেনিয়াম নিয়েছিল। এবারও তারা একই ভূমিকা রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নানা ধরনের প্রস্তাবের কথা পশ্চিমা গণমাধ্যমেও ঘোরাঘুরি করছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে তেহরান তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বসার ক্ষেত্রে ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল, আলোচনা কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েই হতে হবে। ‘আমাদের ধারণা, চুক্তি চাইলে যে পারমাণবিক ইস্যুতেই মূল মনোযোগ রাখা উচিত সেটা তারা বুঝেছে। শূন্য সমৃদ্ধকরণ বিষয়টি আর নেই, ইরান যতখানি জানে তাতে এটা মনে হয় আর আলোচনার টেবিলে উঠছে না’, বলেছেন তিনি। এটা সত্য হলে বোঝা যাচ্ছে, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালাতেই পারবে না বলে যুক্তরাষ্ট্র এতদিন ধরে যে হুংকার দিয়ে এসেছিল, ওয়াশিংটন সেখান থেকে পিছু হটেছে।
তেহরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা করবে না বলে ইরানি কর্মকর্তারা আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। ইসরাইল চায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য যেকোনো চুক্তিতে যেন এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার কথা থাকে। গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলি হামলার পাল্টায় ইরান তাদের নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েই জবাব দিয়েছিল। এসবের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদদ দেওয়া থেকেও তেহরানকে বিরত থাকতে হবে, মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার জোরের সঙ্গে এটাই বলছেন।
কিন্তু তাখত-রাভাঞ্চি জানিয়েছেন, আলোচনা কেবল পরমাণু কর্মসূচি ইস্যুতেই সীমিত। তিনি বলেন, ‘যখন আমরা ইসরাইলি এবং আমেরিকানদের দ্বারা আক্রান্ত হই, আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রই আমাদের উদ্ধারে এগিয়ে এসেছিল। তা হলে কী করে আমরা আমাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ত্যাগ করার কথা ভাবতে পারি।’ জ্যেষ্ঠ এ কূটনীতিক সাম্প্রতিক আলোচনায় বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এক দশক আগেকার পরমাণু চুক্তির আলোচনায়ও ভূমিকা রাখা তাখত-রাভাঞ্চি সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে উদ্বিগ্ন।
তাখত-রাভাঞ্চি আরও বলেন, আমরা শুনছি যে তারা আলোচনায় আগ্রহী। তারা সেটা জনসমক্ষে বলছে, ওমানের মাধ্যমে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলোচনায়ও তারা বলছে, তারা এ বিষয়টি শান্তিপূর্ণ উপায়ে শেষ করতে চায়। কিন্তু ট্রাম্প এখন আবার ইরানে শাসনব্যবস্থা বদলের কথাও বলছেন। তার মতে, সেটাই হবে ইরানের জন্য সবচেয়ে ভালো। ব্যক্তিগত পর্যায়ের আলোচনায় এসব শুনছি না আমরা। তিনি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন, আরেকটি যুদ্ধ হবে মারাত্মক, সবার জন্য খারাপ, সবাই ভুগবে, বিশেষ করে তারা যারা এই আগ্রাসন শুরু করবে।
মার্কিন অভিযানকে ইরান ‘টিকে থাকার লড়াই’ হিসেবে দেখবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যদি আমাদের মনে হয় এটি অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ, তা হলে আমরা সেই অনুযায়ী জবাব দেব। তবে এমন কোনো বিপজ্জনক দৃশ্যপটের কথা চিন্তা করাও বুদ্ধিমানের হবে না, কারণ সে ক্ষেত্রে পুরো অঞ্চলজুড়েই তুমুল বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।’
ইরান এর আগেও বলেছে, তাদের ওপর কোনো হামলা হলে অঞ্চলটিতে থাকা সব মার্কিন ঘাঁটি তাদের বৈধ নিশানায় পরিণত হবে। গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ইরান কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে সীমিত আকারে হামলা চালিয়েছিল। সাধারণত এ ধরনের পাল্টা হামলার ক্ষেত্রে মার্কিন সেনারা যেন হতাহত না হয়, তা নিশ্চিতে চেষ্টা করে ইরান। তবে এবার সে ধরনের সতর্কতা নাও থাকতে পারে, বলেছেন তাখত-রাভাঞ্চি।
ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গত কিছু দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখেছেন। ওই দেশগুলোর কর্মকর্তারা এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন করে যুদ্ধ যেন না বাধে সেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যুদ্ধের প্রভাব যে মারাত্মক হবে তারা তা ওয়াশিংটনকে বোঝানোরও চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
‘এই অঞ্চলে যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রায় সর্বসম্মত ঐকমত্য দেখতে পাচ্ছি আমরা। আশাবাদী যে আমরা কূটনীতির মাধ্যমে এর সমাধান করতে পারব, যদিও আমরা ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হতে পারি না। এ জন্য ইরানকে সতর্কও থাকতে হচ্ছে, যেন কোনো কিছু আমাদের চমকে না দেয়’, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা চলাকালে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে ইসরাইলের হামলার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন ইরানি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ইসরাইল এবারও আলোচনাকে পথচ্যুত করার চেষ্টা করছে বলে তেহরানের অভিযোগ।
দুই পক্ষের স্বার্থ এবং উদ্দেশ্যের পার্থক্য থাকায় শিগগিরই তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে বলে অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন না। তবে তাখত-রাভাঞ্চি বলছেন, চুক্তিতে পৌঁছানো যাবে এ আশা নিয়েই ইরান জেনেভায় আলোচনার পরবর্তী রাউন্ডে যাবে। পরিশেষে তিনি বলেন, ‘আমরা সেরা চেষ্টাটাই করব, কিন্তু অন্যপক্ষকেও এটা প্রমাণ করতে হবে যে তারা আন্তরিক।’
সময়ের আলো/এসকে/