দেশের সংসদীয় প্রথম আসন হিসেবে পঞ্চগড়ের রাজনৈতিক সমীকরণে প্রায় দেড় যুগ পর এলো বড় ধরনের পরিবর্তন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসনে বিজয়ী হওয়ার মাধ্যমে নিজের বাবার হারানো আসন পুনরুদ্ধার করলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমির। একসময় বিএনপির অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে জেলায় দলটিতে ফিরেছে হারানো গৌরব।
উত্তরাধিকার ও হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার : পঞ্চগড়-১ আসনটি (সদর, আটোয়ারী ও তেঁতুলিয়া) একসময় বিএনপির অবিসংবাদিত দুর্গ ছিল। ১৯৯১ সালে এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক স্পিকার মির্জা গোলাম হাফিজ। এরপর ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে টানা দুবার জয়ী হন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার।
তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়। এরপর দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল আসনটি। এবারের নির্বাচনে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের সুযোগ্য পুত্র আসনটি পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে নওশাদ জমির দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটালেন।
নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি : বিজয় অর্জনের পর নওশাদ জমিরের বক্তব্যে রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের আভাস পাওয়া গেছে। তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, দলমত নির্বিশেষে আমরা আমাদের জেলার জন্য সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চাই। আমাদের মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু পঞ্চগড়ের স্বার্থে আমরা সেই মতপার্থক্যের জায়গাতেও একমত হব।
ক্লিন ইমেজ বনাম বিপ্লবী তারুণ্যের লড়াই : নির্বাচনি মাঠে নওশাদ জমিরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ১১ দলীয় জোটের জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অগ্রনায়ক এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে সারজিস আলমের পক্ষে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা দলগুলো সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নামে। তবে নওশাদ জমিরের ক্লিন ইমেজ এবং পরিমার্জিত আচরণ সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আলাদা আবেদন তৈরি করে। তৃণমূল পর্যায়ের ভোটারদের মতে, উত্তরাধিকারের রাজনীতির পাশাপাশি নওশাদ জমিরের ব্যক্তিগত শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি জয়ের পাল্লা ভারী করেছে।
কথা হয় তেঁতুলিয়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নুরুজ্জামান দুলালের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, আমাদের প্রিয় নেতা নওশাদ জমির একজন উচ্চশিক্ষিত ও সজ্জন মানুষ। আমরা যখন ঘরে ঘরে গিয়েছি, মানুষ তার পারিবারিক ঐতিহ্য ও উন্নয়নের কথা স্মরণ করেছে। ভোটের দিন তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে। আমাদের নেতা ক্লিন ইমেজের। তিনি এমপি নির্বাচিত হয়ে বাবার আসন পুনরুদ্ধার করে বিএনপির হারানো গৌরব ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমরা সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি তাকে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে মন্ত্রী হিসেবে দেখার জন্য।
ভোটের পরিসংখ্যান : গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসনে সর্বমোট ১৫৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোট গ্রহণ শেষে ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির ১ লাখ ৭৬ হাজার ১৬৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সারজিস আলম পেয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯ ভোট। মাত্র ৮ হাজার ১২০ ভোটের এই সূক্ষ্ম ব্যবধানই প্রমাণ করে লড়াইটি ছিল অত্যন্ত তীব্র।
তেঁতুলিয়া উপজেলা বিএনপির ওলামা দলের অহ্বায়ক সোহরাব আলী বলেন, পঞ্চগড়-১ আসনে বিএনপির যে ঐতিহ্য ছিল নওশাদ জমিরের হাত ধরে তা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলো। এখন আমাদের লক্ষ্য উন্নয়নের রাজনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমরা আশা করছি পঞ্চগড়-১ এবং ২ আসনে নওশাদ জমির ও ফরহাদ হোসেন আজাদকে আমাদের লিডার তারেক রহমান তার মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখবেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নওশাদ জমিরের এই বিজয় কেবল একটি আসনের জয় নয়, বরং এটি পঞ্চগড়ে বিএনপির সাংগঠনিক ভিতকে নতুন করে সুসংহত করার বার্তা। বিশেষ করে বিএনপির আগামী দিনের সরকার গঠনে নওশাদ জমির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা (মন্ত্রিত্বের আলোচনা) পালন করতে পারেন এমন প্রত্যাশা স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। প্রায় ১৮ বছর পর বাবার আসন ফিরে পাওয়ার এই আবেগঘন বিজয় পঞ্চগড়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
এফআর