আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তারেক রহমান

মো. জসিম উদ্দিন

মতামত

একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো রুল অব ল বা আইনের শাসন। যেখানে আইন সবার জন্য সমান এবং কেউ

2026-02-17T04:37:08+00:00
2026-02-17T04:37:08+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
মতামত
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তারেক রহমান
মো. জসিম উদ্দিন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:৩৭ এএম 
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীত
একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো রুল অব ল বা আইনের শাসন। যেখানে আইন সবার জন্য সমান এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে আইনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের একটি দীর্ঘ ও নেতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ঘোষণা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল ও বিরোধী দল বিবেচনা হবে না, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান থাকবে রাজনৈতিক মহলে এক নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নাকি আগামীর বাংলাদেশের জন্য একটি সুদূরপ্রসারী অঙ্গীকার, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত : তারেক রহমানের এই বার্তার প্রধান সম্ভাবনা হলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতির অবসান। বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ক্ষমতায় থাকা দল প্রায়শই বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধী মত দমন করেছে। বিশ্বব্যাংক ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগের অভাব বারবার ফুটে উঠেছে।

তারেক রহমান যখন ঘোষণা করেন যে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকলেও নিজের দলের কেউ আইনের ছাড় পাবে না, তখন সেটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ইঙ্গিত দেয়। যদি এই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ একটি ক্লিন ইমেজের রাজনীতিতে প্রবেশ করতে পারবে।
পরিসংখ্যান ও বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট : ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (ডব্লিউজেপি) ২০২৪ সালের রুল অব ল ইনডেক্স অনুযায়ী, আইনের শাসনের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় এবং বিশ্বজুড়ে এখনও সন্তোষজনক নয়। বিশেষ করে সিভিল জাস্টিস এবং ক্রিমিনাল জাস্টিস বিভাগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ একটি বড় প্রতিবন্ধক।

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা : বর্তমানে বাংলাদেশে ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা প্রায় ৪২ লাখের বেশি।

রাজনৈতিক মামলা : গত ১৫ বছরে হাজার হাজার রাজনৈতিক মামলার কারণে বিচারব্যবস্থার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তারেক রহমানের এই সমতার নীতি সেই জট খোলার পথ দেখাতে পারে। যদি ক্ষমতাসীন দল নিজের কর্মীদের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে, তবে বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। এটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতেও সহায়ক হবে, কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সর্বদা আইনি নিশ্চয়তা খোঁজেন।

আইনের শাসন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সেতুবন্ধ : তারেক রহমানের এই ঘোষণা কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক দর্শনেরও বহিঃপ্রকাশ। কারণ আধুনিক অর্থনীতিতে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং টেকসই উন্নয়নের প্রধান শর্তই হলো আইনি নিশ্চয়তা। বিনিয়োগকারীরা পুঁজি বিনিয়োগের আগে ‘সম্পত্তির অধিকার’ এবং চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা খোঁজেন। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, যেসব দেশে আইনের শাসন শক্তিশালী, সেখানে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কম থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদি জিডিপি প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল হয়। যদি এই রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি বৈষম্যহীন বিচারিক পরিবেশ নিশ্চিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলোর কাছে আমাদের দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, যা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। চ্যালেঞ্জগুলো তারেক রহমানের এই রূপকল্প বাস্তবায়নে বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে

তৃণমূলের রাজনৈতিক সংস্কৃতি : কেন্দ্রে সদিচ্ছা থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় ক্যাডার বা প্রভাবশালী নেতাদের নিয়ন্ত্রণ করা সবসময়ই কঠিন। দলীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের দীর্ঘদিনের অভ্যাস পরিবর্তন করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা : পুলিশ এবং বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। দীর্ঘদিনের দলীয়করণের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো যে কাঠামোগত দুর্বলতায় ভুগছে, তা থেকে বের করে আনতে শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি : দল ক্ষমতায় থাকলে নিজেদের লোকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য একটি নিরপেক্ষ অভ্যন্তরীণ তদন্ত সেল বা শক্তিশালী অম্বুডসম্যান ব্যবস্থার অভাব রয়েছে।

৩১ দফার প্রতিফলন ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা : বিএনপি ইতিমধ্যে যে ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণা করেছে, সেখানেও ক্ষমতার ভারসাম্য এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের কথা বলা হয়েছে। তারেক রহমানের এই সাম্প্রতিক বক্তব্য মূলত সেই ৩১ দফারই একটি প্রয়োগিক প্রতিফলন। তিনি মূলত একটি সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ গড়ার কথা বলছেন, যেখানে অপরাধী কেবলই একজন অপরাধী, তার কোনো দলীয় পরিচয় থাকবে না।

উত্তরণের পথ ও সুপারিশ : তারেক রহমানের এই যুগান্তকারী ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার। এই লক্ষ্য অর্জনে নিচের পাঁচটি পদক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে

১. স্বাধীন বিচার বিভাগ নিশ্চিতকরণ : মাসদার হোসেন মামলার ঐতিহাসিক রায়ের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং উচ্চ ও নিম্ন আদালতে বিচারক নিয়োগের জন্য একটি স্বতন্ত্র ‘বিচারিক নিয়োগ কমিশন’ গঠন করতে হবে। এর ফলে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের খবরদারি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে নিরপেক্ষভাবে রায় প্রদানের শক্তি অর্জন করবে।

২. পুলিশ বাহিনীর আমূল সংস্কার : ব্রিটিশ আমলের ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন পরিবর্তন করে একটি আধুনিক ও জনবান্ধব পুলিশ অধ্যাদেশ প্রণয়ন করতে হবে, যাতে পুলিশকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহারের পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো নির্দিষ্ট দলের সেবক না বানিয়ে রাষ্ট্রের সেবকে পরিণত করার আইনি নিশ্চয়তা দিতে হবে।

৩. রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন : দলীয় নেতাকর্মীদের মনস্তত্ত্বে এই বার্তাটি স্পষ্টভাবে প্রোথিত করতে হবে যে, ক্ষমতায় থাকা মানে আইন ভাঙার বিশেষ অধিকার বা লাইসেন্স পাওয়া নয়। অপরাধ করলে দলীয় পরিচয়ের কোনো সুরক্ষা মিলবে নাÑ এই কঠোর বার্তাটি তৃণমূল পর্যন্ত কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে হবে এবং অপরাধী নেতাকে দল থেকে বহিষ্কারের সংস্কৃতি চালু করতে হবে।

৪. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও ক্ষমতার ভারসাম্য : রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে সংসদে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে ‘দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ’ ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতায় লাগাম টানার আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। এতে একক ব্যক্তির বা দলের স্বেচ্ছাচারিতা রোধ হবে এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় তদারকি বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নিশ্চিত হবে।

৫. শক্তিশালী ন্যায়পাল নিয়োগ : সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একজন শক্তিশালী ন্যায়পাল নিয়োগ দিতে হবে, যিনি সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার তদন্ত করতে পারবেন। এই পদটি কার্যকর হলে সরকারি দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও সাধারণ নাগরিকরা অভিযোগ করার সাহস পাবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।

পরিশেষে বলতে পারি, তারেক রহমানের বার্তাটি বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের প্রতিফলন। মানুষ এমন এক বাংলাদেশ চায় যেখানে সাধারণ নাগরিক আর প্রভাবশালী নেতার বিচার হবে একই মানদণ্ডে। এটি নিঃসন্দেহে একটি সাহসী এবং সময়োপযোগী ঘোষণা। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে ক্ষমতায় যাওয়ার পর এই প্রতিশ্রুতির প্রতি দলের অবিচল আনুগত্যের ওপর। যদি ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ নীতিটি বাস্তবে কার্যকর হয়, তবে তা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং দেশের গণতন্ত্রকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ
জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর



  বিষয়:   আইন  শাসন  তারেক রহমান 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: