সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ধাম। তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক শিব চতুর্দশী মেলা মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। ভক্তি, শ্রদ্ধা আর আধ্যাত্মিক আবহমণ্ডলে ঘেরা এই মেলায় অংশ নিতে দেশ-বিদেশের লাখো পুণ্যার্থীর পদচারণে মুখরিত হয়ে ওঠে পাহাড়ঘেরা সীতাকুণ্ড।
মেলার প্রথম দিন পুণ্যার্থীর সংখ্যা কিছুটা কম থাকলেও দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ সোমবার থেকে পাল্টে যায় চিত্র। সরজমিনে দেখা গেছে, সীতাকুণ্ডের অলিগলি থেকে শুরু করে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তÍ ছাড়াও প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও শত শত সাধু-সন্ন্যাসী ও তীর্থযাত্রী এই মেলায় যোগ দিয়েছেন।
মেলার শেষ দিনেও পুণ্যার্থীদের ঢল নেমেছে। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দিরে দর্শন এবং নিচে বিভিন্ন মঠ-মন্দিরে পূজা অর্চনার মাধ্যমে পুণ্য লাভের আশায় ব্যাকুল ভক্তরা। বিশেষ করে পুণ্যস্নান, অর্পণ ও শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে অনেককে।
এদিকে মেলা চলাকালে তীর্থযাত্রীদের থাকা-খাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মেলা স্রাইন কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট চন্দন দাশ জানান, ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে মেলা কমিটি ও স্থানীয় সেবাশ্রমগুলো। প্রতি বছর মেলায় আসা সাধু-সন্ন্যাসী ও ভক্তদের জন্য লোকনাথ সেবা আশ্রম, ননী গোপাল যাত্রী নিবাস, প্রয়াত সুকুমার ধর তীর্থযাত্রী নিবাস, শংকরমঠ, গিরিস ধর্মশালা ও জগন্নাথ মন্দিরে বিশেষ আবাসন ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন রেস্ট হাউসগুলো তীর্থযাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে দূরদূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মেলা উপলক্ষে সীতাকুণ্ড স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর জন্য ২ থেকে ৩ মিনিটের বিশেষ যাত্রা বিরতির ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা ভক্তদের যাতায়াতকে অনেকটা সহজতর করেছে।
এ ছাড়া বিশাল এই জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মেলা কমিটির সভাপতি ও সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনকে ঘিরে মেলাপ্রাঙ্গণ সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশ ও র্যাবের সমন্বয়ে কড়া নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক মেলাপ্রাঙ্গণে সার্বক্ষণিক কাজ করছেন, যাতে ভক্তদের পূজা অর্চনায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।
মেলার গুরুত্ব ও সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে চাইলে মেলায় আগত মহিমা চৌধুরী জানান, শিব চতুর্দশী মেলা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি সীতাকুণ্ডের হাজার বছরের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অংশ। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত মন্দিরগুলোতে ওঠার প্রতিটি ধাপে বিরাজ করছে এক অলৌকিক প্রশান্তি।
মেলার শেষ দিন বিকালে বিশেষ আরতি ও প্রার্থনার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে এই মহাযজ্ঞের। মেলার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও তীর্থযাত্রীদের অনেকে কয়েক দিন এখানে অবস্থান করবেন। আর মেলার অনেক দোকানপাট রয়ে যাবে দুসপ্তাহ পরের দোলপূর্ণিমার জন্য। আবার অনেক পুণ্যার্থী তাদের হৃদয়ে ভক্তির রসদ নিয়ে ফিরবেন নিজ নিজ গন্তব্যে, এই প্রত্যাশায় যে আগামী বছর আবারও মহাদেবের চরণে নিবেদন করবেন তাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সময়ের আলো/কেএইচও