মসজিদের সামনে ইমামের জন্য অপেক্ষায় ছিল ফুল দিয়ে সাজানো সুসজ্জিত একটি গাড়ি। জুমার নামাজ শেষে আগে থেকে প্রস্তুত করা উপহার সামগ্রী তুলে দেওয়া হয় তার হাতে। মুসল্লিদের ভালোবাসা ও সম্মান গ্রহণ করে তিনি গাড়িতে ওঠেন। উপস্থিত মুসল্লিরা গাড়িটি রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দেন, অনেকে আবার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেন তাকে। দীর্ঘ ৪৮ বছর ইমামতি শেষে এভাবেই রাজকীয় বিদায় দেওয়া হয় নোয়াখালীর হাতিয়ার বুড়িরচর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বশির উল্যাহ আমিন জামে মসজিদ-এর ইমাম মাওলানা নুরুজ্জামানকে।
স্থানীয়রা জানান, ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বুড়িরচর ইউনিয়নের এই মসজিদ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এখানে ইমামতি করে আসছিলেন মাওলানা নুরুজ্জামান। পাশাপাশি তিনি মক্তবের শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সামান্য বেতনে এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি।
বর্তমানে বয়সের ভারে ন্যুব্জ ও অসুস্থ হয়ে পড়ায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না তিনি। শারীরিক অসুস্থতার কারণেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এরপর মসজিদ কমিটি তাকে সম্মানজনক বিদায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন উপহার সামগ্রী, ফুল দিয়ে সাজানো হয় গাড়ি এবং আয়োজন করা হয় আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার।
গত শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) জুমার নামাজের পর মসজিদ প্রাঙ্গণে বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ব্যানার টানানো হয়, একে একে স্মৃতিচারণ করেন বক্তারা। ফুলের তোড়া, নগদ অর্থ ও নানা উপহার সামগ্রী তুলে দেওয়া হয় তার হাতে।
প্রবীণ মুসল্লি আনোয়ারুল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সাবেক প্রধান শিক্ষক শামছুল তিব্রিজ, মাস্টার বোরহানুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা কামাল পাশা, মাস্টার অজি উল্লাহ, হুমায়ুন কবির সেলিম, শিক্ষক মাহফুজুল হক কাউয়ুমসহ অনেকে।
বক্তারা বলেন, দীর্ঘ জীবনে নানা প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি দায়িত্বে অবিচল ছিলেন। সাবেক প্রধান শিক্ষক শামছুল তিব্রিজ বলেন, এই গ্রামে এমন পরিবার আছে, যাদের তিন প্রজন্ম এই ইমামের ছাত্র। তাকে উপযুক্ত বেতন-ভাতা দেওয়া সম্ভব হয়নি। মসজিদের সামান্য জমি ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো পারিশ্রমিক তিনি পাননি। এরপরও দায়িত্ব পালনে তিনি কখনো অবহেলা করেননি। আজকের আয়োজনও তার অবদানের তুলনায় সামান্য।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে মুসল্লিরা ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন উপহার সামগ্রী এনে তার হাতে তুলে দেন। পরে সবাই হাত ধরে তাকে গাড়িতে বসান। এ সময় পথের দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুরা ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাকে বিদায় জানায়। ফুলে সাজানো গাড়িতে করে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। বিদায়ের মুহূর্তে অনেক মুসল্লিই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
দীর্ঘ দায়িত্ব পালনের পর এমন আয়োজন দেখে আবেগাপ্লুত হন মাওলানা নুরুজ্জামান ও তার পরিবারও। তিনি বলেন, আমি যা আশা করিনি, তার চেয়েও বেশি সম্মান দিয়ে তারা আমাকে বিদায় দিয়েছে। জীবনের শেষ সময়ে এসে কাজের স্বীকৃতি পেয়ে খুব ভালো লাগছে।
সময়ের আলো/জোই