নতুন ম্যান্ডেট : রাষ্ট্রপথের অগ্রাধিকার

অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার সাহা

বিবিধ

শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। ভোটের দিনটি ছিল ঈদের ন্যায় আনন্দের এক ব্যতিক্রমী গণতন্ত্রের উৎসব। যেখানে তুলনামূলকভাবে সহিংসতা ছিল কম,

2026-02-22T05:17:36+00:00
2026-02-22T05:17:36+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
বিবিধ
নতুন ম্যান্ডেট : রাষ্ট্রপথের অগ্রাধিকার
অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার সাহা
প্রকাশ: রোববার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫:১৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। ভোটের দিনটি ছিল ঈদের ন্যায় আনন্দের এক ব্যতিক্রমী গণতন্ত্রের উৎসব। যেখানে তুলনামূলকভাবে সহিংসতা ছিল কম, মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে, ভোট প্রয়োগের ক্ষেত্রে তারুণ্যের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মতো। 

ফলাফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ল্যান্ডস্লাইড বিজয় অর্জন করেছে। জয়ী ও বিজিত উভয় দলকেই গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন রইল। বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছে। নির্বাচন মানে কেবল সরকার গঠন নয়; এটি নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের এক নৈতিক চুক্তি, যেখানে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে জনগণ আস্থা রেখেছে জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য। এখন প্রশ্ন, সেই আস্থার প্রতিদান রাষ্ট্র কীভাবে দেবে ভবিষ্যতেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়, তবে জনগণের পক্ষে কাজ করার সুযোগও রয়েছে। এ জন্য এই সন্ধিক্ষণে প্রয়োজন সংযমসহ দূরদর্শিতামূলক রাষ্ট্রচিন্তা। যেখানে জনগণের আস্থা অর্জন হবে সাফল্যের মূলভিত্তি, যা নির্বাচনি সরকারের কাছে সবারই কাম্য। এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিষয়ে নির্বাচিত সরকার প্রাথমিক অগ্রাধিকার প্রদান করলে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সহজতর হতে পারে। 

প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্য। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিভাজন স্বাভাবিক; কিন্তু সেটি যেন কোনোমতে দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাসে রূপ না নেয়, তা হলে উন্নয়নের কাক্সিক্ষত গতিপথ ব্যাহত হবে। সংসদকে হতে হবে কার্যকর বিতর্কের জায়গা, যেখানে বিরোধী মতকে ইতিবাচকভাবে হিসেবে নিতে হবে, শত্রু হিসেবে নয় বরং গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় অংশীদার হিসেবে দেখা উচিত। প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সহনশীলতা বাড়লে দেশের সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বেই। 


দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনা জরুরি। মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। মধ্যবিত্তের সঞ্চয় দ্রুতগতিতে কমে যাচ্ছে, নিম্নআয়ের মানুষ টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যতিব্যস্ত। বাজার তদারকি জোরদার, সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, কৃষি ও আমদানি নীতির সমন্বয় করে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন।  

একই সঙ্গে গার্মেন্টস শিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা ও সহজ ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়। এখানে একটি কথা ঠিক যে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কলকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এসব কারখানার প্রণোদনা ও সহজ ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে সচল রাখতে হবে। 

তৃতীয়ত দুনীর্তিবিরোধী অবস্থানকে দৃশ্যমান ও কার্যকর করতে হবে। বড় প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধি, সব সেবা খাতসহ সর্বত্র প্রশাসনিক জটিলতা ও অনিয়ম নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। ডিজিটাল গভর্ন্যান্স সম্প্রসারণ, উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া, স্বাধীন নিরীক্ষা ও জবাবদিহিতা-এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে জনগণের আস্থা বাড়বে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা স্পষ্ট হলে অর্থনৈতিক সংস্কারের ফল দেশের সর্বত্রই প্রতিফলিত হবে। 

চতুর্থত তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন। বাংলাদেশের জনমিতিক সুবিধা একদিকে শক্তি, (ডেমোক্রেটিক ডিভিডেন্টের কারণে) অন্যদিকে বড় দায়। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করতে না পেরে বেকার হচ্ছে। শিল্প খাতের চাহিদা ও শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যক্রমের মধ্যে সমম্বয় জরুরি, যাতে যুগোপযোগী শিক্ষালাভ করে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা হতে পারে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, কৃষি-প্রযুক্তিসহ বিশেষায়িত খাতে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও স্টার্টআপ সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করলে তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগবে। বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রেও মানসম্মত ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। 

পঞ্চমত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারি বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।  

স্বাস্থ্য খাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক চিকিৎসাসেবা, ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসা ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ব্যবস্থা করতে হবে। জনস্বাস্থ্যকে কেবল প্রকল্প নয়, নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। সেই সঙ্গে প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনে প্রবীণের জন্য স্বাস্থ্যনীতিতে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। 

ষষ্ঠত আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের কার্যকারিতা। মামলা জট কমানো, তদন্তে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, মানবাধিকার সুরক্ষা-এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। নাগরিক যদি ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা পায়, তবে সামাজিক স্থিতিশীলতা দৃঢ় হয়। এ ক্ষেত্রে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সমঅধিকার নীতি অপরিহার্য। আইন প্রয়োগে বৈষম্য বা রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ আস্থার সংকট তৈরি করে। নতুন সরকারকে তথাকথিত এই সংকট কাটাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। 

সপ্তমত জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষা। বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষা, নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ, বায়ুদূষণ হ্রাস এবং নবায়নযোগ্য জ¦ালানিতে বিনিয়োগ-এসব এখন বিলাসিতা নয়, বরং টেকসই পরিবেশ রক্ষায় একান্ত প্রয়োজন। উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনাকাক্সিক্ষত ঝুঁকি বাড়বে। 

অষ্টমত ডিজিটাল নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধও বাড়ছে। নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, সাইবার ফরেনসিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় সমম্বিত নীতি প্রণয়ন জরুরি। এ ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। 

সবশেষে, পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অপরিহার্য। রফতানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ, প্রবাসী আয়ের সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আস্থা ও মর্যাদা বাড়াতে অভ্যন্তরীণ সুশাসনই হবে সবচেয়ে বড় শক্তি। 

পরবর্তী সময়টি তাই কেবল ক্ষমতা গ্রহণ পর্ব নয়; এটি রাষ্ট্রচিন্তার পুনর্গঠনের সময়। জনগণ প্রত্যাশা করে-স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। বিশ্বাস করি নতুন সরকার তার ঘোষিত নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আন্তরিক হলে এই নির্বাচন হতে পারে অতীতের সামগ্রিক নেতিবাচক দুর্বলতাগুলোর অবসান ও ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা। গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন ক্ষমতা নয়- মানুষ হয় রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু। বিপুল ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত এই সরকারের ওপরে জনগণের প্রত্যাশা তাই আকাশচুম্বী। 

লেখক : প্রাক্তন অধ্যক্ষ 

সময়ের আলো/এনএ 


  বিষয়:   নতুন ম্যান্ডেট  রাষ্ট্রপথের অগ্রাধিকার 


Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: