মুসলিমদের ঘিরে ভয় ও বিদ্বেষ সৃষ্টিতে সদগুরু জগগি বাসুদেবের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তার বক্তব্যে মুসলিমদের যেন নতুন যুগের ‘ম্লেচ্ছ’ বা ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একই সময়ে রাজনীতির অঙ্গনে নিম্নবর্ণের উত্থানের প্রেক্ষাপটে মুসলিমদের এই প্রত্যাখ্যানকে একটি সমান্তরাল প্রবণতা হিসেবে দেখা যায়। বাসুদেবের আধ্যাত্মিকতার তথাকথিত ‘বিশুদ্ধ’ পরিসরে হিন্দু অস্পৃশ্যরা কোনোরকমে স্থান পেলেও, পশ্চিমা বিশ্ব—বিশেষত মুসলিম সমাজকে ‘অন্য’ পর হিসেবে দেখানো হয়।
২০১৮ সালে অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাওয়াত রাজস্থানের করণী সেনার সহিংসতা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করলে বাসুদেব বলেন, সরকারি সম্পত্তি পোড়ানো নাকি রাগ প্রকাশের এক ধরনের ভারতীয় পদ্ধতি। একটি চলচ্চিত্র নিষিদ্ধের দাবিতে তখন বাস পোড়ানোসহ নানা ভাঙচুর হয়েছিল। তিনি মন্তব্য করেন, রাষ্ট্র কয়েক দিনের জন্য এ ধরনের ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ দেয়—এটি এক ধরনের ‘অদ্ভুত প্রজ্ঞা’। তার এই ব্যাখ্যা ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তীর ‘সামষ্টিক ক্ষোভ’-এর ধারণার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ বলে মনে হয়, যেখানে জনগণ নিজেদের নৈতিকভাবে সঠিক মনে করে রাষ্ট্রকে নতি স্বীকারে বাধ্য করে।
কিন্তু ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলনের সময় তার অবস্থান পাল্টে যায়। তিনি টুইট করে বলেন, কোনো ইস্যুই সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের অধিকার দেয় না।
তার ভাষায়, বাস পোড়ানো মানে জনগণের করের টাকায় কেনা সম্পদ ধ্বংস করা। যারা এ কাজ করবে, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতি পূরণ করা উচিত। এক ভিডিও বার্তায় তিনি আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করেন এবং পুলিশি কঠোরতাকে সমর্থন করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেই ভিডিও শেয়ার করলে বক্তব্যটি আরও আলোচিত হয়।
ইশা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার বিপুল অনুসারী রয়েছে। ২০১৮ সালে সহিংস প্রতিবাদকে ‘রাগ প্রকাশ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা এবং ২০১৯ সালে কঠোর শাস্তির দাবি, এই দ্রুত অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে কী কারণ ছিল? রাজপুতদের আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি, নাকি সিএএ বিরোধী আন্দোলনে মুসলিমদের ব্যাপক অংশগ্রহণ, কোনটি এই বদলের কারণ?
ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে মুসলিম পরিচয়কে ঘিরে ভীতি ও সন্দেহের প্রবণতা লক্ষণীয়। মুসলিমদের প্রকাশ্য রাজনৈতিক উপস্থিতিকেই অনেকে ‘দেশবিরোধী’ বা ‘উদারতাবিরোধী’ মনোভাবের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। গবেষণায় দেখা গেছে, মুসলিম, তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের বিষয়ে পুলিশের মধ্যেও এ ধরনের পূর্বধারণা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সদগুরুর বক্তব্য সেই মনোভাবকে শক্তিশালী করতে পারে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের এক মুসলিম ছাত্রকে তিনি ‘তালিবানি’ বলে সম্বোধন করেছিলেন, এ ঘটনাও আলোচিত হয়। বর্ণহিন্দুদের প্রতি তার সহানুভূতি এবং তফসিলি জাতির ওপর সহিংসতা নিয়ে নীরবতা অনেকের নজরে পড়েছে।
উত্তর প্রদেশে প্রতিবাদী মুসলিমদের ওপর গুলি চালানো ও সরকারি সম্পত্তির ক্ষতির দায়ে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের বিরুদ্ধে মুসলিমদের সম্পত্তি ভাঙচুরের অভিযোগও ওঠে। এ সময় বাসুদেবের অবস্থান রাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে হয়। ২০১৮ সালের এপ্রিলে এসসি-এসটি আইনের শিথিলতার প্রতিবাদে দলিত আন্দোলনেও কঠোর বলপ্রয়োগ হয়েছিল। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে অন্তত নয়জন দলিত নিহত হন। পরে সুপ্রিম কোর্ট সেই রায় প্রত্যাহার করলেও প্রাণহানি ঘটে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি সম্পত্তির ওপর প্রতীকী আক্রমণ অনেক সময় প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। তারা রাষ্ট্র ধ্বংস করতে চায় না, বরং বৈষম্যহীন ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। এক অর্থে এটি সংবিধান ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
প্রশ্ন ওঠে, প্রতিবাদ, রাজনীতি ও নাগরিকত্বের মতো বিষয়ে বাসুদেবের মন্তব্য কি সত্যিই আলোচনাকে সমৃদ্ধ করে? তার আধ্যাত্মিকতা কি রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকা উচিত ছিল না? জাতপ্রথা, নিরামিষভোজন, শবরীমালা মন্দিরে নারীদের প্রবেশ নিষেধ বা গোরক্ষাকে তিনি এক মহান সভ্যতার অংশ হিসেবে দেখেন, যা সমালোচকদের মতে সুবিধাপ্রাপ্তদের ক্ষমতা বজায় রাখার উপাদান।
বি. আর. আম্বেদকর একসময় মুসলিমদের একমাত্রিকভাবে ‘আক্রমণকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার বিপদের কথা বলেছিলেন। পাশাপাশি ‘হিন্দু রাজ্য’ প্রতিষ্ঠার ধারণাকেও তিনি হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলে তা স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের জন্য ক্ষতিকর হবে এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
সমালোচকদের দৃষ্টিতে বাসুদেবের আধ্যাত্মিকতা শুধু অভিজাত হিন্দুদের গর্বই বাড়ায় না, বরং শ্রেণিবৈষম্যের মতাদর্শকেও জোরদার করে। এটি তথাকথিত বিশুদ্ধতাকে প্রাধান্য দিয়ে বৈষম্যকে স্বাভাবিক করে তোলে এবং রাষ্ট্রীয় কঠোরতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। তার বিশ্বদর্শনে ভারত যেন এক ‘পবিত্র’ পরিসর, যেখানে উদার গণতন্ত্রের শর্ত কেবল ‘বিশুদ্ধ’ হিন্দু নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য।
যেমন সমতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কোনো ধর্মীয় নেতাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যায় না, তেমনি সামাজিক ও রাজনৈতিক সাম্যের বিষয়ে বাসুদেবের ব্যাখ্যাকেও সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখা প্রয়োজন। তার ইংরেজিভাষী নব্য আধ্যাত্মিকতা সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদকে আরও প্রসারিত করছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মুসলিমদের ‘অন্য’, ‘আক্রমণকারী’, ‘দেশবিরোধী’ ও ‘সহিংস’ হিসেবে একরৈখিকভাবে উপস্থাপন করার প্রবণতাও এতে জোরদার হয়, যা আধুনিক প্রেক্ষাপটে ‘ম্লেচ্ছ’ ধারণার নতুন রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
/ইউএমএইচ