মশার অসহনীয় উপদ্রবে চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শীত শেষে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসজুড়ে মশার প্রকোপ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দিনের বেলা পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় থাকলেও সন্ধ্যার পর আবাসিক হলগুলো কার্যত মশার দখলে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এতে পাঠদান, স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং স্বাস্থ্য-তিনটিই হুমকির মুখে পড়েছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, পড়ার টেবিলে বসে দুই মিনিট মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। লাইব্রেরি, খাবার কক্ষ, করিডর, বারান্দা-কোথাও স্বস্তি নেই। এমনকি ক্যাম্পাসসংলগ্ন চায়ের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয়ও একই অবস্থা। সন্ধ্যার পর খোলা জায়গায় ঝাঁকে ঝাঁকে মশা উড়তে দেখা যায়।
অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে দিনের বেলাতেও মশারি টানিয়ে রাখছেন। কেউ কেউ কয়েল, অ্যারোসল বা বৈদ্যুতিক ব্যাট ব্যবহার করেও স্থায়ী সমাধান পাচ্ছেন না। আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের ভাষায়, "থাকাই দায়" হয়ে পড়েছে।
মশার কামড়ে ইতোমধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থী ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। যদিও আক্রান্তের নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি, তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক স্পষ্ট।
ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও ফাইলেরিয়াসিসসহ বিভিন্ন রোগের শঙ্কায় অনেকেই মানসিক চাপেও ভুগছেন। নিয়মিত জ্বর, শরীরব্যথা বা অস্বস্তি দেখা দিলে শিক্ষার্থীরা দ্রুত পরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন।
পরিবেশগত কারণ: কোথায় ঘাটতি?
সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ড্রেন, ডোবা ও জলাবদ্ধ জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার না করা এবং ঝোপঝাড় ও আবর্জনা জমে থাকার কারণে মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আবাসিক হলগুলোর আশপাশে পানি জমে থাকা, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের পাশে খোলা ড্রেন -এসব জায়গায় মশার লার্ভা দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।
প্রতিবছর শীত মৌসুমে কয়েক দফা মশক নিধন অভিযান পরিচালিত হলেও এ বছর তেমন জোরালো ও সমন্বিত কার্যক্রম চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি হলে স্প্রে কার্যক্রম চালানো হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
তাজউদ্দিন আহম্মদ হলের এক শিক্ষার্থী রাতুল বলেন, দিনের বেলাতেও রুমে মশারি টানিয়ে থাকতে হয়। সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব সবচেয়ে বেশি হলেও দুপুর বা সকালে স্প্রে করা হয়। উপদ্রবের সময় অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিলে সমস্যার সমাধান হবে না।
আরেক শিক্ষার্থী জানান, ফগিং একদিন করলে দুই-তিন দিন কিছুটা কম থাকে, তারপর আবার আগের মতো হয়ে যায়। নিয়মিত মনিটরিং দরকার।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মশাবিষয়ক গবেষক ড.কবিরুল বাশার জানান, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও আশপাশে প্রায় ১৬ প্রজাতির মশা শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে 'কিউলেক্স কুইনকুইফাসসিয়াটাস' প্রজাতির আধিক্য বেশি। এই প্রজাতির কামড়ে 'ফাইলেরিয়াসিস' (গোদ রোগ) হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার ঘনত্ব তুলনামূলক কম বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার ব্যাখ্যায়, শীত শেষে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করলে মশার ডিম পাড়ার হার বৃদ্ধি পায় এবং লার্ভার বৃদ্ধি দ্রুত হয়। জানুয়ারির শেষ দিকে সাধারণত মশার ঘনত্ব বাড়ে-বর্তমান পরিস্থিতিও সেই মৌসুমি চক্রের অংশ।
তিনি আরও বলেন, আগামী ১৫ দিন থেকে এক মাসের মধ্যে বৃষ্টি না হলে স্থির পানিতে লার্ভার বৃদ্ধি আরও বাড়তে পারে, ফলে উপদ্রব তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. আবুল কাশেম জানান, প্রথম ধাপের কার্যক্রম শেষে দ্বিতীয় ধাপও শুরু হয়েছে। দুইজন কর্মী নিয়মিত স্প্রে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। হল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুযায়ী মশার ওষুধ, কেরোসিন বা অকটেন সরবরাহের কথা জানালে ফগিং মেশিন দিয়ে স্প্রে করা হচ্ছে।
হল প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবেদা সুলতানা বলেন, হল প্রাধ্যক্ষদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ঝোপঝাড় পরিষ্কার, ড্রেন পরিষ্কার এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষার্থীদের মতে, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন-নিয়মিত ও সময়োপযোগী ফগিং কার্যক্রম লার্ভা ধ্বংসে ড্রেন ও জমে থাকা পানি পরিষ্কার ঝোপঝাড় ও আবর্জনা অপসারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা ও নিয়মিত মনিটরিং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ।
মশার প্রকোপে শিক্ষার পরিবেশ ও আবাসিক জীবনের স্বাভাবিকতা ব্যাহত হওয়ায় দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রত্যাশা, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের মাধ্যমে ক্যাম্পাসকে মশামুক্ত ও নিরাপদ আবাসনে পরিণত করা হবে।
সময়ের আলো/জোই