বছরের অন্য সব মাসের মধ্য থেকে রমজান মাসটি আলাদা। এটি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। একজন মুমিনের জীবনে রমজান কেবল ক্যালেন্ডার পরিবর্তন নয়; এটি আত্মশুদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ, নতুন করে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার এক মহাসন্ধিক্ষণ। একজন সচেতন মুমিনের জন্য রমজান কেবল একটি মাস নয়, এটি একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যনির্ভর সাধনার সময়। তাই রমজানকে অর্থবহ ও ফলপ্রসূ করতে হলে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করা জরুরি, যাতে এই মাস থেকে সর্বোচ্চ ফায়দা অর্জন করা যায়।
তাকওয়া অর্জন : রমজানের প্রধান ও মৌলিক লক্ষ্য হলো তাকওয়া অর্জন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)।
প্রখ্যাত মুফাসসির আবদুর রহমান আস-সাদি (রহ.) এই আয়াতের তাফসিরে বলেন, আল্লাহ তায়ালা রোজার বিধান দেওয়ার হিকমত হিসেবে তাকওয়ার কথাই উল্লেখ করেছেন, কারণ রোজা মানুষের মধ্যে আল্লাহর আদেশ পালনের মানসিকতা এবং নিষেধ বর্জনের শক্তি তৈরি করে।
রোজার মাধ্যমে যেভাবে তাকওয়া অর্জিত হয়-
১. প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ : একজন রোজাদার আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং সওয়াবের আশায় নিজের প্রিয় খাবার, পানীয় এবং জৈবিক চাহিদা বিসর্জন দেন, যা সরাসরি তাকওয়ার অংশ।
২. আল্লাহর নজরদারির অনুভূতি : রোজা একজন মানুষকে আল্লাহর সার্বক্ষণিক নজরদারির (মুরকাবা) প্রশিক্ষণ দেয়। সে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেবল আল্লাহর ভয়ে নিজের নফসের চাহিদা পূরণ করে না।
৩. শয়তানের প্রভাব হ্রাস : রোজা শয়তানের চলাচলের পথকে সংকীর্ণ করে দেয় (কেননা শয়তান মানুষের রক্ত চলাচলের নালিতে বিচরণ করে)। ফলে পাপাচারের প্রবণতা কমে যায়।
৪. ইবাদতে একাগ্রতা : সাধারণত রোজাদারের নেক আমল বৃদ্ধি পায়, আর যাবতীয় সৎ কাজই তাকওয়ার বৈশিষ্ট্য।
৫. সহমর্মিতা বোধ : যখন কোনো ধনী ব্যক্তি ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করেন, তখন তা তাকে দরিদ্র ও নিঃস্ব মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। এটিও তাকওয়ার অন্যতম গুণ।
ক্ষমা লাভ : রমজান আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও রহমতের সুবর্ণ সুযোগ। প্রকৃত বঞ্চিত সেই ব্যক্তি, যে এই মাস পেয়েও ক্ষমা লাভে ব্যর্থ হয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘ধ্বংস তার জন্য, যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হলো অথচ সে আমার ওপর দরুদ পড়ল না। ধ্বংস তার জন্য, যার জীবনে রমজান এলো এবং ক্ষমা পাওয়ার আগেই তা বিদায় নিল। আর ধ্বংস তার জন্য, যে তার পিতা-মাতাকে বার্ধক্যে পেল অথচ তাদের সেবার মাধ্যমে জান্নাত অর্জন করতে পারল না’ (তিরমিজি : ৩৫৪৫)।
আরেক বর্ণনায় এসেছে, যখন জিবরাইল (আ.) এই তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বদদোয়া করেন, তখন নবীজি (সা.) তিনবার ‘আমিন’ বলেন (ইবনে হিব্বান)। এই হতভাগ্য ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি রমজান পেয়েও আল্লাহর রহমতের ভাগীদার হতে পারেনি। এর কারণ হতে পারে সৎ কাজের প্রতি তার অবহেলা, পাপে লিপ্ত থাকা ও তওবা না করা, অথবা রমজানের মর্যাদাহানি করা কিংবা আমল ধ্বংসকারী কোনো কাজে লিপ্ত থাকা। তাই একজন মুসলমানের উচিত এই মাসে তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ‘ক্ষমা লাভ করা এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়াকে’ নির্ধারণ করা। আর মাসজুড়ে এই লক্ষ্য অর্জনেই কাজ করে যাওয়া।
কুরআন থেকে হেদায়েত গ্রহণ : রমজান কুরআনের মাস। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রমজান মাসই হলো সেই মাস, যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে; যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)।
এই মাসে মানুষ অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে কুরআন তেলাওয়াত করে থাকে। কিন্তু কেবল তেলাওয়াতই যথেষ্ট নয়, বরং কুরআনের হেদায়েত বা প্রদর্শিত পথে চলাও জরুরি। আর এটি নিশ্চিত করতে হলে একজন মুসলিমকে কুরআনের সুমহান অর্থগুলো নিয়ে চিন্তা-গবেষণা (তাদাব্বুর) করতে হবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআনের দিকনির্দেশনা খুঁজে নিতে হবে। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন পথ প্রদর্শন করে, যা সবচেয়ে সরল ও সঠিক’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৯)।
তাই প্রতিদিন কিছু সময় কুরআনের অনুবাদ ও তাফসির পাঠ, আয়াত নিয়ে ভাবনা এবং নিজের জীবনকে তার আলোকে যাচাই করার চর্চাই রমজানকে জীবন্ত করে তোলে।
লাইলাতুল কদরের সন্ধান : রমজানের একটি অন্যতম মহিমান্বিত উপহার হলো লাইলাতুল কদর। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আমি এটি নাজিল করেছি কদরের রােেত। আর কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ’ (সুরা কদর : ১-৩)।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় কদরের রাতে কিয়াম করবে, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে’ (বুখারি : ২০১৪)।
তাই একজন বুদ্ধিমান মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত রমজানে এই রাতটিকে খুঁজে নেওয়া এবং এতে ইবাদত করা, যাতে করে এসব মহাপুরস্কার ও মহান সওয়াব লাভ করা যায়।
অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে পাপ থেকে সংযত রাখা : রমজান মাসে কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকাই যথেষ্ট নয়, বরং রোজার সওয়াব কমিয়ে দেয় বা রোজাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন প্রতিটি কাজ থেকে একে রক্ষা করা অপরিহার্য। কারণ রোজা কেবল পানাহার বর্জন নয়, বরং আল্লাহর হারাম করা প্রতিটি বিষয় থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখার নাম। এটি আত্মসংযমের পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি (রোজা অবস্থায়) মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ ত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই’ (বুখারি : ১৯০৩)।
যদি কোনো মুসলিম তার রোজাকে পাপাচার থেকে রক্ষা না করে, তবে সেই রোজার বিনিময়ে তার কপালে কেবল ক্ষুধা আর পিপাসাই জুটবে। যেমনটি অন্য একটি হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘অনেক রোজাদার এমন আছে, যাদের রোজার প্রাপ্তি কেবল ক্ষুধা; আবার অনেক রাত জাগরণকারী (ইবাদতকারী) এমন আছে, যাদের ইবাদতের প্রাপ্তি কেবল রাত জাগার কষ্ট’ (ইবনে মাজাহ)। অতএব চোখ, কান, জিহ্বা, হাত ও অন্তর- সবকিছুকে পাপ থেকে রক্ষা করাই রোজার প্রকৃত সংরক্ষণ।
রমজান হলো আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণশালা, ক্ষমা এবং হেদায়েতের মাস। এই মাস কেবল দিন গোনার সময় নয়, এটি নিজেকে বদলে দেওয়ার সময়। যে রমজানকে লক্ষ্যভিত্তিক করে, সে-ই প্রকৃত অর্থে রমজানের বরকত লাভ করে। এই মাসকে কাজে লাগানোর জন্য যেকোনো পরিকল্পনা বা রুটিন তৈরি করার সময় এই লক্ষ্যগুলোকে সামনে রেখেই করা প্রয়োজন। যদি এগুলো সামনে রেখে আমরা পরিকল্পনা করি, তবে রমজান আমাদের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন এনে দিতে পারে।
লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক
সময়ের আলো/কেএইচও