ইউক্রেন যুদ্ধ আজ শুধু ভূখণ্ডের লড়াই নয়; এটি পারমাণবিক যুগের আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার এক কঠিন পরীক্ষা। চার বছর পেরিয়ে যাওয়া এই সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, আগ্রাসন যদি কার্যকরভাবে প্রতিহত না হয়, তবে শক্তিধর রাষ্ট্রের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র এক ধরনের নীরব ছাড়পত্র হয়ে উঠতে পারে। মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের এক বিশ্লেষণ বলছে, ১৯৯৪ সালের বুদাপেস্ট স্মারকের অধীনে নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার ত্যাগ করে ইউক্রেন যে নিরাপত্তা আশ্বাস পেয়েছিল, আজ তার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে। ওই বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যদি একটি রাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র ছেড়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত আক্রমণের শিকার হয় এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা না পায়, তবে ভবিষ্যতে কোনো দেশ নিরস্ত্রীকরণে আগ্রহী হবে?
এই যুদ্ধের ফলাফল এখন তাই কেবল কিয়েভ বা মস্কোর জন্য নির্ধারক নয়; এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ধারণার ভিত্তি স্পর্শ করছে। বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে ইউরোপে সীমান্ত বদলানো যাবে কি না; এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বড় প্রশ্ন- পারমাণবিক অস্ত্র কি আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিশ্রুতিকে অকার্যকর করে দিতে পারে? ইউক্রেন আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সিদ্ধান্ত শুধু বর্তমান যুদ্ধের নয়, ভবিষ্যৎ বিশ্বের নিরাপত্তা স্থাপত্যের রূপরেখাও নির্ধারণ করবে।
যেভাবে যুদ্ধের সূচনা : চার বছর আগে, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু করে। অনেকেই যুদ্ধের সূচনা ওই তারিখ থেকে ধরেন। তবে বাস্তবে সংঘাতের শুরু ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল ও পূর্ব ইউক্রেনে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। অর্থাৎ এই সংঘাতের বয়স এক দশকের বেশি।
মস্কোর প্রত্যাশা ছিল দ্রুত সাফল্য। কিন্তু যুদ্ধ এখন দীর্ঘ, ক্ষয়ক্ষতিময় অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন একে বলেছে- ‘ক্ষয়িষ্ণু, উচ্চ-হতাহতের অচলাবস্থা’। এর স্থায়িত্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সংঘর্ষকেও ছাড়িয়ে গেছে।
হতাহতের সংখ্যা ভয়াবহ : হতাহতের হিসাব ভয়াবহ। রাশিয়া হারিয়েছে ১২ লাখের বেশি মানুষ। বিপরীতে ইউক্রেনে হতাহত ৬ লাখ। এত প্রাণহানি সত্ত্বেও ফ্রন্টলাইন খুব বেশি বদলায়নি। এখানে একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। রাশিয়াই ইউক্রেনে হামলা চালিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছে। ইউক্রেন আক্রমণকারী নয়। একই সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শাসনব্যবস্থা গণতান্ত্রিক নয়- এমন অভিযোগ বহু সমালোচকের। গ্যারি কাসপারভ বা ভ্লাদিমির কারা-মুরজার মতো বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে এ কথা বলে আসছেন। আলেক্সেই নাভালনি, বরিস নেমৎসভসহ একাধিক সমালোচকের মৃত্যু আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মৃত্যু হয়নি কোনো মার্কিন সেনার : যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু আরেকটি বিষয়। তা হলো এই যুদ্ধে সরাসরি কোনো মার্কিন সেনা নিহত হয়নি। ভিয়েতনাম, ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো নয়, যেখানে হাজারো মার্কিন প্রাণহানি ও বিপুল ব্যয় হয়েছিল। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিরক্ষা বাজেটের পাঁচ শতাংশেরও কম ব্যয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা দিয়েছে। এই সহায়তা শুধু মানবিক নয়, কৌশলগতও। পশ্চিমা অস্ত্র ও সহায়তা ব্যবহার করে ইউক্রেন রাশিয়ার প্রচলিত সামরিক সক্ষমতাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ন্যাটোর প্রতিবেশী ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী পারমাণবিক শক্তিধর এক রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ক্ষয় হয়েছে মার্কিন সেনা পাঠানো ছাড়াই।
তবে সাম্প্রতিক বছরে মার্কিন সহায়তা কমেছে। সমালোচকরা বলছেন, ক্রেমলিনের সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্যকে প্রশ্রয় দিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমর্থকরা যুক্তি দেন, সীমাহীন সহায়তা টেকসই নয়।
ইউক্রেন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং পরমাণু প্রশ্ন : ইউক্রেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন নয়। ১৯৯১ সালে ইউক্রেন স্বাধীন হওয়ার পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। সেটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ভূরাজনৈতিক সাফল্য। ১৯৯৪ সালের বুদাপেস্ট স্মারকে ইউক্রেন তার পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে। যদি আজ ইউক্রেন টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়, তা হলে বার্তা স্পষ্ট হতে পারে পারমাণবিক অস্ত্রই নিরাপত্তার একমাত্র গ্যারান্টি। এই দৃষ্টান্ত বৈশ্বিক অ-প্রসারণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে।
রাশিয়া দূরবর্তী কোনো আঞ্চলিক শক্তি নয়। বেরিং প্রণালির ওপারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই তার সামুদ্রিক সীমান্ত। মস্কো নিজেকে পশ্চিমের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেখছে। ইউক্রেন যুদ্ধ হয়ে উঠেছে এক পরীক্ষাগার; যেখানে পশ্চিমা শিল্পক্ষমতা, গোয়েন্দা সমন্বয়, জোটের ঐক্য ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরীক্ষা চলছে।
এই যুদ্ধের ফলাফল বেইজিং, পিয়ংইয়ং ও তেহরানেও গভীরভাবে পর্যবেক্ষিত হচ্ছে। ইউরোপে যদি শক্তি প্রয়োগে সীমান্ত বদলানো যায়, তা হলে সেই নজির অন্যত্রও প্রভাব ফেলতে পারে। বিপরীতে, আগ্রাসন ব্যর্থ হলে প্রতিরোধ নীতি আরও জোরদার হবে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব : অর্থনৈতিক দিক থেকেও যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে। মার্কিন সহায়তার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ব্যয় হয়েছে- অস্ত্রভান্ডার পুনরায় পূরণ, উৎপাদন লাইন সম্প্রসারণ, প্রতিরক্ষা খাত আধুনিকীকরণে। ড্রোন যুদ্ধ, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা- আধুনিক সংঘাত সম্পর্কে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রচলিত সামরিক শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। বহু সরঞ্জাম ধ্বংস, অভিজাত ইউনিট দুর্বল, ন্যাটো অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা কমেছে। কৌশলগত বিচারে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
পরমাণু ও নিরাপত্তা প্রশ্ন : এই যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পারমাণবিক দৃষ্টান্ত। যদি পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র সীমান্ত বদলাতে সফল হয়, তবে বিশ্ব আরও অনিরাপদ হবে। বাজার, জোট ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা স্থায়ী পারমাণবিক ভয়াবহতার মধ্যে বিকশিত হতে পারে না। যুদ্ধের চরিত্রও আলোচনায় এসেছে। বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা, জোরপূর্বক শিশু অপহরণের অভিযোগ, গণকবরের সন্ধান; এসব আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইতিহাস দেখিয়েছে, আগ্রাসন যদি শাস্তিহীন থাকে, তা বিস্তার লাভ করে।
টেকসই সমাধান কোন পথে : তা হলে টেকসই সমাধান কী? একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির জন্য সম্ভাব্য শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইউক্রেনের ভূখণ্ড থেকে রুশ সেনা প্রত্যাহার, যুদ্ধবন্দি ও অপহৃত শিশুদের প্রত্যাবর্তন, পুনর্গঠনের ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যৎ আগ্রাসন ঠেকাতে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। এগুলো বাস্তবায়ন সহজ নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে জয়ের মতো অবস্থানে পৌঁছাতে সহায়তা করে, তা হলে তা সরাসরি মার্কিন সেনা মোতায়েন ছাড়াই কৌশলগত সাফল্য হতে পারে।
চার বছরে রুশ লক্ষ্য কতটুকু অর্জিত : চার বছর পরও রাশিয়া তার মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ। ইউক্রেন প্রতিরোধ বজায় রেখেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কৌশল দাবি করে ধারাবাহিক সামরিক সহায়তা, কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ এবং এই যুদ্ধকে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণী সংঘাত হিসেবে দেখা।
সময়ের আলো/কেএইচও