ইসলামের কিছু ইবাদত আর্থিক, কিছু মানসিক ও কিছু শারীরিক। রোজা একটি শারীরিক ইবাদত। একজন বিত্তশালীর ওপর যেমন রোজা ফরজ, একজন খেটে খাওয়া মানুষের ওপরও রোজা ফরজ। ঘরে খাবার থাকার পরও বিত্তশালীকে রোজা রাখতে হয়। ক্ষুধার যন্ত্রণা কী জিনিস তা বাস্তবে অনুধাবনের সুযোগ করে দেয় রমজান।
রোজার অন্তর্নিহিত সারমর্মের একটি অংশ হলো অভাবী মানুষের ক্ষুধার কষ্ট অনুধাবন করা। এ কষ্ট অনুধাবন করে শ্রমজীবী মানুষের প্রতি যেন আমরা সদয় হই, সে নির্দেশ দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। রমজানে শ্রমিকের কাজের বোঝা হালকা করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। শুধু তাই নয়, রমজানে শ্রমিকের বোঝা হালকা করে দেওয়াকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্তির উসিলা হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘এ মাসে (রমজানে) যারা শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সদয় ব্যবহার করে তাদের কাজের বোঝা হালকা করে দেয়, আল্লাহ দয়াপরবশ হয়ে তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিয়ে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেন।’ (ইবনে খুজাইমা)
রমজান শ্রমিকের প্রতি বিশেষভাবে সদয় হওয়ার মাস। তাদের কাজের বোঝা হালকা করে দেওয়ার মাস। তাদের প্রাপ্য মজুরির সঙ্গে একটু বাড়িয়ে দিয়ে তাদের প্রতি ইহসান করার মাস। এ শিক্ষাই রমজান আমাদের দেয়। রোজাদার কারও অনিষ্ট, অকল্যাণ ও ক্ষতিসাধন করবেন না; বরং মাহে রমজানে সমাজের অসহায়, হতদরিদ্র, দুর্বল, পীড়িত, অসুস্থ, অনাথ, ছিন্নমূল ও প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত নিরন্ন মানুষের খোঁজখবর রাখবেন, তাদের খাওয়া-পড়ার ব্যবস্থা করবেন, সেহরি-ইফতারের আয়োজন করবেন, যথাসম্ভব সাধ্য অনুযায়ী পরোপকারে ব্যস্ত থাকবেন।
ধনী-গরিব আপামর রোজাদার এভাবে রোজার মাসে অসাধারণ ত্যাগ-তিতিক্ষার অনুশীলনের মাধ্যমে ইসলামের সাম্য, মৈত্রী, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হন। প্রকৃত রোজাদার ও ঈমানদার ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিরা সবসময়ই অসৎ কাজকর্ম থেকে দূরে থেকে বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষের প্রতি পারস্পরিক সহানুভূতি প্রকাশ করেন।
রোজাদার শ্রমিকদের কাছ থেকে অন্য সময়ের মতোই কড়ায়-গণ্ডায় শ্রম আদায় করার জন্য কঠোরতা দেখালে, রোজা রাখার কারণে তপ্ত দুপুরে প্রচণ্ড খরতাপে যখন সে হাঁপিয়ে ওঠে এবং দায়িত্ব পালনে ত্রুটি হয় তখন তার প্রতি চাপ প্রয়োগ ও দুর্ব্যবহার করলে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের দিনগুলোতে মালিকপক্ষের ক্ষমা নয়, বরং কঠোর শাস্তিই নিশ্চিত হবে।
অন্যদিকে শ্রমিক যদি রোজা রাখা সত্ত্বেও সাধ্যমতো কর্তব্য পালনে সচেষ্ট হয়, তা হলে সে সাধারণ কেউ রোজা রেখে যে সওয়াব পাবে তার দ্বিগুণ সওয়াব পাবে। কারণ, অধীনস্থ কর্মচারী, শ্রমিক শ্রেণি ও খেটে খাওয়া লোকদের পুরস্কারের কথা রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘তিন ধরনের লোকের জন্য দ্বিগুণ সওয়াব রয়েছে। তন্মধ্যে এক ব্যক্তি হচ্ছে ওই শ্রমিক যে আল্লাহর হক ও মনিবের হক উভয় আদায় করে।’ এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা কাজ করে তাদের জন্য কতই না চমৎকার প্রতিদান।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৩৬)
পৃথিবীর ভালো কাজের প্রতিদান ও মন্দ কাজের শাস্তি আল্লাহ নিজে দেন। বিখ্যাত মুফাসসির আল্লামা কুরতুবি (রহ.) বলেন, আমলের সাধারণ হিসাব আল্লাহ মানুষের সামনে প্রকাশ করে দিয়েছেন। আল্লাহ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী আমলের প্রতিদান ১০ থেকে সাতশগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেন। রোজা এর ব্যতিক্রম। আল্লাহ রোজাদারের জন্য সীমাহীন প্রতিদান রেখেছেন। যেমনটি অন্য বর্ণনায় এসেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষের সব ভালো কাজের প্রতিদান দশগুণ থেকে সাতশগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম। কেননা তা আমার জন্য এবং আমিই তার পুরস্কার দিই’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৫১)। এর আলোকে বলা যায়, অধীনস্থ ও শ্রমিকদের কাজের বোঝা হালকা করে দিলে আল্লাহর পক্ষ থেকেও মিলবে অফুরন্ত পুরস্কার। সুন্দর হবে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহান। আল্লাহ বোঝার ও আমল করার তওফিক দান করুন।
সময়ের আলো/আআ