‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ শুরু হচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২৬। দুপুর ২টায় বইমেলা উদ্বোধন করবেন প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এদিকে শেষ মুহূর্তে এসে স্টল সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কর্মীরা।
বুধবার বিকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘুরে দেখা যায়, এখনও কোনো স্টল পুরোপুরি সাজানো হয়নি। এখনও কাঠের ফ্রেমে হাতুড়ির শব্দ থামেনি। রঙের শেষ প্রলেপে ব্যস্ত কারিগররা, কোথাও নতুন করে সাজানো হচ্ছে বইয়ের তাক; মাপজোক করে একের পর এক তাক বসানো হচ্ছে।
এদিকে রমনা কালীমন্দির সংলগ্ন এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে পুলিশ কন্ট্রোল রুম, র্যাবের স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্সের অস্থায়ী ক্যাম্প এবং আনসার প্লাটুনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ একটি ব্রেস্টফিডিং (মাতৃদুগ্ধ পান) কর্নার স্থাপন করা হয়েছে।
২৫০-২৫২ নং স্টল রাওয়া পাবলিকেশনের ইনচার্জ সাঈদ মাহমুদ সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে। এখন শুধু কার্পেটিং করা বাকি। ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশনের প্রকাশক আবিদ এ আজাদ সময়ের আলোকে বলেন, আজকে সকালে আমাদের স্টলের জন্য জায়গা দেখিয়ে দিয়েছে। এটি গোছাতেই তো আরও চার-পাঁচ দিন চলে যাবে।
মেলার সময়সীমা : আজ থেকে শুরু হওয়া অমর একুশে গ্রন্থমেলা চলবে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত। ছুটির দিন ব্যতীত প্রতি দিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। তবে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার স্বার্থে রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কোনো দর্শনার্থীকে মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে মেলার সময়সূচিতে পরিবর্তন এনে তা আরও দীর্ঘ করা হয়েছে। সেসব দিনে মেলা শুরু হবে বেলা ১১টা থেকে এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।
অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা সংস্থা : এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা সংস্থা অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রতিষ্ঠানের জন্য স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৮টি। গত বছর মেলায় অংশ নিয়েছিল ৭০৮টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবং ইউনিট ছিল ১ হাজার ৮৪টি। এবারও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চসংলগ্ন গাছতলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বর রাখা হয়েছে, যেখানে ৮৭টি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য স্টল বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিশুচত্বরে ৬৩টি প্রতিষ্ঠানকে ১০৭টি ইউনিট প্রদান করা হয়েছে।
একাধিক স্মৃতি পুরস্কার : বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে একাধিক স্মৃতি পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ২০২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে মানের দিক থেকে সেরা বইকে প্রদান করা হবে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’। প্রকাশনার নান্দনিকতা ও শৈল্পিক উৎকর্ষ বিবেচনায় তিনটি প্রতিষ্ঠান পাবে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’। শিশুতোষ সাহিত্য রচনায় বিশেষ অবদানের জন্য দেওয়া হবে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’।
স্টলের দৃষ্টিনন্দন সাজসজ্জার জন্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’। পাশাপাশি এবার নতুনভাবে চালু হয়েছে ‘সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার’, যেখানে নতুন অংশগ্রহণকারী প্রকাশকদের মধ্যে থেকে গুণগত মানের ভিত্তিতে সর্বাধিক বই প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণ করে পুরস্কৃত করা হবে।
‘জিরো ওয়েস্ট’ উদ্যোগ : এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে পরিবেশবান্ধব ও ‘জিরো ওয়েস্ট’ ধারণায় আয়োজন করা হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে মেলা প্রাঙ্গণকে পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত রাখা হবে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পানি ছিটানো এবং মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্টল, মঞ্চ, ব্যানার, লিফলেট, খাবারের দোকান ও কফি শপসহ সব আয়োজনেই পাট, কাপড় ও কাগজের মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশসম্মত উপকরণ ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা : অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। বুধবার সকালে এ মেলা উপলক্ষে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সার্বিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা তুলে ধরেন ডিএমপি অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. সরওয়ার।
তিনি বলেন, বইমেলাকে ঘিরে বহুস্তর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণে স্থাপিত পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তাব্যবস্থা মনিটরিং করা হবে। মেলার নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত সংখ্যক ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকধারী পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকেন্দ্রিক গেটগুলোতে থাকবে আলাদা নিরাপত্তা বলয়। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাড়তি জনসমাগমের কথা বিবেচনায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হবে।
তিনি আরও বলেন, মেলার প্রবেশপথগুলোতে মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে তল্লাশির পাশাপাশি ম্যানুয়াল চেকিং চালানো হবে। কোনো ধরনের ধারালো অস্ত্র, বিস্ফোরক বা ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মেলার ভেতর ও আশপাশ এলাকায় প্রায় ৩০০টি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে। এ ছাড়া ডগ স্কোয়াড দিয়ে নিয়মিত সুইপিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
ছিনতাইকারী, পকেটমার ও হকারদের তৎপরতা রোধে বিশেষ টিম মোতায়েন থাকবে। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তায় আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মেলায় ফায়ার টেন্ডার, অ্যাম্বুলেন্স ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি থাকবে লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সেন্টার, ব্রেস্টফিডিং কর্নার, হেল্পডেস্ক ও শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডিবি, সিটিটিসি, বোম ডিসপোজাল ইউনিট ও সোয়াটসহ বিশেষায়িত টিমগুলো প্রস্তুত থাকবে বলে জানিয়েছে ডিএমপি।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়ও নেওয়া হয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। বইমেলা চলাকালীন সময় দিনে ও রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। এবার টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত সড়ক সবসময় বন্ধ না রেখে পরিস্থিতি অনুযায়ী খোলা বা বন্ধ রাখা হবে। দর্শনার্থীদের সংখ্যা বিবেচনায় এই সড়কের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
ডিএমপি জানিয়েছে, অনুমোদিত যানবাহনের জন্য নির্ধারিত পার্কিং ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং পার্কিং এলাকায় যানবাহনের সুশৃঙ্খল প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। নির্ধারিত পার্কিং জোন ছাড়া অন্য কোথাও গাড়ি রাখা যাবে না।
সাধারণ দর্শনার্থীদের উদ্দেশে ডিএমপি অনুরোধ জানিয়েছে, তারা যেন মেলার গেটের সামনে যানজট সৃষ্টি না করে আগেই নেমে হেঁটে মেলায় প্রবেশ করেন। এতে অন্য দর্শনার্থীদের প্রবেশ সহজ হবে। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের ট্রাফিক নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সময়ের আলো/আআ