ফরিদপুরে চিনিকলের অপরিশোধিত বিষাক্ত তরল বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে চন্দনা-বারাশিয়া নদীর পানি। বছরের পর বছর এভাবেই দূষিত হচ্ছে নদীটি। এতে মরে যাচ্ছে মাছসহ সব জলজ প্রাণী। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি উদ্যোগে ১৯৭৪ সালে ফরিদপুর সুগার মিলসটি স্থাপন করা হয়। ১৯৭৬ সালে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে আখ মাড়াই মৌসুমে মধুখালী থেকে বামুন্দী বালিয়াকান্দী সড়কের ব্রিজ এলাকায় মধুখালী থানা গেট সংলগ্ন খাল দিয়ে চিনিকলের কালো পানি এসে সরাসরি নদীতে পড়ছে। বিশেষ করে আখ মাড়াই মৌসুমে দূষণ হচ্ছে বেশি।
চিনিকল থেকে নির্গত অপরিশোধিত বর্জ্য একটি খালের মাধ্যমে চন্দনা-বারাশিয়া নদীতে গিয়ে মিশছে। নদীর উজান এলাকার প্রায় ৩০০ মিটার দূরে অবস্থিত ফরিদপুর সুগার মিলসটি ওই খাল দিয়েই বর্জ্য ছাড়ে। মিল এলাকা অতিক্রম করার সময় তীব্র রাসায়নিক দুর্গন্ধে পথচারীদের নাক-মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে চলাচল করতে হয়।
এ বিষয়ে পৌরসভার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, পৌরসভার চারটি গ্রামের অন্তত ছয় হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চিনিকলের রাসায়নিকের দুর্গন্ধ ও চন্দনা-বারাশিয়া নদীর পানিদূষণের কারণে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। খালটি বিদ্যালয় ও বাজারের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় মধুখালী আইডিয়াল একাডেমি ও ফরিদপুর চিনিকল উচ্চ বিদ্যালয়ের দেড় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবং মিল গেট বাজারের ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এর প্রতিকার হওয়া উচিত।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মির্জা মুরাদ হোসেন বলেন, নদীর এক পাশের পানি পরিষ্কার থাকলেও অন্য পাশ চিনিকলের বর্জ্যে কালো রং ধারণ করেছে। এক মাস আগেও এই নদীর পানি স্বচ্ছ ছিল। কিন্তু চিনিকলের বর্জ্যে নদীর পানি দিন দিন বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।
নদীকূলের বাসিন্দা রহিমা বেগম। তিনি জানান, পানি কালচে হয়ে যাওয়ায় এখন তারা কাপড় ধোয়ার কাজও করতে পারছেন না।
এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসরিন জাহান সময়ের আলোকে বলেন, নদীটি পরিদর্শন করা হয়েছে। এ সময় বিষাক্ত পানির কারণে নদীর মাছ মারা যেতে দেখেছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মধুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রওশনা জাহান বলেন, চিনিকলের কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে তাদের ইটিপি (বর্জ্য পরিশোধনাগার) রয়েছে এবং তারা নিজেদের পুকুরে বর্জ্যপানি ফেলেন। তারপরও চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টির দ্রুত সমাধান করা হবে।
পরিবেশ অধিদফতর ফরিদপুরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ার বলেন, বিষয়টি জানতে পেরেছি। দ্রুত একজন পরিদর্শককে এলাকায় পাঠানো হবে। পরিদর্শন শেষে মিলস কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিব হোসেন জানান, চিনিকলের বর্জ্যরে কারণে চন্দনা-বারাশিয়া নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। নদী পরিদর্শন করে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে মিল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে।
তবে ফরিদপুর সুগার মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক ফারহাদ বলেন, চিনিকলের বর্জ্য নদীতে ফেলার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। এ বিষয়ে আমরা যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করে বর্জ্য নিজস্ব স্থানে ফেলছি।
তিনি আরও বলেন, চুন ও সালফার ডাই-অক্সাইড পানির সঙ্গে মিশে তীব্র দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। আমরা মিলের নিজস্ব পুকুরের পানি ব্যবহার করি। তবে তরল হওয়ায় কিছু পানি মাটির নিচ দিয়ে চুইয়ে নদীতে যেতে পারে। তবে কোনোভাবেই পানি নদীতে যাতে না যায় সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/আআ