রমজান কেবল একটি মাস নয়; এটি বিশ্বমুসলিমের হৃদয়ে ধ্বনিত এক আধ্যাত্মিক মৌসুম। রমজান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের মুসলমান যেন এক সুরে উচ্চকিত করে রমজানের সওগাত। প্রতিটি ভূখণ্ডে রমজান নেয় নিজস্ব রং ও রূপ। কোথাও লণ্ঠনের আলো, কোথাও মসজিদমুখী জনতার ঢল, কোথাও পারিবারিক ঐতিহ্যের বিশেষ খাবার। এ বিষয়ে লিখেছেন আবিদ রাইহান।
সৌদি আরবে ওমরাহ পালনকারীদের ঢল
পবিত্র রমজানে এক দিনে ওমরাহ পালনে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ জানায়, ২১ ফেব্রুয়ারি হিজরি ১৪৪৭ সালের রমজানের চতুর্থ দিনে ৯ লাখ ৪ হাজার মুসল্লি ওমরাহ আদায় করেছেন। এ সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এর আগে গত বছর ৭ মার্চ এক দিনে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ওমরাহ আদায়ের রেকর্ড হয়েছিল। রমজানে মুসল্লির চাপ বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে মসজিদুল হারাম এলাকায়। ওমরাহর আনুষ্ঠানিকতা নিরাপদে সম্পন্ন করতে কাবাঘর ঘিরে থাকা সাদা মার্বেলের উন্মুক্ত অংশ মাতাফ শুধু ওমরাহ পালনকারীদের জন্য নির্ধারিত রাখা হয়েছে। জুমা, মাগরিব, এশা, তারাবিহ এবং রমজানের শেষ দশকের তাহাজ্জুদের সময় নামাজের জায়গা দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়। এ সময় মুসল্লিদের খোলা চত্বর ও নির্ধারিত এলাকায় যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মসজিদের দরজা ব্যবহারেও দিকনির্দেশনা অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হাঁটার পথ, সড়ক ও চত্বরে জটলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এতিম শিশুদের সঙ্গে শায়খ সুদাইসের ইফতার
রমজানের মানবিকতা ও সহমর্মিতার বার্তা তুলে ধরতে মসজিদুল হারামে এতিম শিশুদের সঙ্গে ইফতার করেছেন পবিত্র দুই মসজিদের পরিচালনা পর্ষদের প্রধান শায়খ ড. আব্দুর রহমান আস-সুদাইস। বুধবার সন্ধ্যায় তিনি আল-ওয়েদাদ অ্যাসোসিয়েশন ফর অরফান কেয়ারের অধিভুক্ত শিশুদের নিয়ে একসঙ্গে ইফতার করেন। ইফতারের আয়োজনটি হয় মসজিদুল হারাম প্রাঙ্গণে। ইফতার টেবিলে শায়খ সুদাইসের পাশে বসে শিশুদের আনন্দমুখর উপস্থিতি রমজানের সৌহার্দ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। ইফতার শেষে শায়খ সুদাইস বলেন, এতিমদের লালন-পালন ও তাদের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অন্যতম উচ্চ মানবিক আদর্শ। সৌদি আরব রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব সব স্তরে সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে এতিমদের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। তিনি উল্লেখ করেন, ইসলামি শিক্ষা ও সৌদি সমাজের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এতিমদের কল্যাণে ধারাবাহিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
চীনের মুসলিমদের ব্যতিক্রমী রমজান
চলতি বছর চীনের মুসলিমরা একই সঙ্গে পালন করছেন রমজান মাস ও চীনের চান্দ্র নববর্ষ। চীনের চান্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে ছিল চীনা নববর্ষের দ্বিতীয় দিন। এই দিনই মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছে পবিত্র রমজান মাস। কয়েক দশকের মধ্যে চীনে এই প্রথম দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উপলক্ষ একসঙ্গে উদযাপিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে চীনের জাতিগত ও ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। চীনে শীতকালীন অয়নের (২১ ডিসেম্বর) পর দ্বিতীয় নতুন চাঁদ উঠার সঙ্গে চান্দ্রবর্ষ উদযাপন শুরু হয়।
২১ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেকোনো একটি তারিখে এ নববর্ষ হতে পারে। চান্দ্র নববর্ষের এ উৎসব বসন্তকালীন উৎসব নামেও পরিচিত। এই উপলক্ষে চীনে প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে উৎসব পালন করা হয়। বহুজাতিক রাষ্ট্র চীনে এই মিলন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। চীনে মোট ৫৬টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ১০টি মুসলিম জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠী হলো হান। এর পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য মুসলিম সংখ্যালঘু হিসেবে রয়েছে মুসলিম হুই জাতিগোষ্ঠী। হুইরা সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় এবং পুরো দেশে ছড়িয়ে আছেন।
নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে ইফতার ও তারাবিহতে মুসল্লিদের ঢল
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পবিত্র রমজান উপলক্ষে ঐতিহাসিক টাইমস স্কয়ারে ইফতার ও তারাবিহর জামাতে অংশ নেন শত শত মুসলমান। ব্রডওয়ে ও সেভেন্থ অ্যাভিনিউ এলাকায় প্রায় দেড় হাজার মানুষের মাঝে বিনামূল্যে ইফতারি বিতরণ করা হয়। রমজানের পবিত্রতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে ইফতার ও তারাবিহর আয়োজন করা হয়। সূর্যাস্তের পর ইফতার গ্রহণের পাশাপাশি মুসল্লিরা এশার নামাজের পর তারাবিহর জামাতে অংশ নেন। ২০২২ সাল থেকে প্রতি বছর এই আয়োজন হয়ে আসছে। আয়োজকদের তথ্যমতে, কর্মসূচিতে প্রায় দেড় হাজার ইফতার প্যাকেট বিতরণ করা হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাষায় কুরআনের ১ হাজার ২০০ কপি বিলি করা হয়। পুরো আয়োজনটি করেন মুসলিম আমেরিকান কনটেন্ট ক্রিয়েটর ওয়ে লাইফ এসকিউ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি আয়োজনটি সরাসরি তুলে ধরেন, যা অনলাইন ও সরেজমিন ব্যাপক সাড়া ফেলে।
উল্লেখ্য, নিউইয়র্ক সিটিতে মুসলিমদের এ ধরনের জনসমাগমপূর্ণ আয়োজন নতুন নয়। বর্তমান মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার আগে সাবেক মেয়র এরিক এডামসের সময় টাইমস স্কয়ারে এমন কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া বছরের পর বছর ধরে ওয়াশিংটন স্কয়ারস পার্কসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে রমজানের আয়োজন হয়ে আসছে। নিউইয়র্ক সিটিতে বর্তমানে পাঁচ লাখের বেশি মুসলমান নিয়মিত রমজান পালন করছেন। ইসলামি বর্ষপঞ্জির সবচেয়ে পবিত্র এই মাসে ইবাদত, দান ও সংযমের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন তারা।
৫০ হাজার ফিলিস্তিনির তারাবিহ আদায়
কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও চলমান উত্তেজনার মধ্যেও রমজানের প্রথম দিকেই আল-আকসা মসজিদে এশা ও তারাবিহর নামাজ আদায় করেছেন প্রায় ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি মুসল্লি। দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের প্রাচীন নগরীতে এ দৃশ্য দেখা যায়। দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের প্রাচীন নগরীতে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রথম দিকেই এশা ও রমজানের তারাবিহর নামাজে অংশ নেন প্রায় ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি মুসল্লি।
জেরুজালেম গভর্নরেট জানিয়েছে, ইসরাইলি সামরিক চেকপয়েন্ট ও কড়া যাচাইয়ের মধ্যেও মুসল্লিরা মসজিদে সমবেত হন। রমজান শুরু হওয়ার পর থেকেই দখলকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, ইসরাইলি সেনাবাহিনীর অভিযান ও গ্রেফতারের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, সম্প্রতি জেরুজালেমের অন্তত ৩০০ বাসিন্দাকে রমজান মাসে আল-আকসা মসজিদে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আদেশ জারি করেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে জেরুজালেম শহরে ইসরাইলি বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। মসজিদে প্রবেশে আরোপ করা হয়েছে বয়সভিত্তিক বিধিনিষেধও। ১২ বছরের কম বয়সি শিশু, ৫৫ বছরের বেশি বয়সি পুরুষ এবং ৫০ বছরের বেশি বয়সি নারীদের জন্য প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে।
মসজিদুল হারাম ও নববীতে
ইতিকাফের নিবন্ধন শুরু
রমজানের শেষ দশকে মক্কার মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববীতে ইতিকাফের জন্য অনলাইন নিবন্ধন শুরু হয়েছে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আবেদন গ্রহণ করা হবে এবং নির্বাচিতদের এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হবে। শুক্রবার ৩ রমজান অর্থাৎ ২০ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টা থেকে নিবন্ধন পোর্টাল চালু হয়। কর্তৃপক্ষ জানায়, ইতিকাফ শুরু হবে ২০ রমজান থেকে এবং শেষ হবে ৩০ রমজান। অর্থাৎ রমজানের শেষ দশ দিনজুড়ে এই ইবাদত পালন করবেন মুসল্লিরা। পবিত্র লাইলাতুল কদর অন্বেষণের লক্ষ্যে এ সময়টি মুসলমানদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিকাফের জন্য আবেদন করতে হলে আবেদনকারীকে সৌদি নাগরিক অথবা বৈধ ইকামাধারী হতে হবে। ন্যূনতম বয়স হতে হবে ১৮ বছর। নারী ও পুরুষ উভয়েই আবেদন করতে পারবেন। আগ্রহীদের নির্ধারিত সরকারি অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। প্রথমে ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে অ্যাকাউন্ট খুলতে বা নাফাথ জাতীয় পরিচয় যাচাইকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে লগইন করতে হবে। এরপর মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদ অথবা মদিনার মসজিদে নববী যেকোনো একটি স্থান বেছে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে আবেদন জমা দিতে হবে এবং শর্তাবলিতে সম্মতি জানাতে হবে।