রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারীদের জন্য মশা এখন এক প্রাণঘাতীর নাম। শীত মৌসুম শেষে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকেই মশার উপদ্রব বেড়ে চলছে। ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশা নিধনের নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্থা দুটি রাজধানীর অলিগলিতে মশা নিধনের ওষুধ প্রয়োগ করলেও তা কোনো কাজে আসছে না বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অবশ্য দুই সিটি করপোরেশন ও সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, মশক নিধনে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান করা হচ্ছে। মশার ওষুধ ঠিকমতো কাজ করছে কি না, সেটি নিয়েও গবেষণা চলছে।
এদিকে গত মঙ্গলবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নতুন প্রশাসক আবদুস সালাম ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নতুন প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নিয়েই তারা মশা নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বুধবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অলিগলিতে মশার ওষুধ ছিটানো হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় প্রেস ক্লাব, সেগুনবাগিচা, বিজয়নগর, নয়াপল্টন, পল্টন, সচিবালয় এলাকা, কাকরাইল, শান্তিনগর, মৎস্য ভবন, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী এলাকায় মশা মারার ওষুধ ছিটানো হয়। বিশেষ করে সচিবালয় এলাকায় ওষুধ ছিটানো হচ্ছে বেশি। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের গুলশান, বনানী, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ওষুধ ছিটানো হয়েছে। কিন্তু এসব এলাকার ভুক্তভোগীরা বলছেন, সিটি করপোরেশন মশার ওষুধ ছিটালেও মশার উপদ্রব কমছে না। রাতে মশারি টাঙানো হলেও মশা ঢুকে পড়ছে। দিনের বেলায়ও মশার উপদ্রব অসহনীয়। রাত যত বাড়ে মশার উপদ্রবও বাড়ে। এ জন্য মশার যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, সেটি কার্যকর কি না, গবেষণা হওয়া দরকার। মশার লার্ভা ধ্বংস করতে সকালে টেমিফস নামের ওষুধ স্প্রে করা হয়। এটি ভারত থেকে আমদানি করা। আর বিকালে উড়ন্ত মশা মারতে মেলাথিউন নামের ওষুধ দিয়ে ফগিং (ধোঁয়া ছড়ানো) করা হয়। এ ওষুধ চীন থেকে আনা। সিটি করপোরেশনের সূচি অনুযায়ী, রমজান মাসে বেলা ৩টা থেকে ইফতারের আগপর্যন্ত প্রতিটি ওয়ার্ডে স্বেচ্ছাসেবীরা মশা নিধনে কাজ করছেন।
আরও পড়ুন
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র বলছে, গত ২০২৫ সালে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪০০ জন। ওই বছরে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে ৫৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ হাজার ৩৬৬ শিশু, যা মোট আক্রান্তের ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। চলতি বছরের শুরু থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৪ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া ১ হাজার ৪৫১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে এক গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আর মশার ৯০ শতাংশই কিউলেক্স। মার্চে মশার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় পানিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া গেছে। ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ১ হাজার ২৫০-এ। একজন মানুষের হাঁটু পর্যন্ত পা ও বাহু উন্মুক্ত রেখে এক ঘণ্টায় কতটি মশা কামড়াতে আসে, তা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৮৫০।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজধানী যেন এখন মশাবাহিত রোগে প্রাণঘাতী শহরে পরিণত হয়েছে। অথচ সিটি করপোরেশন মশা মারতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ রাখে। কিন্তু এডিস মশার সঙ্গে কিউলেক্স নগরবাসীর বড় আতঙ্ক। বাংলাদেশে সাধারণত তিন প্রজাতির মশার বিস্তার দেখা যায়, কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস। এর মধ্যে কিউলেক্সের বিস্তারই বেশি। কিউলেক্সের কামড়ে ফাইলেরিয়া বা গোদরোগ ও জাপানি এনসেফালাইটিস হয়। তবে এ দুটি রোগ দেশে ততটা প্রকট নয়। এডিসের কামড়ে ডেঙ্গু ও অ্যানোফিলিসের কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর তদারকি, ওষুধের মান যাচাই এবং মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
শুধু ধোঁয়া বা ফগিং দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ফগিং মূলত পূর্ণবয়স্ক মশা কমাতে কার্যকর হলেও লার্ভা ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নির্মাণাধীন ভবন, ছাদে জমে থাকা পানি, খোলা ড্রেন ও জলাবদ্ধ জায়গায় নিয়মিত নজরদারি না থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। ওষুধ ছিটিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। গত কয়েক বছরে রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মশা নিধনে শুধু মৌসুমি ও লোক দেখানো অভিযান নয়, বছরব্যাপী সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষ করে ওয়ার্ড ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, নিয়মিত তদারকি এবং মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি জোরদার করা দরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এডিসের সঙ্গে গত বছরের ডিসেম্বরে ঢাকায় সংগৃহীত প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৮৫ শতাংশই ছিল কিউলেক্স প্রজাতির। গত বছর প্রতিদিনই কোনো কোনো এলাকায় এডিস মশার কামড়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অথচ দুই সিটির তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। গরম মৌসুম শুরু হয়েছে। কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস মশা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য একই ধরনের ওষুধ ছিটানো ঠিক কি না, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। কিউলেক্স কিন্তু এডিস মশার চেয়েও ভয়ংকর। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ভয়ংকর রূপ নিতে পারে মশার উপদ্রব। না হলে মশাবাহিত রোগে নগরবাসীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হবে। মশা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে মশার উপদ্রব মোকাবিলায় জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
ডিএসসিসি স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র বলছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০টি অঞ্চলের মধ্যে ৭৫টি ওয়ার্ড। এখানে জনবল রয়েছে ১ হাজার ৫০ জন। মশক নিধনে ব্যবহার করা হয় হাতে চালিত মেশিন ৫৭৫টি, ফগার মেশিন ৫২৫টি ও হুইলব্যারো মেশিন ৩৯টি। প্রতিদিন সকালে লার্ভিসাইড ৩৪ দশমিক ৭৫ লিটার ও বিকালে অ্যাডাল্টিসাই ৪৫ দশমিক ৭০ লিটার কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। মশা নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি অঞ্চলে ১ জন পরিদর্শক, প্রতি ওয়ার্ডে ১ জন সুপারভাইজার ও ১৩ জন কর্মী রয়েছেন। তাদের মধ্যে সকালে লার্ভিসাইডিংয়ে ৭ ও বিকালে অ্যাডাল্টিসাইডিংয়ের জন্য ৬ জন রয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কীটনাশক নির্বাচন ও বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন হয়। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম চলমান রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তালিকা অনুযায়ী প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ অভিযান ও ফেসবুকে সব কার্যক্রম মনিটরিং করা হচ্ছে। এমনকি জনসচেতনতায় হ্যান্ড মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বুধবার রাজধানীর সায়েদাবাদে মশক নিধন কার্যক্রম পরিদর্শন এবং ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা কার্যক্রম ঘুরে দেখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, রাজধানীসহ সারা দেশে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। জলপথ ও স্থলপথ- দুই দিক থেকেই একযোগে মশা নিধন অভিযান শুরু হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা নেওয়াই এখন প্রধান লক্ষ্য। কিউলেক্স মশার উপদ্রব ভয়াবহভাবে বেড়েছে। সরকার শপথ নেওয়ার পর থেকেই ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে কাজ করছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সেগুনবাগিচা এলাকার বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, চলতি বছর শীতকালে উপদ্রব একটু কম থাকলেও ফেব্রুয়ারির প্রথম দিক থেকে বেড়েছে মশা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক জি এম সাইফুর রহমান বলেন, অতীতে মার্চের মাঝামাঝি থেকে মশার উপদ্রব বাড়ত। কিন্তু এবার ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু হয়েছে। এখন আবার এডিস মশার পাশাপাশি কিউলেক্সের উপদ্রব বেড়েছে। কিউলেক্স সাধারণত আগস্ট থেকে বংশবিস্তার শুরু করে। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়লে দ্রুত জীবন চক্র সম্পন্ন করে এবং স্ত্রী মশার রক্তপানের চাহিদা বাড়ে। ঘনঘন ও বেশি পরিমাণে ডিম উৎপাদনে প্রয়োজনীয় বাড়তি প্রোটিন রক্তপান থেকে সঞ্চয় করে। এই জন্য মশার ওষুধ ছিটানো বা স্প্রে করার ক্ষেত্রে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। আসলে এই ওষুধে মশা নিধন হচ্ছে কি না। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মশার ওষুধ ছিটানোয় জনবল সংকট রয়েছে। কিন্তু জনবল সংকট থাকলেও মশার ওষুধ ছিটানো কার্যক্রম বন্ধ নেই।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন সময়ের আলোকে বলেন, মশা নিধনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সম্প্রতি এডিস মশার সঙ্গে নগরবাসীর জন্য দুশ্চিন্তার কিউলেক্স। আগামী ১ মার্চ থেকে প্রাথমিকভাবে ল্যাবে সার্ভে করা হবে। কোথায় মশার উপদ্রব ও প্রজনন বেশি হচ্ছে। কেন উপদ্রব ও প্রজনন বেশি তা গবেষণা হবে। এই গবেষণার প্রেক্ষিতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এএডি/