রমজান মুসলিম উম্মাহর জন্য ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক সংযমের বিশেষ মাস। হাদিসে বর্ণিত আছে, নবীজি (সা.) রজব মাস থেকেই দোয়া করতেন, ‘আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান, অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’ এর মাধ্যমে বোঝা যায়, রমজান ছিল তাঁর কাছে প্রস্তুতি ও প্রত্যাশার মাস; আকস্মিকভাবে নয়, বরং সচেতন পরিকল্পনায় তিনি এ মাসকে স্বাগত জানাতেন।
রমজানে তাঁর অন্যতম প্রধান আমল ছিল কুরআন তেলাওয়াত ও কুরআনচর্চা। সহিহ হাদিসে এসেছে, প্রতি রমজানে জিবরাইল (আ.) তাঁর সঙ্গে কুরআন শুনানি করতেন; ইন্তেকালের বছর তা দুবার সম্পন্ন হয়। এ ঘটনা রমজানের সঙ্গে কুরআনের নিবিড় সম্পর্ককে স্পষ্ট করে। কুরআন শুধু তেলাওয়াতের গ্রন্থ নয়, এটি হেদায়েতের আলোকবর্তিকা। তাই রমজানে নিয়মিত তেলাওয়াতের পাশাপাশি অর্থ বোঝা, তাফসির অধ্যয়ন এবং ব্যক্তিজীবনে তার নির্দেশনা বাস্তবায়নের চেষ্টা হওয়া উচিত।
দানশীলতার ক্ষেত্রেও রমজানে তাঁর হাত অনেক বেশি প্রসারিত হতো। সাহাবিগণ তাঁকে ‘প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও উদার’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ- সব স্তরে কল্যাণ পৌঁছে দিতে সচেষ্ট ছিলেন। রোজাদারকে ইফতার করানোর ফজিলত সম্পর্কেও হাদিসে সুসংবাদ এসেছে। বর্তমান বিশ্বে গাজা, সুদানসহ নানা অঞ্চলে মানবিক সংকট বিরাজমান; আমাদের দেশেও বহু পরিবার নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খায়। রমজান হতে পারে সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বাস্তব অনুশীলনের সময়।
নবীজি (সা.)-এর রমজানের রাতগুলো ছিল ইবাদতে মুখরিত। বিশেষত তাহাজ্জুদে তিনি দীর্ঘ সময় কিয়ামে দাঁড়াতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাঁর পূর্বাপর গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন- এ কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, ‘আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?’ নবীজি (সা.)-এর মতো নিষ্পাপ মানুষ যদি ইবাদত-বন্দেগিতে এত নিবেদিত হতে পারেন, তা হলে আমাদের কেমন হওয়া উচিত? আমরা চাইলে সেহরির আগে কিছু সময় তাহাজ্জুদ, কুরআন তেলাওয়াত বা নীরব দোয়ায় ব্যয় করে এ সুন্নাহর অনুসরণ করতে পারি।
ইফতারের সময় নবীজি (সা.) সাধারণত খেজুর দিয়ে, তা না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করতেন। ইফতারের মুহূর্তকে তিনি দোয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সময় আমাদের ইফতার আয়োজনের ব্যস্ততায় দোয়ার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়। অথচ ইফতারের আগে কয়েক মিনিট একাগ্রচিত্তে দোয়া করে রমজানের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বাড়ানো উচিত। নবীজি (সা.)-এর রমজানের শেষ দশক ছিল অধিক গুরুত্বের। তিনি ইতিকাফে বসতেন, পার্থিব ব্যস্ততা থেকে সরে এসে মসজিদে নিবিড় ইবাদতে সময় দিতেন। লাইলাতুল কদর সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে, এটি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।
তাই শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, দোয়া ও ইস্তিগফারে মনোনিবেশ করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। রোজা কেবল পানাহার বর্জনের নাম নয়, এটি নৈতিক সংযমের প্রশিক্ষণ। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও অন্যায় আচরণ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। গিবত, পরনিন্দা, মিথ্যা প্রচার কিংবা অশালীন বাক্য- এসব থেকে বিরত থাকা রোজার মৌলিক দাবি।
বর্তমান ডিজিটাল সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ সংযম সমানভাবে প্রযোজ্য। এ ছাড়া রমজানে বেশি বেশি ইস্তিগফার ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া করার কথাও হাদিসে উল্লেখ আছে। প্রতিটি দিনই আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভের সুযোগ। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে আত্মসমালোচনা ও সংশোধনের এ সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগানোই রমজানের সার্থকতা।
সময়ের আলো/আআ