চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে ও শয্যা সংকট দূরীকরণে ২০২২ সালে শুরু হয় বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের ১২ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের কাজ। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আর্থিক জটিলতার কারণে নির্মাণকাজ শেষ করে চালু হয়নি ভবনটির কার্যক্রম। কাজ চলছে ঢিমেতালে। ভোগান্তি দূরীকরণে ভবনটির কার্যক্রম দ্রুত চালুর দাবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। অন্যদিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই হাসপাতালের অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে গণপূর্ত বিভাগ।
তথ্য বলছে, ২০২২ সালে প্রায় ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২ তলাবিশিষ্ট বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের কাজ শুরু করে গণপূর্ত বিভাগ। কথা ছিল ১৮ মাসের মধ্যেই শেষ হবে নির্মাণকাজ। কিন্তু সময়সীমা এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি ভবনের শতভাগ নির্মাণকাজ। অন্যদিকে রোগীর চাপ বেশি থাকায় শয্যা সংকটসহ নানা কারণে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা।
বরিশাল গণপূর্ত বিভাগ বলছে, আর্থিক জটিলতার কারণে কয়েক দিন কাজ বন্ধ ছিল। তাই ভবন নির্মাণের কাজ শেষ করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে নতুনভাবে প্রায় তিন কোটি টাকা বাড়িয়ে ফের নির্মাণকাজ চালু করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ভবনটির ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। শিগগির নির্মাণকাজ শেষ করে ভবনটি হস্তান্তর করা হবে বলেও জানানো হয়েছে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম বলেন, বরিশাল জেনারেল সদর হাসপাতালের নির্মাণাধীন ভবনের ৭০ ভাগ কাজ সমাপ্ত হয়েছে। বাকি যে ৩০ ভাগ কাজ আছে তা দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। চলতি বছরের জুন মাস নাগাদ শেষ করে হস্তান্তর করতে পারব বলে আশা করছি। কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে বলেও জানান প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম।
জেলা সিভিল সার্জন সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর সংকট সর্বত্রই রয়েছে। তারপরও সীমিত জনবল দিয়েই সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন তারা। তবে হাসপাতালটির কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হলে বরিশাল বিভাগের মানুষ উন্নত চিকিৎসা পাবেন বলেও জানায় জেলা সিভিল সার্জন সূত্র। এ বিষয়ে কথা হয় বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস.এম. মনজুর-এ-এলাহীর সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, সমন্বয় করে আমরা যতদূর পারছি কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। কাজটি সমাপ্ত হলে আমাদের আরও জায়গার পরিধি বাড়বে। রোগী দেখার ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হবে। মনজুর-এ-এলাহী আরও বলেন, কাজ পুরোপুরি শেষ হলে মানুষ অনেক বেশি উপকৃত হবে। আমরাও চাই কাজটি দ্রুত শেষ করা হোক যাতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়।
দ্রুত ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ করে চালু করতে পারলে দক্ষিণাঞ্চলের চিকিৎসাসেবার মান বাড়ানো যাবে বলে মনে করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের আরএমও মলয় কৃষ্ণ বড়াল বলেন, বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে বর্তমানে ৮টি ওয়ার্ড রয়েছে। এসব ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে ১৩০-১৫০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। এ ছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৬০০-৭০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। মলয় কৃষ্ণ বড়াল আরও বলেন, হাসপাতালের স্থান সংকুলান একটি বিশেষ সমস্যা। নির্মাণাধীন ভবনটি দ্রুত চালু হলে আমাদের দক্ষিণবঙ্গের রোগীদের জন্য সুবিধা হবে। এখন আমরা পর্যাপ্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে পারছি না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের সর্বপ্রথম যাত্রা শুরু করা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বয়সে নুইয়ে পরলেও চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু পর্যাপ্ত শয্যা সংকটের কারণে কাক্সিক্ষত সেবাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ মানুষকে। হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের দাবি, দীর্ঘদিনের পুরোনো হাসপাতালটি আরও বেশি সংস্কার করে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার ভরসাস্থল করে গড়ে তুলতে হবে।
সরেজমিন কথা হয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী আলমগীর হোসেনের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, আমি ও আমার পরিবারের সবাই এই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিচ্ছি। এখানে অনেক দিন ধরে একটি ভবন নির্মাণের কাজ চলছে দেখছি। কিন্তু শেষ হওয়ার নাম নেই। আমরা চাই সরকার এ বিষয়ে দৃষ্টি দেবে।
আসমা বেগম নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, আমার ছেলে এর আগেও ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে এখানে ভর্তি হয়েছে। ওয়ার্ডের অবস্থা বেশি ভালো না। তবে দেখছি নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু কাজ চলছে তো চলছেই, শেষ হওয়ার নাম নেই। ভবনটি খুলে দেওয়া হলে আমাদের অনেক উপকার হবে। রোগীরা চিকিৎসা নিতে পারবে। তাই নির্মানাধীন ভবনটির কাজ দ্রুত শেষ করে রোগীদের জন্য উন্মুক্ত করা হোক এমন দাবি সবার।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, শতাধিক বছরের পুরোনো বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল। ১৯১২ সালে ২০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। নব্বইয়ের দশকে ৮০ শয্যায় উন্নীত করা হয় জেনারেল হাসপাতালটি। সবশেষ ২০ শয্যার ডায়রিয়া ওয়ার্ড নিয়ে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয় বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল।
শতাধিক বছরের পুরোনো হাসপাতালটির মূল ভবনটি এখন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও তা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। উপায় না থাকায় দুটি ভবনের একটিতে বহির্বিভাগ, অন্য ভবনটিতে চলছে জরুরি বিভাগের কার্যক্রম। এ ছাড়া টিনসেড একটি ভবনে ১২ বেডের ডায়রিয়া ওয়ার্ড এবং আরেক পাশে মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ড রাখা হয়েছে। প্রায় সময়ই রোগীর চাপ বাড়লে মেঝেতেও জায়গা পায় না রোগীরা। কিন্তু দিন দিন রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালের পরিসর বাড়ানোর দাবি ওঠে সর্বমহলে।
/এমএইচআর