উত্তরাঞ্চলের অন্যতম কৃষিনির্ভর জেলা সিরাজগঞ্জে দিন দিন বাড়ছে সূর্যমুখী চাষ। কম খরচে বেশি লাভ এবং ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণে সম্ভাবনাময় এই ফসল কৃষকদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাচ্ছে। বাজারে ভালো দামের কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কৃষকরা ঝুঁকছেন এই ফসলের দিকে। ফলে বদলে যাচ্ছে জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষির চিত্র। এদিকে ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটে আসছেন সূর্যমুখী মাঠে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে জেলার ৯টি উপজেলায় ২৮০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে। প্রতি গাছে একটি করে ফুল আসে। বীজ বপনের পর ফসল সংগ্রহ করতে প্রায় তিন মাস সময় লাগে। হেক্টরপ্রতি ১.৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। এ কারণে অনাবাদি ও ফসল কাটার পর পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে কৃষকরা সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এতে জেলায় সূর্যমুখীর আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে নদীভাঙন ও বালুময় চরাঞ্চলে এই ফসল ভালো ফলন দিচ্ছে। ধান কাটার পর পতিত জমি কাজে লাগিয়ে অনেক কৃষক সূর্যমুখী চাষ করছেন। সদর, কাজীপুর, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে। মাঠজুড়ে এখন হলুদ সূর্যমুখীর সমারোহ যা একদিকে যেমন দৃষ্টিনন্দন, অন্যদিকে কৃষকের মুখে ফুটিয়েছে হাসি।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, প্রতি বিঘায় তুলনামূলক কম খরচে ভালো ফলন পাওয়া যায়। রোগবালাইও কম, সেচের প্রয়োজনও সীমিত। ফলে ঝুঁকি কম এবং লাভ বেশি। বাজারে সূর্যমুখীর তেলের চাহিদা বাড়ায় ন্যায্য দাম পাওয়ার আশা করছেন তারা।
সূর্যমুখী ফসলের মাঠে সেলফি তুলতে আসা স্বপ্না পারভীন ও বাবলী খাতুন নামের প্রকৃতিপ্রেমী বলেন, হলুদ রঙে ছেয়ে থাকা বিশাল মাঠ আর নীল আকাশের মিলনে তৈরি হওয়া মনোমুগ্ধকর দৃশ্য আমাদের মুগ্ধ করেছে। তারা আরও বলেন, এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে সময় কাটানো সত্যিই প্রশান্তির আর সূর্যমুখীর সারি সারি ফুলের সঙ্গে ছবি তোলা এক ভিন্ন রকমের আনন্দ দেয়। কেউ কেউ আবার মনে করেন, এই ধরনের ফুলের মাঠ শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও সচেতনতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সদর উপজেলার কাওয়াকোলা ইউনিয়নের বর্ণী চরের কৃষক ইউসুফ আলী বলেন, যমুনার চরাঞ্চলের অধিকাংশ জমি পতিত অবস্থায় পড়ে থাকে। আমি চার বিঘা জমিতে এবার সূর্যমুখী ফুল চাষ করেছি। আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। প্রতি বিঘা জমিতে সাড়ে ৩ হাজার টাকা খরচ করে বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লাভের আশা করছেন। একই উপজেলার বহুলী ইউনিয়নের ধীতপুর আলাল গ্রামের কৃষক আলী আকবর বলেন, গত দুই বছর ধরে সূর্যমুখী ফুল চাষ করছি। এবারও এক বিঘা জমিতে চাষ শুরু করা হয়েছে। ক্ষেত ফুলে ফুলে ভরে গেছে। জমিতে প্রতিটি ফুল যেন হাসিমুখে সূর্যের আলো ছড়াচ্ছে। যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটে তা হলে গত বছরের তুলনায় এবার বেশি লাভের আশা করছেন তিনি। কাজীপুর উপজেলার ভানুডাঙ্গা গ্রামের আনোয়ার হোসেন বলেন, ধান, গম ও ভুট্টার চাষ করতাম। খুব বেশি লাভ হয়নি। গত পাঁচ বছর ধরে ফুল চাষ করছি। ধান ও গমের তুলনায় এতে বেশি লাভ হয়। ভবিষ্যতেও তিনি ফুলের চাষ অব্যাহত রাখবেন। সূর্যমুখী ফুলের চাহিদা ভালো এবং ফলনও ভালো হয়।
চৌহালী উপজেলার ওমরপুর চরের কৃষক আলতাফ হোসেন জানান, সূর্যমুখী চাষের মূল লক্ষ্য তেল উৎপাদন। প্রতি বিঘা জমিতে ৮ থেকে ৯ মণ পর্যন্ত বীজ পাওয়া যায়। প্রতি কেজি বীজ থেকে অন্তত আধা লিটার তেল উৎপাদন সম্ভব। সে হিসাবে প্রতি বিঘায় ১৪০ থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত তেল মিলতে পারে। বর্তমানে প্রতি লিটার সূর্যমুখী তেলের দাম কমপক্ষে ২৫০ টাকা। অথচ প্রতি বিঘায় খরচ হয় সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার টাকা। তেল ছাড়াও বীজের খৈল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তিনি আরও বলেন, অন্য ফসল ভালো না হলেও সূর্যমুখী তুলনামূলক ভালো ফলন দিচ্ছে।
স্বল্প সেচ ও কম পরিচর্যায় এ ফসল উৎপাদন সম্ভব। এ কারণে দিন দিন কৃষকরা ঝুঁকছেন সুর্যমূখীর আবাদে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এসএম নাসিম হোসেন জানান, সদরে বিভিন্ন ফসলের পাশাপাশি সূর্যমুখী ফুলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর আড়াই হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। চরাঞ্চলে চাষের সংখ্যা অনেকটাই বেশি। এতে কৃষকরা লাভবান হবেন।
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক একেএম মনজুরে মাওলা জানান, এ জেলার জমি সূর্যমুখী চাষের জন্য উপযোগী। এ বছর সূর্যমুখী ফুলের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২৮০ হেক্টর যা থেকে ২৭০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। সূর্যমুখী ফুলের বীজ থেকে হাঁস-মুরগির খাবার প্রস্তুত করা যায় এবং তেলের উৎস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এতে থাকা লিনোলিক এসিড হৃৎপিণ্ডের জন্য উপকারী। কৃষি বিভাগ উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিয়ে সূর্যমুখী চাষ বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে।