পবিত্র রমজান মাস সংযম, আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের মাস হিসেবে মুসলিম সমাজে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কিন্তু এ মাসেই নিয়মিত ক্লাস, ব্যবহারিক পরীক্ষা ও টিউটোরিয়ালের চাপ সামলাতে গিয়ে চরম ভোগান্তির কথা জানাচ্ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রোজা রেখে দীর্ঘ যাতায়াত, গরমে ক্লাস করা, একাধিক পরীক্ষা দেওয়া এবং ইবাদতের জন্য সময় বের করার চেষ্টা-সব মিলিয়ে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি বাড়ছে বলে অভিযোগ তাদের।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলমান সেমিস্টারের নির্ধারিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী অধিকাংশ বিভাগেই নিয়মিত ক্লাস ও টিউটোরিয়াল পরীক্ষা চলছে। কিছু অনুষদে ব্যবহারিক পরীক্ষাও শুরু হয়েছে। এতে করে রমজানের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের রুটিনে কোনো শিথিলতা আসেনি।
দীর্ঘ যাতায়াতের কষ্ট
ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রতিদিন ক্যাম্পাসে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। লোক প্রশাসন বিভাগের ৫২তম আবর্তনের শিক্ষার্থী বর্ষা বলেন, সেহরির পর নামাজ আদায় করে ঘুমানোর সুযোগ খুবই সীমিত থাকে। সকালে ক্লাস ধরতে হলে ভোরের পরপরই বের হতে হয়। ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাভারে পৌঁছাতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। দুপুরে ফেরার সময় যানজটে পড়লে সেই সময় আরও বেড়ে যায়।
তার ভাষ্য, রোজা রেখে এত দীর্ঘ যাতায়াত শরীরের ওপর প্রচণ্ড চাপ ফেলে। অনেক সময় মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের সমস্যা বেড়ে যায়। ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
হলে থাকা শিক্ষার্থীদের ভিন্ন সংকট
আবাসিক হলগুলোতে থাকা শিক্ষার্থীরাও স্বস্তিতে নেই।
৫০ তম আবর্তনের আরেক শিক্ষার্থী শুক্কুর বলেন, রমজানে প্রায় ১৩ ঘণ্টা রোজা রেখে ফরজ-নফল ইবাদত পালন করাই শারীরিকভাবে ক্লান্তিকর। এর সঙ্গে প্রতিদিন তিন থেকে চারটি ক্লাস ও নিয়মিত টিউটোরিয়াল যুক্ত হলে চাপ দ্বিগুণ হয়।
তিনি জানান, বাসা থেকে দূরে থাকার কারণে পুষ্টিকর খাবার সবসময় পাওয়া যায় না। অনেক সময় ইফতার বা সেহরিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি থাকে। এর মধ্যেই হঠাৎ করে নিয়মিত ক্লাস ও সাপ্তাহিক একাধিক টিউটোরিয়াল নেওয়া শুরু হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
তার মতে, একাডেমিক ক্যালেন্ডারে সামান্য সমন্বয় আনা হলে পরিস্থিতি সহজ হতে পারত। জানুয়ারি মাসের ছুটি রমজানের সঙ্গে সমন্বয় করা কিংবা পরীক্ষাগুলো অনলাইনে নেওয়ার মতো বিকল্প পদ্ধতি বিবেচনা করা যেতে পারত বলে তিনি মনে করেন।
একাডেমিক চাপ বনাম ইবাদতের সময়
আরিফ নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, রমজানে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা নেওয়া নতুন কিছু নয়, তবে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সময়সূচিতে নমনীয়তা থাকা উচিত। আমরা পড়াশোনার গুরুত্ব অস্বীকার করছি না।
তিনি আরও বলেন, রোজা রেখে দীর্ঘসময় পরীক্ষা দেওয়া বা টানা ক্লাস করা অনেক সময় কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। ইবাদত ও একাডেমিক কার্যক্রমের মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের একাংশের দাবি, রমজানের শেষ দশক ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকেই এ সময় ইতিকাফে অংশ নেন বা অধিক ইবাদতে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষা বা টিউটোরিয়ালের চাপ থাকলে সেই সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থী সংসদের আবেদন
এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ জাকসু প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছে।
তাদের প্রস্তাব, ১৫ রমজানের পর থেকে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রাখা এবং ২০ রমজানের পর নির্ধারিত চূড়ান্ত পরীক্ষাগুলো স্থগিত করা হোক।
জাকসুর শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক আবু উবায়দা ওসামা বলেন, রমজান সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস। শেষ দশকে অনেক শিক্ষার্থী ইতিকাফে অংশ নেন। এ সময়ে একাডেমিক চাপ কমানো হলে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারবেন।
তিনি আরও জানান, ঈদকে সামনে রেখে দূর-দূরান্তে যাতায়াতের চাপ, বাস-ট্রেনের ভিড় এবং সম্ভাব্য ভোগান্তির বিষয়টিও প্রশাসনের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
তার দাবি, প্রশাসন ইতিবাচকভাবে বিষয়টি দেখছে এবং শিগগিরই সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
প্রশাসনের অবস্থান
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে একটি প্রশাসনিক সভা আহ্বান করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এবিএম আজিজুর রহমান বলেন, উপাচার্যের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিতব্য সভায় শিক্ষার্থীদের আবেদন ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানান, একাডেমিক ক্যালেন্ডার বজায় রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা ও ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। ফলে একটি সমন্বিত সিদ্ধান্তের দিকে নজর রয়েছে সবার।
‘সমন্বয়ের প্রত্যাশা’ বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু; শিক্ষার্থীরা চান, এমন একটি সময়সূচি নির্ধারণ করা হোক যাতে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, আবার ধর্মীয় অনুশীলনেও বিঘ্ন না ঘটে।
একাডেমিক উৎকর্ষতা ও ব্যক্তিগত-ধর্মীয় জীবনের ভারসাম্য রক্ষা এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয়ই এখন জাবি শিক্ষার্থীদের প্রধান প্রত্যাশা। প্রশাসনিক সভার সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো ক্যাম্পাস।
সময়ের আলো/আরবিএন