ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে এক পুরোনো কিন্তু অস্বস্তিকর প্রশ্ন। সেই প্রশ্নটা হলো, যুদ্ধ কি কেবল নিরাপত্তা কৌশল, নাকি এটি এক গভীর অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ? যুদ্ধ অর্থনীতি যখন সক্রিয় হয়, তখন প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ে, অস্ত্র নির্মাতা করপোরেশনগুলোর শেয়ার চাঙ্গা হয়, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা নতুন মুনাফার দরজা খোলে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ বা কংগ্রেসীয় অনুমোদনের প্রশ্নগুলো পেছনে সরে যায়। এই টানাপড়েন আসলে সামরিক কৌশল ও নগ্ন পুঁজিবাদের এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করছে।
সামরিক হামলার বৈধতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও করপোরেট স্বার্থ ক্রমেই একই স্রোতে মিলছে। নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক, সামরিক ঘাঁটি বিস্তার; সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এমন এক কাঠামো, যেখানে যুদ্ধ কেবল কূটনৈতিক ব্যর্থতার ফল নয়; বরং অর্থনৈতিক মডেলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আন্তর্জাতিক আইন এখানে নৈতিক কাঠামো, কিন্তু যুদ্ধ অর্থনীতি একটি কার্যকর ব্যবসায়িক কাঠামো। ফলে প্রশ্ন উঠছে : বিশ্ব কি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আইন নয়, মুনাফাই চূড়ান্ত নিয়ামক?
যুদ্ধ অর্থনীতি কিংবা সংঘাতের ভেতরের মুনাফা : যুদ্ধ অর্থনীতি বলতে বোঝায় এমন এক অর্থনৈতিক কাঠামো, যেখানে সামরিক উত্তেজনা, অস্ত্র উৎপাদন, প্রতিরক্ষা বাজেট ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা; সবকিছু মুনাফার সুযোগে পরিণত হয়। সিবিএস নিউজের লাইভ আপডেটে উল্লেখ করা হয়েছে, সামরিক অভিযান ঘোষণার পরই প্রতিরক্ষা খাত ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়।
দ্য আটলান্টিকের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো তার দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক নীতি পদক্ষেপ, যা ‘শক্তি প্রদর্শন’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কিন্তু শক্তি প্রদর্শনের এই রাজনীতি অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা শিল্প, অস্ত্র নির্মাতা করপোরেশন ও জ্বালানি কোম্পানিগুলো সরাসরি লাভবান হয়; এমন বিশ্লেষণ বহুদিন ধরেই বামপন্থি অর্থনীতিবিদরা দিয়ে আসছেন। এই বাস্তবতায় যুদ্ধ কেবল কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি হয়ে ওঠে একটি বাজার-ঘটনা।
নগ্ন পুঁজিবাদ কিংবা আইন, সংবিধান ও শুল্ক-আগ্রাসনের সমীকরণ : নগ্ন পুঁজিবাদ বলতে বোঝানো হচ্ছে এমন এক পুঁজিবাদী কাঠামো, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সরাসরি করপোরেট ও আর্থিক স্বার্থের পক্ষে কাজ করে, আন্তর্জাতিক আইন বা বহুপাক্ষিকতার তোয়াক্কা কম করে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে সমালোচনা করা হয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে; যা সংবিধানগত বিতর্ক তৈরি করেছে।
একই সময়ে শুল্ক আরোপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ; সবকিছু একসঙ্গে প্রয়োগের কৌশলকে অনেকে ‘শুল্ক-আগ্রাসন-যুদ্ধের একীকরণ’ বলছেন। আলজাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার এই কৌশল অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের সমন্বয়। এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ কাঠামো বা বহুপক্ষীয় আলোচনার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
যুদ্ধ-মেশিন ও ইরাক যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি : এখানেই যুক্ত হয় আরও গভীর প্রশ্ন : এই সংঘাত কি ইরাক যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি? দ্য ইন্টারসেপ্ট-এর বিশ্লেষণে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক পদক্ষেপ ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের মতোই ‘অস্পষ্ট লক্ষ্য, দীর্ঘমেয়াদি জড়িত থাকা এবং পরিণতির অনিশ্চয়তা’র দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশ্লেষণে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বারবার এমন যুদ্ধে প্রবেশ করেছে যার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দ্রুত বদলে গেছে, কিন্তু যুদ্ধ-অর্থনীতির চক্র থামেনি।
ইন্টারসেপ্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ইরাক যুদ্ধ আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে একবার সামরিক অভিযান শুরু হলে তা নিজস্ব গতিতে বিস্তৃত হয় এবং সেই বিস্তার সবচেয়ে বেশি উপকৃত করে প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক ঠিকাদারদের।’ এই সতর্কবার্তা বর্তমান ইরান সংকটকে শুধু আঞ্চলিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহত্তর যুদ্ধ-অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করছে।
আমেরিকান ‘ওয়ার মেশিন’ ও নগ্ন পুঁজিবাদের স্থায়ী কাঠামো : ট্রুথআউট-এ বিশ্লেষক নেগিন ওলিয়ায়েই লিখেছেন, ‘আমাদের আমেরিকান ওয়ার মেশিনের সঙ্গে হিসাব চুকাতে হবে। এটি কোনো একক প্রেসিডেন্টের নীতি নয়, বরং একটি প্রজন্মজুড়ে গড়ে ওঠা স্থায়ী কাঠামো।’ তার যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় বাজেট, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও বৈদেশিক নীতির বড় অংশই ক্রমে সামরিককেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, ‘যখন রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধারাবাহিকভাবে বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক উপস্থিতি বিস্তারে বিনিয়োগ হয়, তখন সেটি স্রেফ কৌশল নয়, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক মডেল।’ এই পর্যবেক্ষণ নগ্ন পুঁজিবাদের ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে : যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও করপোরেট সামরিক স্বার্থ একসঙ্গে জড়িয়ে যায়।
মিডটার্ম নির্বাচন কিংবা যুদ্ধ যখন নির্বাচনি পুঁজি : যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মিডটার্ম নির্বাচন রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করেছে। দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এলো, যখন তার জনপ্রিয়তা ও অভ্যন্তরীণ সমালোচনা বাড়ছিল। ইতিহাস বলছে, আন্তর্জাতিক সংকট অনেক সময় শাসক দলের জন্য অভ্যন্তরীণ সমর্থন সংগঠনের হাতিয়ার হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ইস্যুকে সামনে এনে প্রশাসন ভোটারদের মধ্যে ঐক্যের বার্তা দিতে চায়। তবে এই কৌশল সবসময় সফল হয় না। ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তা মনে করিয়ে দেয়।
সিনিয়র ইন্টারন্যাশনাল করেসপনডেন্ট জুলিয়ান বোর্গার দ্য গার্ডিয়ানে লিখেছেন, আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজের দলের পরাজয়ের আশঙ্কা থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মেয়াদের সবচেয়ে বড় জুয়াটি খেললেন। ইতিহাস বলে, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো অত্যন্ত কঠিন। এখন তেহরান সরকারের কাছে এটি স্পষ্ট যে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই শুরু হয়েছে। ফলে তারা তাদের হাতে থাকা সবটুকু শক্তি দিয়ে আক্রমণকারীদের সর্বোচ্চ ক্ষতি করার চেষ্টা করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর স্বার্থ আর অস্তিত্বের রাজনীতি : নিউইয়র্ক পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ইরানকে ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিরাপত্তা প্রশ্ন বরাবরই বড় ফ্যাক্টর। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সামরিক অবস্থান নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে। অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ ও জোট রাজনীতির চাপের মধ্যে একটি শক্ত অবস্থান তার জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। অতএব ইরান প্রশ্নটি কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়; এটি ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত।
বিশ্ব পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য প্রভাব : রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম, সরবরাহ শৃঙ্খল ও বৈশ্বিক বাজারে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। ইউরোপীয় অর্থনীতি, যা ইতিমধ্যে জ্বালানি সংকটে ভুগছে, নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এটি ‘মিলিটারাইজড গ্লোবালাইজেশন’-এর নতুন ধাপ, যেখানে বাজার ও সামরিক শক্তি একে অপরকে পুষ্ট করে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ভাষ্য যত শক্তিশালী হয়, ততই অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন আড়ালে চলে যায়। যুদ্ধ অর্থনীতি একবার সক্রিয় হলে তা নিজস্ব গতিতে এগোয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে গেলেও অর্থনৈতিক চক্র থামে না।