ঢাকা চারশ বছরের প্রাচীন নগরী। আয়তন বেড়ে দুই সিটি করপোরেন ভাগ হয়েছে। ঢাকা তার প্রাচীনত্বের খোলস পাল্টিয়ে ঝকমকে রূপ ধারণ করলেও নাগরিক সেবায় প্রত্যাশিত এগোতে পারেনি। সম্প্রতি দেশের ছয় সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর একাধিকবার প্রশাসক বসানো হয়েছে। এবার প্রশাসক বসানোর ফলে কি নাগরিক সেবা বাড়বে?
সিটি করপোরেশন থেকে নানা নাগরিক সেবা পেয়ে থাকে। মশা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা, ড্রেন পরিষ্কার, রাস্তা পরিচ্ছন্ন, সড়কবাতি, রিকশা নিয়ন্ত্রণ, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন সনদ, ওয়ারিশ সনদ, নাগরিকত্বের প্রত্যয়নপত্র, দ্বিতীয় বিয়েতে আবদ্ধ না হওয়া, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার সত্যায়িত সনদ ও বিভিন্ন প্রত্যয়ন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় নাম তোলা প্রভৃতি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন- ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অস্থিরতার কবলে পড়ে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ফলে এই দুই সংস্থায় কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন ধরে চলমান জনবল সংকট, রাজস্ব আদায় কমে যাওয়াসহ সিদ্ধান্তহীনতা এই স্থবিরতা আরও গভীর করে তোলে। এর প্রভাব পড়ে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়, যেখানে ময়লার স্তূপ, ডেঙ্গু রোগী বৃদ্ধি ও সাধারণ নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়। তবে এখন আশার আলো দেখা যাচ্ছে। নতুন প্রশাসকদের আগমনের মাধ্যমে আশা জাগছে, স্থবিরতা কাটিয়ে গতি ফিরে আসবে।
নতুন প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান ও মো. আব্দুস সালাম দায়িত্ব গ্রহণের পর নাগরিক আস্থা পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তারা বলছেন, পরিচ্ছন্নতা, মশক নিয়ন্ত্রণ, বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, কার্যকর তদারকি এবং শূন্যপদে দক্ষ জনবল নিয়োগ। এর পাশাপাশি জনসাধারণের সচেতনতা ও অংশগ্রহণও অপরিহার্য। কারণ সেবামূলক কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে জনস্বাস্থ্য, পানি সরবরাহ, খাল-ড্রেনের উন্নয়ন, রাস্তাঘাটের সংস্কার এবং সড়কবাতি স্থাপন। জরুরি ভিত্তিতে অটোরিকশা নীতিমালা এবং নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার জন্য এখনই প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই দুই সংস্থার অবস্থান ভালো নয়। নিয়োগের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিভাগে জনবল সংকট বিরাজ করছে। ফলে বড় বড় প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে পড়ে গেছে। বিশেষ করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুরু হওয়া কাজগুলো আর এগোতে পারেনি। এর ফলে সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর সঙ্গে রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে। তবে নতুন প্রশাসকদের উপস্থিতি এই সংকটের সমাধানে একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তারা বলছেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই স্থবিরতা কাটাতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর তদারকি, জনবল নিয়োগ ও রাজস্ব সংগ্রহে গতিশীলতা। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত শ্লথগতি ও অবহেলা দূর করতে হবে। নতুন প্রশাসকদের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের সেবা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে মনোযোগী হওয়া। এতে নগরীর পরিবেশ ও জীবনমান উন্নত হবে। আশা করা যায়, নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে ঢাকার দুই সিটি দ্রুত পুনরুজ্জীবিত হবে, নাগরিকের স্বপ্নের নগরী গড়তে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।
গত দুই বছর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ স্বাস্থ্য অধিদফতর তুলনামূলক তৎপরহীন ছিল। বলা যায়, রাজধানী এডিস মশা নিধনে সিটি করপোরেশন দুটি মূলত কোনো ভূমিকাই রাখেনি। ফলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে মানুষ।
এখন সময় এসেছে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া, সমন্বয় বাড়ানো এবং দায়িত্বশীলতার গুরুভার পালনের মাধ্যমে নাগরিক সেবাকে ত্বরান্বিত করা। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখে নগরবাসী আশান্বিত। এভাবেই স্থবিরতা কাটিয়ে কাজের গতি ফিরবে দুই সিটির, নগরবাসীর জীবনমান উন্নত হবে এবং ঢাকা শহর হবে আরও বাসযোগ্য ও সুন্দর এটাই প্রত্যাশা।
সময়ের আলো/আআ