দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে সরকারের নতুন উদ্যোগ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হচ্ছে আগামী ১০ মার্চ। রাজধানীর কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। একই সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের ১৩ জেলার ১৪টি স্থানে পাইলট পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হবে। দারিদ্র্যের ঘনত্ব, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও অনগ্রসরতার মাত্রা বিবেচনায় এসব এলাকা বাছাই করা হয়েছে।
এদিকে এরই মধ্যে দেশজুড়ে সম্পন্ন হয়েছে বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহ। প্রশাসন ও সমাজসেবা বিভাগের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন জেলায় মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকৃত উপকারভোগী বাছাইয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতার অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে ‘জিরো এরর’ কর্মসূচি। যদিও কিছু এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে প্রতারক চক্র এমন অভিযোগও উঠে এসেছে।
সময়ের আলোর প্রতিনিধিরা ৯ জেলায় সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে সরেজমিন গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন যাচাই কার্যক্রমের।
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রাথমিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তালিকা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা কার্যালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত পরীক্ষামূলক এই কার্যক্রমে প্রায় ৯০০ কর্মী মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছেন। তারা পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আয়-ব্যয় ও সামাজিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহ করছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড়ি বাড়ি প্রশাসনের লোকজন আসছে। কার্ড পাওয়ার যোগ্য লোকদের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। তালিকাভুক্ত করতে কোনো ধরনের অনিয়ম নিয়ে কেউ কোনো অভিযোগ জানায়নি।
অন্যদিকে ফ্যামিলি নির্বাচনে কোনো ধরনের ভুল যেন না থাকে সে লক্ষ্য নিয়ে জিরো এরর কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
ফ্যামিডি কার্ডের কার্যক্রম সঠিকভাবে চলছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, আপাতত নগরীর ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে কার্যক্রম চলছে। কার্ড পেতে পরিবারগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে কোনো ধরনের হয়রানির অভিযোগ নেই। আমরা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।
গত ১ মার্চ নগরীর কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে জেলা প্রশাসক নিজেই কয়েকটি বাসায় যান এবং তথ্য সংগ্রহের অগ্রগতি দেখেন।
এ সময় তিনি সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে বলেন, তথ্য সংগ্রহে কোনো ধরনের গাফিলতি সহ্য করা হবে না। পতেঙ্গার বাটারফ্লাই এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত নাবিক নুর বক্সের বাসায় গিয়ে তথ্য যাচাই কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন জেলা প্রশাসক।
নুর বক্স বলেন, কখনো ভাবিনি ডিসি স্যার নিজে বাসায় এসে তথ্য যাচাই করবেন। তার আচরণে আমরা মুগ্ধ।
পরিদর্শনের সময় রোকেয়া বেগম নামের এক নারীর কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন জেলা প্রশাসক। তিনি সহজ ভাষায় প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারগুলোকে রাষ্ট্র সহায়তা করবে, তবে এ জন্য সঠিক তথ্য দেওয়া জরুরি। পতেঙ্গার বাটারফ্লাই এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত নাবিক নুর বক্সের বাসায় গিয়ে তথ্য যাচাই কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন জেলা প্রশাসক।
খুলনা : খুলনা সিটি করপোরেশনের খালিশপুর ১০ নং ওয়ার্ডে প্রদান করা হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড। খালিশপুরে কার্ড পাবে ১১ হাজার ৮০০ পরিবারের মধ্যে সঠিক সুবিধাভোগী নির্বাচন, ভোটার আইডি সংক্রান্ত জটিলতা এবং মাঠ পর্যায়ে প্রতারক চক্রের সক্রিয়তা প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদিও ২০০ জন কর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন, তবু শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শহর ও গ্রামের প্রতিটি পরিবারের মধ্যে এখন উৎসাহ এই কার্ড নিয়ে। অধিকাংশ পরিবারের মহিলা সদস্যরা একটি কার্ডের আশায় জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন।
১০ নং ওয়ার্ডের নয়াবাটি এলাকার বাসিন্দা নার্গিস বেগম বলেন, সুযোগসন্ধানী প্রতারক চক্রও কার্ড দেওয়ার কথা বলে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পথ খুঁজছে। একটি চক্র এ ওয়ার্ডের মহিলাদের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটার আইডি কার্ড সংগ্রহ করছিল। জানাজানি হওয়ায় তারা পালিয়ে যায়।
১০ নং ওয়ার্ডের চিত্রালি বাজার সংলগ্ন এলাকার রুমানা বেগম বলেন, ফ্যামিলি কার্ড পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে অনেকের বাড়িতে গিয়ে নানা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ারও চেষ্টা করছে। কার্ড বিতরণ প্রক্রিয়া শুরুর আগে এ প্রতারক চক্র বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এখনই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপি নেতা কেসিসির ১০ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ফারুক হিল্টন বলেন, এ কার্ড পাবে না পরিবারে কেউ সরকারের পেনশনভোগী থাকলে। বাড়িতে এসি ব্যবহারকারী বা গাড়িসহ বিলাসবহুল সম্পদের মালিক। পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি চাকরিজীবী থাকলে এবং বাণিজ্যিক লাইসেন্সের মালিক বা বড় ব্যবসা থাকলে।
সমাজসেবা কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনি বলেন, শুধু হতদরিদ্র, নিম্ন আয়ের মানুষ এবং সঠিক নিয়ম মানবে শুধু তাদেরই কার্ড দেওয়া হবে। তবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে মাঠ পর্যায়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদের। প্রতারক চক্র রাজনৈতিক পদ-পদবি ব্যবহার করে আমাদের ভয়ভীতি দেন। এ বিষয়ে প্রশাসন ও দায়িত্বশীলদের সজাগ দৃষ্টি দেওয়ার জন্য জোর দাবি জানাই।
দিনাজপুর : দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ১ নং জয়পুর ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে পাইলটিং কর্মসূচির অধীনে তথ্য সংগ্রহের জন্য ৯টি গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি গ্রুপে একজন স্বাস্থ্য সহকারী, একজন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক, একজন ইউনিয়ন সমাজকর্মী, একজন আনসার ভিডিপি সদস্য ও একজন গ্রাম পুলিশ রয়েছেন।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে উপজেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা কার্যালয় স্থানীয় পর্যায়ে তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে। মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থা (হতদরিদ্র/দরিদ্র) পরিবারের সদস্য সংখ্যা, আয়-ব্যয়, বসতবাড়ির অবকাঠামোসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছে।
নবাবগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন/উপকারভোগী নির্বাচন কমিটির সদস্য সচিব শুভ্র প্রকাশ চক্রবর্তী সময়ের আলোকে বলেন, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ১ নং জয়পুর ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের প্রতিটি ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। আর তা বাস্তবায়নে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপ কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলো সরকারের ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের আওতায় আনতে স্বচ্ছ ও সঠিকভাবে তথ্য সংগ্রহে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সমাজসেবা কর্মকর্তা জানান, তথ্য সংগ্রহ শেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাপসের মাধ্যমে অটো সিলেকশন করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কারও কোনো হাত থাকবে না অথবা কোনো ধরনের দুর্নীতি করার উপায় নেই বাস্তবায়ন কমিটির কোনো সদস্যের।
নাটোর : নাটোরের লালপুর উপজেলার ঈশ্বরদী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে উপকারভোগীর ৮১৬টি খানার জরিপ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এ বিষয় লালপুর উপজেলা
নির্বাহী কর্মকর্তা জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, গ্রামীণ এলাকায় বসতভিটাসহ আবাদি জমির পরিমাণ ০.৫০ একর বা তার কম এবং পরিবারের মাসিক আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে এই যোগ্যতা নির্ধারিত হবে। এই কার্ডটি সরাসরি পরিবারের ‘মা’ বা ‘নারী প্রধান’ সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে। সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ স্কোরিং ব্যবহার করা হবে।
সমাজকল্যণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, পাইলটিং পর্যায়ে ০-১০০০ স্কোরের মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কোয়ান্টাইলের অন্তর্ভুক্ত অতিদরিদ্র, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
ভোলা : ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার আসলামপুর ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডে মোট ৪৭৯টি পরিবার চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পরিবারের কাছ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে এবং প্রতিটি পরিবারের পক্ষ থেকে একজন নারী সদস্যকে কার্ডের প্রধান সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মামুন হোসেন জানান, প্রতিটি পরিবারের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনলাইনের মাধ্যমে প্রক্সি মিন্স টেস্ট (পিএমপি) পদ্ধতিতে যাচাই-বাছাই করা হবে। এই পদ্ধতিতে ০ থেকে ৭৭৯ স্কোরের পরিবারগুলো অতিদরিদ্র হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তারা অগ্রাধিকারভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ড পাবে। এ ছাড়া ৮১৪ স্কোর পর্যন্ত পরিবারগুলো প্রথম ধাপের আওতায় থাকবে। এর বেশি স্কোরধারীরা নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
বুধবার সরেজমিন কথা হলে সুরমা বেগম নামে এক বাসিন্দা জানান, ফ্যামিলি কার্ড করার জন্য তাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের টাকা-পয়সা নেওয়া হয়নি।
সুইটি আক্তার বলেন, সরকারের এ উদ্যোগে আমরা খুবই খুশি। তবে আমরা চাই প্রকৃত উপকারভোগীরাই যেন এই সুবিধা পান এবং কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়।
তাসলিমা নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, আমরা আগে টিভিতে এই কর্মসূচির কথা শুনেছি। এখন আমাদের কাছ থেকে কাগজপত্র নেওয়া হয়েছে। আশা করি আমরা এই সুবিধা পাব।
রাজবাড়ী : রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম জানান, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য দুজন করে ১০০ জনের ৫০টি গ্রুপ হাবাসপুর ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের চর ঝিকড়ী গ্রামে তথ্য সংগ্রহের কাজ করছেন। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। ঢাকা থেকে আগত তিন সদস্যের একটি টিম তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম মনিটরিং করছেন।
তিনি আরও জানান, ৫ নং ওয়ার্ডে বসবাসরত সব পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে কতজন ফ্যামিলি কার্ড পাবেন তা এখনও সঠিক বলা যাচ্ছে না। আমাদের বলা হয়েছে সব পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করতে, আমরা সেটি করেছি।
হাবাসপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আল মামুন খান জানান, অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে ৫ নং ওয়ার্ডের প্রায় ১ হাজার ৭০০ পরিবারের ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর আগে এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে, যাতে এ কার্যক্রম থেকে কেউ বাদ না পড়ে।
সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের লক্ষ্যে উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের আকিল শাহ, রাধানগর ও উত্তর সুরিয়ারপাড় গ্রামকে বাছাই করা হয়েছে। তিনটি গ্রামের ৯৫৪টি পরিবার জরিপ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. সাব্বির সারোয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আলী আহাদ জানান, আমাদের গ্রামকে ফ্যামিলি কার্ডের প্রথম মনোনীত করায় নতুন সরকারকে ধন্যবাদ জনাই। অনেক সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে টাকা নেওয়ার জন্য ধান্দা করছে কিন্তু যারা এ ব্যাপারে জরিপ করেছেন বিশেষ করে সমাজসেবা অফিসের লোকজন সবাইকে সচেতন করায় অসাধু লোকরা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার সুযোগ পাচ্ছে না।
দিরাই উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. সাব্বির সারোয়ার বলেন, আমরা বিভিন্নভাবে দফায় দফায় তিনটি গ্রামে জরিপ করেছি। মঙ্গলবার পর্যন্ত ছিল পরিবারগুলোর তথ্য জমা দেওয়ার শেষ দিন। আমরা যাচাই-বাছাই করে ৭৮৫টি পরিবারের তথ্য সার্ভারে জমা দিয়েছি। ফ্যামিলি কার্ডের ব্যাপারে কারও সঙ্গে আর্থিক লেনদেন না করার জন্য সবাইকে সচেতন করা হয়েছে।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার সময়ের আলোকে জানান, কুলঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডে তিন গ্রামের কতটি ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে তা আমরা জানতে পারিনি। এখন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন।
ঠাকুরগাঁও : ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধনের লক্ষ্যে মাঠ জরিপের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে ঠাকুরগাঁও সমাজসেবা কার্যালয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সারোয়ার মোর্শেদ জানান, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রহিমানপুর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের ১ হাজার ৩৫ জনের প্রাথমিক খসড়া তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তার মধ্যে ৯৭০ জনের ডাটা এন্ট্রি সম্পন্ন করা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র না পাওয়ায় ৬৫ জনের ডাটা এন্ট্রি আপাতত সম্ভব হচ্ছে না।
বান্দরবান : দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে সারা দেশের মতো লামা উপজেলায় সরকার ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিম্নআয়ের মানুষের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন জানান, লামা উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৩০০ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে আবেদনকারীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্তভাবে উপকারভোগীর সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন প্রক্রিয়া : উপকারভোগী নির্বাচন হবে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) স্কোরিং’ পদ্ধতিতে। ০ থেকে ১০০০ স্কোরের ভিত্তিতে প্রথম (০-৭৭৭) ও দ্বিতীয় (৭৭৮-৭৯৬) কোয়ান্টাইলভুক্ত অতিদরিদ্র ও দরিদ্র পরিবারগুলো পাইলট পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত হবে। পিএমটি হলো সম্পদ ও আয়ের ভিত্তিতে দারিদ্র্য নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। গ্রামীণ এলাকায় বসতভিটাসহ আবাদি জমি সর্বোচ্চ ০.৫০ একর হতে হবে। সরকারি চাকরিজীবী বা পেনশনভোগী সদস্য, বড় ব্যবসা বা বাণিজ্যিক লাইসেন্সধারী পরিবার এবং বিলাসবহুল সম্পদ (গাড়ি, এসি) থাকলে তারা অযোগ্য বিবেচিত হবে। ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠী যেমন হিজড়া, বেদে ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবারগুলো এই তালিকায় অগ্রাধিকার পাবে।
নারীর নামে কার্ড, মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা : নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে কার্ডটি পরিবারের ‘মা’ বা নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা হবে। পাইলট পর্যায়ে প্রতিটি পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। অর্থ সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
একই স্মার্ট কার্ড ও ওটিপি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী খাদ্য সহায়তা পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে শিক্ষা উপবৃত্তি, কৃষি ভর্তুকি ও অন্যান্য ভাতা এ কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যমান টিসিবি কার্ডকে ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রির (ডিএসআর) একীভূত করা হবে।
যেসব এলাকায় পাইলট বাস্তবায়ন : পাইলট প্রকল্পের জন্য দেশের ১৪টি ভিন্নধর্মী এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকার বনানী (কড়াইল বস্তি), মিরপুরের শাহ আলী এলাকার আলী মিয়ার টেক বস্তি ও ১৪ নাম্বার ওয়ার্ডের বাগানবাড়ি বস্তি, পাংশা (রাজবাড়ী), পটিয়া (চট্টগ্রাম), বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), লামা (বান্দরবান), খালিশপুর (খুলনা), চরফ্যাশন (ভোলা), দিরাই (সুনামগঞ্জ), ভৈরব (কিশোরগঞ্জ), বগুড়া সদর, লালপুর (নাটোর), ঠাকুরগাঁও সদর এবং নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর)। দারিদ্র্যের ঘনত্ব, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও অনগ্রসরতার মাত্রা বিবেচনায় এসব এলাকা বাছাই করা হয়েছে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার জেলা প্রতিনিধিরা)