চাঁদপুরের মতলব উত্তরে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের খালগুলো ৩৮ বছরেও সংস্কার না হওয়ায় প্রতি বছর ফসল উৎপাদন কমছে। খাল সংস্কার না করায় পলি ও কচুরিপানায় ভরে যাচ্ছে খাল। বর্ষায় বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে প্রতি বছর ৩০ হাজার টন ফসল উৎপাদন কমছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। উৎপাদন কমায় কৃষক বঞ্চিত হচ্ছে মুনাফা অর্জন থেকে।
১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এতে ৬৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে। সেচ প্রকল্পের অভ্যন্তরে ১৭ হাজার ৫৮৪ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের অভ্যন্তরে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫২ দশমিক ৬৪ কিলোমিটার খাল এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে খনন হয়নি।
এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলার কৃষি উদ্যোক্তা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. আতাউর রহমান সরকার বলেন, জলাবদ্ধতায় বছরে প্রায় ৩০ হাজার টন ফসল উৎপাদন কমছে। সঠিকভাবে খাল পুনঃখনন করা গেলে এই প্রকল্প এলাকায় সারা বছর ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন সবজি উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে স্থানীয় চাহিদা পূরণ না হয়ে বাইরে থেকে কোটি টাকার সবজি আমদানি করতে হচ্ছে। খাল পুনঃখনন করা গেলে বছরে চার মৌসুম ফসল উৎপাদন সম্ভব। অন্যথায় কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের উপ-সহকারী প্রকৌশলী তন্ময় পাল জানান, কালিপুর ও উদমদীর দুটি পাম্প হাউসের মোট ১০টি মেশিন একসঙ্গে প্রায় ২৫৫ কিউসেক পানি সেচ দিতে সক্ষম। ইতিমধ্যে ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের ১১৮ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার খাল খননের প্রস্তাব করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল মোহাম্মদ আলী জানান, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ফসলের ক্ষতি অব্যাহত থাকবে। কৃষকরা আরও বড় আর্থিক সংকটে পড়বেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, বর্তমান সরকারের খাল খনন একটি মেগা প্রজেক্ট। আশা করছি অতি দ্রুতই মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের খালগুলো খনন হবে। আমরা ইতিমধ্যে দুটি খাল খননের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি পাঠিয়েছি।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, মতলব উত্তরে মেঘনা-ধনাগোদা-সেচ প্রকল্পে প্রধানত তিন ধরনের জলাবদ্ধতা রয়েছে। স্থায়ী, অস্থায়ী এবং মাঝারি। স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমি। যেখানে সারা বছর পানি জমে থাকে। মাঝারি জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতির সম্মুখীন হয় যা কৃষকদের মারাত্মক ক্ষতির মুখে ফেলছে।
মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বিগত ৩৮ বছরে ১৫২ দশমিক ৬৪ কিলোমিটার খালের মধ্যে শুধু ১২ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। ১৪০ দশমিক ৬৪ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়নি। সেচ প্রকল্প প্রতিষ্ঠার ৩৮ বছরেও খালগুলোর অব্যবস্থাপনা ও অবৈধ দখলের কারণে এসব এলাকার পানি সঠিকভাবে নিষ্কাশিত হয় না। ফলে ফসল রোপণের মৌসুম গড়িয়ে যায়। এতে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল নদী ও খালের দখল বন্ধ করে অধিক ফসল ঘরে তোলা। কিন্তু খাল দখল ও খনন না হওয়ায় সেচ কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে। আবাদি জমি ধ্বংসের পথে। এ ছাড়া প্রকল্পের অভ্যন্তরে যত্রতত্র বাড়িঘর নির্মাণের কারণে প্রতি বছর ফসলি জমির পরিমাণ কমছে।
মতলব উত্তরের ৬৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ ১৭ হাজার ৫৮৪ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পেতে এবং ১৩ হাজার ৬০২ হেক্টর জমিতে সেচের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নির্মিত হলেও এখনও সেই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হয়নি। এখলাসপুর ও ডুবগীতে দুটি বুস্টার পাম্প হাউসের ধারণক্ষমতা ২৫৫ কিউসেক পানি প্রবাহের সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
বোরো মৌসুমে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে ৫ হাজার ৬১৯ হেক্টর গ্র্যাভিটি সিস্টেমের মাধ্যমে সেচ পায়। প্রায় ৮৮৬ দশমিক ৮৬ হেক্টর জমিতে কৃষকরা নিজ উদ্যোগে টিউবওয়েলের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করে। প্রায় ৪৯৩ দশমিক ৪০ হেক্টর জমিতে লো-লিফট পাম্পের মাধ্যমে সেচ প্রদান করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাবে খালগুলো বেদখল হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে খালের স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করেন, জলাবদ্ধতার কারণে ফসলের ক্ষতি অব্যাহত রয়েছে। পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও খাল খননের অভাবে মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের সম্ভাবনাময় কৃষি ক্ষেত্র পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না।
এফআর