প্রতীকী ছবিইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তির অন্যতম ‘জাকাত’। ঈমান ও নামাজের পরই এর অবস্থান। সামর্থ্যবান মুসলিমদের দায়িত্ব তাদের সম্পদের একটি অংশ অসহায়-গরিবদের জন্য দান করা। তবে কাদের ওপর জাকাত ফরজ, কোন কোন সম্পদের জাকাত দিতে হবে, কতটুকু দিতে হবে, জাকাতের হিসাব কীভাবে করতে হবে, জাকাত গ্রহণ করতে পারবে কারা ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন মুফতি আমিন ইকবাল।
জাকাতের পরিচয়
জাকাত আরবি শব্দ, যার অর্থ পবিত্র হওয়া, পরিশুদ্ধ হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া। মহান আল্লাহ জাকাতকে ‘বঞ্চিত ও মুখাপেক্ষী মানুষের অধিকার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জাকাতকে সুদবিহীন দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের বাহন এবং নিজের অর্জিত সম্পদ পবিত্র করার মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পবিত্র কুরআনের সুরা জারিয়াতের ১৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তাদের (সম্পদশালীদের) ধনসম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে।’ সুরা তওবার ১০৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তুমি ওদের ধনসম্পদ থেকে সদকা আদায় করো, এর দ্বারা তুমি তাদের পবিত্র করে দেবে।’ সুরা রোমের ৩৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ধনসম্পদ বৃদ্ধির জন্য তোমরা যা সুদ দিয়ে থাকো তা আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। কিন্তু তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য জাকাত দাও, তাদের ধনসম্পদ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।’ এভাবে জাকাতের মাধ্যমে সামর্থ্যবানদের ধনসম্পদের কিছু অংশ ব্যয়ের ফলে তাদের অবশিষ্ট ধনসম্পদ পরিশুদ্ধ বা পবিত্র হয়।
ইসলামে জাকাতের অবস্থান
ইসলামের মূল ভিত্তি পাঁচটি ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত। পবিত্র কুরআনে নামাজের পরই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জাকাতের। কুরআনের বহু স্থানে নামাজের পাশাপাশি জাকাত আদায়ের কথা বলা হয়েছে। এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নামাজ আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো। তোমরা যে উত্তম কাজ নিজেদের জন্য অগ্রে প্রেরণ করবে তা আল্লাহর কাছে যাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখছেন’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১১০)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নামাজ আদায় করো, জাকাত দাও এবং রাসুল (সা.)-এর আনুগত্য করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহভাজন হতে পারো।’ (সুরা নুর : আয়াত ৫৬)
জাকাত ফরজ যাদের ওপর
আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য জাকাত দেওয়া আবশ্যক। যার কাছে নিসাব পরিমাণ (যে পরিমাণ ধনসম্পদ থাকলে জাকাত প্রদান করা ফরজ হয়, ইসলামি পরিভাষায় তাকে নেসাব বলা হয়) সম্পদ আছে এমন স্বাধীন ও পূর্ণবয়স্ক মুসলিম নর-নারী জাকাত আদায় করবে। তাদের ওপর জাকাত ফরজ। তবে এর জন্য শর্ত হলো এক. সম্পদের ওপর পূর্ণাঙ্গ মালিকানা থাকতে হবে। দুই. সম্পদ উৎপাদনক্ষম ও বর্ধনশীল হতে হবে। তিন. নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে। চার. সারা বছরের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত সম্পদ থাকলেই শুধু জাকাত ফরজ হবে। পাঁচ. ঋণমুক্ত হওয়ার পর নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে। ছয়. কারও কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর থাকলেই শুধু ওই সম্পদের ওপর জাকাত দিতে হবে। জাকাতের টাকায় অসহায়-গরিবরা সচ্ছল হবেন, স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা এমন লোক যাদের আমি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করি, তারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে, সৎকাজের আদেশ করে ও মন্দকাজে বাধা প্রদান করে।’ (সুরা হজ : আয়াত ৪১)
কতটুকু সম্পদে জাকাত দিতে হয়
যাপিত জীবনের মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের ৪০ ভাগের এক ভাগ (শতকরা হিসেবে আড়াই ভাগ) জাকাত আদায় করতে হয়। অর্থাৎ সম্পদের ৪০ ভাগের ১ ভাগ এবং শতকরা আড়াই টাকা হারে এক হাজারে পঁচিশ টাকা এবং এক লাখে আড়াই হাজার টাকা জাকাত ফরজ হবে। জাকাত ফরজ হওয়া সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করে সঠিক মূল্য নির্ধারণ করে এর ৪০ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ শতকরা আড়াই টাকা জাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে। সামান্য কম হলেও জাকাত আদায় হবে না। জাকাতের টাকা একজনকে দেওয়া যায়, আবার একাধিক ব্যক্তির মাঝে বণ্টন করেও দেওয়া যায়। তবে জাকাতের নামে নিম্নমানের শাড়ি-লুঙ্গি দেওয়া ঠিক না। বরং অসহায় মানুষকে জাকাতের টাকায় স্বাবলম্বী করে তোলাই হোক লক্ষ্য।
জাকাতের নেসাব
স্বর্ণ-রুপা, নগদ টাকা, ব্যবসায়ী পণ্য, গবাদিপশু এবং
কৃষি ফসলের জাকাত দিতে হয়। নিচে কোনটার কী নেসাব তা উল্লেখ করা হলো।
স্বর্ণ-রুপার নেসাব : স্বর্ণের নেসাব হলো সাড়ে ৭ ভরি (তোলা)। রুপার নেসাব হলো সাড়ে ৫২ ভরি (তোলা)। স^র্ণ ও রুপা উভয়টি যদি কারও কাছে থাকে এবং এর কোনোটাই নেসাব পরিমাণ না হয়, তবে উভয়টির মূল্য হিসাব করে দেখতে হবে। মূল্য যদি একত্রে রুপার নেসাব পরিমাণ হয়ে যায়, অর্থাৎ ৫২.৫ ভরি রুপার মূল্যের সমান হয়ে যায় তবেই জাকাত আদায় করতে হবে।
নগদ টাকার নেসাব : নগদ টাকার নেসাব হলো, বাজারদর হিসাবে অন্তত সাড়ে ৫২ ভরি রুপার মূল্যের পরিমাণ টাকা এক বছর জমা থাকলে এর জাকাত আদায় করতে হবে (এ বছর সাড়ে ৫২ ভরি রুপার বাজারদর প্রায় ৭৩ হাজার টাকা)। হাতে ও ব্যাংকে রক্ষিত নগদ অর্থ ছাড়াও সঞ্চয়পত্র, সিকিউরিটি, শেয়ার সার্টিফিকেট ইত্যাদি নগদ অর্থ বলে গণ্য হবে।
ব্যবসায়ী পণ্যের নেসাব : ব্যবসায়ী পণ্যের নেসাব হলো, কোনো জিনিস বিক্রি করার উদ্দেশ্যে রাখা হলে তাকে ব্যবসার পণ্য মনে করা হবে। সাড়ে ৫২ ভরি রুপার মূল্যের সমান মূল্যমান সম্পন্ন ব্যবসার পণ্যের জাকাত দিতে হবে। বছরান্তে তখনকার বাজারদর হিসাবে মূল্য ধরতে হবে। খরিদ মূল্য ধরলে চলবে না।
কৃষি ফসলের নেসাব : কৃষি ফসলের ক্ষেত্রে প্রতিটি শ্রেণির ফসলের নেসাব পৃথক পৃথকভাবে হিসাব করে নেসাব পরিমাণ ফসল হলে উশর দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ধান যদি ৩০ মণ বা তার বেশি হয়, পাট যদি ৩০ মণ বা তার বেশি হয়, তা হলে ফসল তোলার সময়ই তার উশর দিতে হবে। তেমনিভাবে কলাই, সরিষা, মধু ইত্যাদি প্রতিটির নেসাব পৃথকভাবে ধরতে হবে। খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে কোনো নেসাব নেই। খনিজ সম্পদ ব্যক্তিমালিকানায় থাকলে সম্পদ উত্তোলনের পরই হিসাব করে জাকাত দিতে হবে। খনিজ সম্পদের জাকাতের হার হচ্ছে ২০ শতাংশ।
গবাদিপশুর জাকাত : নিজের কাজে খাটে এবং বিচরণশীল বা ‘সায়েমা’ নয় এমন গরু-মহিষ বাদ দিয়ে ৩০টি হলেই তার ওপর জাকাত দিতে হবে। জাকাতের হার হবে প্রতি ৩০টির জন্য একটি এক বছর বয়সের গরু এবং প্রতি ৪০টি বা তার অংশের জন্য দুই বছর বয়সের একটি গরু। আর ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৪০টি হলে একটি, ১২০টি পর্যন্ত দুটি, ৩০০টি পর্যন্ত তিনটি এবং এর ওপরে প্রতি ১০০টি ও তার অংশের জন্য আরও একটি করে ছাগল জাকাত দিতে হবে।
সম্পদ এক বছর অতিবাহিত হওয়া
জাকাত আদায় ফরজ হওয়ার একটি মৌলিক শর্ত হলো স্বর্ণ, রুপা, টাকা-পয়সা বা ব্যবসার পণ্য নেসাব পরিমাণ হওয়ার পর তৎক্ষণাৎ জাকাত আদায় করা ফরজ হয় না; বরং এক বছর পর্যন্ত নিজের মালিকানাধীন থাকলেই জাকাত আদায় করা ফরজ হয়। অতএব নেসাব পরিমাণ হওয়ার সঙ্গে এক বছর অতিক্রান্ত হওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বছরের শুরুতে যদি নেসাব পরিমাণ মাল বা টাকা-পয়সা থাকে আর বছরের মধ্যবর্তী সময় নেসাবের চেয়ে কম হয়, আবার বছরের শেষাংশে নেসাবের পরিমাণ হয়ে যায় অথবা বছরের মধ্যবর্তী সময় আরও বৃদ্ধি পায় উভয় অবস্থাতেই বছরান্তে যে পরিমাণ মাল বা টাকা থাকবে তার জাকাত হিসাব করে আদায় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, বছরের শেষে কী পরিমাণ থাকে তাই ধর্তব্য। মধ্য বছরের হ্রাস-বৃদ্ধি ধর্তব্য নয়।
জাকাত কাদের দেওয়া যাবে
যে ব্যক্তির কাছে জাকাতযোগ্য সম্পদ নেসাব পরিমাণ নেই এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত অন্য ধরনের মালও নেসাব পরিমাণ নেই এই ব্যক্তিকে জাকাত দেওয়া যাবে। পবিত্র কুরআনের সুরা তওবার ৬০ নং আয়াতে আট শ্রেণির লোকের কথা উল্লেখ রয়েছে, যাদের জাকাত দেওয়া যাবে। তারা হলেন
১. ফকির। বাংলায় তাদের গরিব বলা হয়।
২. মিসকিন। যাদের আর্থিক অবস্থা গরিবদের চেয়েও খারাপ, তারাই মিসকিন।
৩. আমেল। জাকাতের কাজে নিযুক্ত ব্যক্তি।
৪. মন জয় করার জন্য। ইসলামের বিরোধিতা বন্ধ করা বা ইসলামের সহায়তার জন্য কারও মন জয় করার প্রয়োজন হলে তাকে জাকাত দেওয়া যাবে। ইসলামের শুরুর দিকে এর প্রয়োজনীয়তা ছিল। বর্তমানে এই খাতের খুব একটা প্রয়োজন নেই। তবে নওমুসলিমদের সমস্যা দূর করার জন্য জাকাত তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করা যাবে।
৫. দাস মুক্তি। দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ লোক এবং ইসলামের জন্য বন্দিদের মুক্ত করাতে তাদের জন্য জাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে।
৬. ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধ। ঋণভারে জর্জরিত লোকেরা মানসিকভাবে সর্বদাই ক্লিষ্ট থাকে এবং কখনো কখনো জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ে। তাদের ঋণমুক্তির জন্য জাকাতের টাকা দেওয়া যাবে।
৭. আল্লাহর পথে ব্যয়। কুরআনের ভাষায় এ খাতের নাম বলা হয়েছে ‘ফি সাবিলিল্লাহ’, যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর পথে। আল্লাহর পথে কথাটি খুব ব্যাপক। মুসলমানদের সব নেক কাজ আল্লাহর পথেরই কাজ।
৮. মুসাফির। মুসাফির বা প্রবাসী লোকের বাড়িতে যত ধনসম্পত্তিই থাকুক না কেন, পথে বা প্রবাসে সে যদি অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে তা হলে তাকে জাকাত তহবিল হতে প্রয়োজনীয় সাহায্য দেওয়া যাবে।
জাকাত নেই যেসব সম্পদে
১. নিজ ও পোষ্য পরিজনের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও বাহনের ওপর জাকাত ফরজ নয়।
২. গৃহের আসবাবপত্র যেমন খাট, চেয়ার-টেবিল, ফ্রিজ, আলমারি ইত্যাদি এবং গার্হস্থ্য সামগ্রী যেমন হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাটি, গ্লাস ইত্যাদির ওপর জাকাত ফরজ নয়, তা যত উচ্চমূল্যেরই হোক না কেন।
৩. পরিধেয় বস্ত্র, জুতা যদি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশিও থাকে তবু তাতে জাকাত ফরজ হবে না।
৪. দোকানপাট বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এমন আসবাবপত্র যা ব্যবসা পণ্য নয়, তার ওপর জাকাত ফরজ নয়। তবে ফার্নিচারের দোকানে বিক্রির উদ্দেশ্যে যেসব ফার্নিচার রাখা থাকে তা যেহেতু বাণিজ্য পণ্য তাই এসবের ওপর জাকাত ফরজ হবে।
৫. ঘরবাড়ি বা দোকানপাট তৈরি করে ভাড়া দিলে তাতেও জাকাত ফরজ নয়। তবে ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অর্থের ওপর জাকাত আসবে।
৬. ভাড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঘরবাড়ি বা অন্য কোনো সামগ্রী যেমন ডেকোরেটরের বড় বড় ডেগ, থালা-বাটি ইত্যাদি ক্রয় করলে তার ওপরও জাকাত ফরজ নয়। তবে ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অর্থের ওপর জাকাত আসবে।
জাকাত না দেওয়ার শাস্তি
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, যাকে আল্লাহ ধনসম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে এর জাকাত আদায় করেনি, কেয়ামতের দিন তার সম্পদকে (বিষের তীব্রতার কারণে) টেকো মাথাবিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি দান করে তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। সাপটি তার মুখের দুই পাশ কামড়ে ধরে বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার জমাকৃত মাল। তারপর রাসুলুল্লাহ (সা.) তেলাওয়াত করেন, ‘আল্লাহ যাদের সম্পদশালী করেছেন অথচ তারা সে সম্পদ নিয়ে কার্পণ্য করেছে, তাদের ধারণা করা উচিত নয় যে সেই সম্পদ তাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে, বরং তা তাদের জন্য কেয়ামত দিবসে, অচিরেই অকল্যাণকর হবে, যা কার্পণ্য করছে তা দিয়ে তাদের গলদেশ শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হবে’ (বুখারি : হাদিস ১৩২১)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘যে সম্পদের জাকাত দেওয়া হয়নি তাকে বিষধর সাপে রূপান্তর করে ওই সম্পদের মালিকের গলায় জড়িয়ে দেওয়া হবে এবং সাপটি তাকে ছোবল দিতে দিতে বলবে, আমি তোমার প্রিয় সম্পদ, গুপ্তধন।’ (বুখারি : ১৪০৩)
উত্তম জিনিসের জাকাত
ইসলামে জাকাত প্রদানের অন্যতম লক্ষ্য সমাজের ধনী-গরিবের বৈষম্য দূর করা। ধনীদের জাকাতের মাধ্যমে যেন একজন গরিবের অসহায়ত্ব দূর হয়। তিনি যেন জাকাতের অর্থের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারেন। তাই জাকাত প্রদানে সর্বদা উত্তম বিবেচনা কাম্য। অনেক সময় দেখা যায়, মার্কেটে ‘জাকাতের কাপড় পাওয়া যায়’ এমন সাইনবোর্ড কাপড়ের দোকানে বড় অক্ষরে লেখা থাকে। জাকাতের কাপড়ের বিজ্ঞাপনও দেখা যায়। জাকাতের জন্য কিছু গার্মেন্টস আলাদাভাবে নিম্নমানের কাপড় তৈরি করে। ধনীরা নিম্নমানের বস্ত্র অল্প দামে ক্রয় করে দিচ্ছে দরিদ্রদের। অনেক সময় এসব পরিধানযোগ্যও নয়। অসহায় ব্যক্তির জন্য যে বস্ত্র আমি পছন্দ করে দিলাম তা কি নিজের জন্য, নিজের ছেলে বা মেয়ে অথবা স্ত্রীর জন্য পছন্দ করতে পারব? অবশ্যই না, যা নিজের পছন্দ নয় তা অন্যকে দেওয়া কি ঠিক? অবশ্যই নয়।
জাকাত একটি ফরজ ইবাদত। উত্তম জিনিস দিয়ে জাকাত দেওয়া চাই। লোক দেখানোর জন্য সস্তা বস্ত্র গরিবদের হাতে তুলে দিয়ে বিশিষ্ট দানবীর সাজা ঠিক নয়।
ধনী-গরিবের বৈষম্য দূরীকরণ
আমাদের সমাজে অনেক বৈষম্য রয়েছে। কেউ টাকার পাহাড় গড়েছে, কেউ দুবেলা খেতেই পায় না! ঈদে কেউ মার্কেট করে কয়েক সেট জামা, কেউ পুরোনো কাপড়েই কাটিয়ে দেয় কয়েকটি ঈদ! তবে জাকাতের মাধ্যমে এই বৈষম্য কিছুটা হলেও দূর করা যায়। নিচে কয়েকটি পয়েন্টে বিষয়টি তুলে ধরা হলো।
১. সোনা, রুপা এবং সঞ্চিত অর্থের জাকাতের ক্ষেত্রে সমাজের সুবিধাভোগীদের আধিক্য গুরুত্ব পাবে। সেখানে সর্বনিম্ন নেসাবের পরিমাণ অর্থ-সম্পত্তি থাকলেই তাকে জাকাত আদায় করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্য সীমারেখার কথা চিন্তা করে রুপার দামকেই প্রাধান্য দিয়ে কার ওপর জাকাত ফরজ তা ধরলে জাকাত প্রদানকারীর সংখ্যা যেমন বাড়বে, তেমনি বেশি সংখ্যক গরিব উপকৃত হবে।
২. ফসলের জাকাত উপেক্ষা করার কারণে এর সুফল থেকে আমরা বঞ্চিত হই। আমাদের মতো কৃষি প্রধান দেশে কৃষিপণ্যের যথাযথ জাকাত আদায় করতে পারলে জাকাত সুবিধাভোগীদের সংখ্যাধিক্য বেড়ে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থব্যবস্থার প্রবর্তন করা সম্ভব।
৩. জাকাত আদায় ও বণ্টনের বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে দুটি কাজ করতে হবে ১. জাকাত আদায় করতে হবে সমষ্টিগতভাবে, যা সত্যিকার অর্থে দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক হবে। ২. জাকাত বণ্টনের সময় মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি টেকসই কিছু করা দরকার। যেমন হতে পারে কাউকে একটা ভ্যান বা রিকশা কিনে দেওয়া, ছোট চায়ের স্টল করে দেওয়া ইত্যাদি।
৪. ব্যক্তি পর্যায়ে জাকাত আদায় ও বণ্টনের চেয়ে বরং রাষ্ট্র কিংবা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সামষ্টিক উপায়ে হলে সত্যিকার সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। সে ক্ষেত্রে নগদ সাহায্যের পাশাপাশি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের কাজে জাকাতের অর্থ কার্যকর উপায়ে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
৫. রাষ্ট্র কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অনুপস্থিতিতে গ্রাম-গঞ্জের মানুষরা যদি একত্রে মিলে উদ্যোগ গ্রহণ করে সেটিও ফলপ্রসূ ও কার্যকর হতে পারে।
৬. জাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে অন্যান্যের পাশাপাশি কর্মক্ষম কিন্তু কর্মহীন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শিক্ষা-প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজের ব্যবস্থা করা কিংবা প্রয়োজনে মূলধন দিয়ে ব্যবসার সুযোগ করলে সে এবং তার অধীনস্থরাও উপকৃত হবে এবং অর্থনৈতিক দৈন্য থেকে সমাজব্যবস্থা মুক্তি পাবে।