পশু পালনে বদলাচ্ছে চরের অর্থনীতি

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

নদ-নদীবেষ্টিত উত্তরের জেলা গাইবান্ধার চরাঞ্চল একসময় ছিল ভাঙন, বন্যা আর অনিশ্চয়তার প্রতীক। ১৬৫টি চর ও দ্বীপচরের বিস্তীর্ণ বালুচর দীর্ঘদিন অবহেলিত

2026-03-07T01:11:18+00:00
2026-03-08T17:22:45+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
গরু-মহিষ চরের মানুষের ‘চলমান ব্যাংক’
পশু পালনে বদলাচ্ছে চরের অর্থনীতি
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ১:১১ এএম  আপডেট: ০৮.০৩.২০২৬ ৫:২২ পিএম
গরু-মহিষ চরের মানুষের চলমান ব্যাংক। ছবি : সময়ের আলো
নদ-নদীবেষ্টিত উত্তরের জেলা গাইবান্ধার চরাঞ্চল একসময় ছিল ভাঙন, বন্যা আর অনিশ্চয়তার প্রতীক। ১৬৫টি চর ও দ্বীপচরের বিস্তীর্ণ বালুচর দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলেও এখন সেখানেই গড়ে উঠছে গবাদিপশু পালনের নীরব বিপ্লব। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, গরু-মহিষ তাদের ‘চলমান ব্যাংক’, যা দারিদ্র্যের সময় সহায় হয়ে দাঁড়ায় এবং পরিবারের আয় স্থিতিশীল রাখে। দুধ ও মাংস উৎপাদনের মাধ্যমে চরাঞ্চলের অর্থনীতি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বিতার সুযোগ।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কুরবানির বাজারকে লক্ষ্য করে জেলায় প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার ২৭৭টি পশু প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে গরু ও মহিষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার, যা মোট পশুর প্রায় ৬০ শতাংশ। ছাগল ও ভেড়া ছিল অবশিষ্ট অংশ। এসব গবাদিপশুর প্রায় ৪৭ থেকে ৫০ শতাংশই পালন করা হয় চরাঞ্চলে। উন্মুক্ত চারণভূমি ও প্রাকৃতিক খাদ্যের কারণে চরাঞ্চলের পশু দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং রোগবালাই তুলনামূলক কম হয়, ফলে উৎপাদন ব্যয়ও কম।

দুধ উৎপাদনের দিক থেকে চরাঞ্চলের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য। প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাব বলছে, বর্তমানে চরাঞ্চলের অধিকাংশ দেশি গাভি দৈনিক গড়ে দেড় থেকে দুই লিটার দুধ দেয়। তবে উন্নত জাতের গাভি পালনের মাধ্যমে এই উৎপাদন ৫ থেকে ১০ লিটার পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। অনুমান করা হচ্ছে, চরাঞ্চল থেকে বছরে কয়েক কোটি লিটার দুধ উৎপাদন সম্ভব, যা জেলার দুধের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাইরের বাজারেও সরবরাহ করা যেতে পারে। 

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘চরাঞ্চল দুধ উৎপাদনের বড় সম্ভাবনাময় অঞ্চল। উন্নত জাতের সিমেন ব্যবহার ও নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা গেলে উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়বে। আমরা খামারিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যাতে তারা আধুনিক পদ্ধতিতে পশু পালন করতে পারেন।’
আরও পড়ুন

মাংস উৎপাদনের ক্ষেত্রেও চরাঞ্চলের সক্ষমতা কম নয়। একটি মাঝারি আকারের দেশি গরু থেকে গড়ে ১৬৫ থেকে ১৭৭ কেজি মাংস পাওয়া যায়। উন্নত জাতের ষাঁড় পালনের মাধ্যমে এই পরিমাণ দ্বিগুণ করা সম্ভব। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পরিকল্পিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চরাঞ্চল থেকে বছরে অন্তত ৮ হাজার ৫০০ মেট্রিকটন মাংস উৎপাদন সম্ভব। এটি স্থানীয় ও জাতীয় বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, ‘মাংস উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উন্নত জাতের পশু পালন ও সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা জরুরি। আমরা এই খাতে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ দিচ্ছি, যাতে খামারিরা লাভবান হন।’

সদর উপজেলার কুন্দেরপাড়া চরের খামারি শফিকুল আলম জানান, আগে শুধু ধান চাষ করে সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন। এখন তিনটি গরু ও একটি মহিষের দুধ বিক্রি করে প্রতিদিন ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় হচ্ছে। এতে পরিবারের আর্থিক স্থিতি এসেছে।

ফুলছড়ির ফজলুপুর চরের খামারি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তার খামারে ১৫টি গরু রয়েছে এবং মাঠে পর্যাপ্ত ঘাস থাকায় কেনা খাবারের প্রয়োজন হয় না। পশুর রোগবালাইও তুলনামূলক কম। তিনি বলেন, চরে গরু পালনে খরচ কম, আয় ভালো। দুধ বিক্রি করে সংসার চলছে। যদি বাজারব্যবস্থা আরও উন্নত হয়, তা হলে লাভ আরও বাড়বে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে বাড়িঘরে পানি উঠলে পশুর খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকট দেখা দেয়। অনেক সময় কম দামে পশু বিক্রি করতে বাধ্য হন খামারিরা। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও পশু চিকিৎসার সীমাবদ্ধতাও বড় সমস্যা। অসুস্থ পশুকে মূল ভূখণ্ডে নিতে সময় ও অর্থ ব্যয় হয়, ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানি ঘটে। স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকরাই প্রাথমিক চিকিৎসা দেন, কিন্তু বিশেষায়িত সেবা এখনও সীমিত। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, চিলিং সেন্টার ও দুধ সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং উৎপাদনে উৎসাহিত হবেন।

নারীদের অংশগ্রহণ চরাঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সকালে গোয়াল থেকে গরু বের করা, খাদ্য সংগ্রহ, গোয়াল পরিষ্কার, দুধ দোহন ও পশু পরিচর্যার অধিকাংশ কাজ নারীরাই করেন। অনেক পরিবারে নারীর এই শ্রম অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার পথ তৈরি করেছে। চরাঞ্চলের কৃষকরা বলেন, নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া গবাদিপশু পালনের কাজ সফল হতো না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চরাঞ্চলকে পরিকল্পিত চারণভূমি হিসেবে ঘোষণা করা, উন্নত ঘাস চাষ, স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা এবং বাজারসংযোগ উন্নত করা গেলে দুধ ও মাংস উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। এতে একদিকে প্রান্তিক মানুষের আয় বাড়বে, অন্যদিকে জেলার অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গাইবান্ধার চরাঞ্চল দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

নদীভাঙন ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও চরবাসী তাদের শ্রমে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। বিস্তীর্ণ বালুচরে চরছে গরু-মহিষের পাল- এই দৃশ্য কেবল গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়, এটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত। সঠিক পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও সহায়তা পেলে গাইবান্ধার চরাঞ্চল থেকে উৎপাদিত দুধ ও মাংস দেশের পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে এবং দারিদ্র্য পেরিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে এই জনপদ।

এএডি/


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: