মানুষ কখনোই ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। পাপকর্মে জড়িয়ে পড়া মানুষের স্বভাবজাত দুর্বলতা। কিন্তু পাপ করার পর হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়া বা আল্লাহ তায়ালার রহমত থেকে নিরাশ হওয়া আরও বড় ভুল। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে যে, পাপ থেকে ফিরে আসার দরজা সবসময় খোলা। আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তিনি তার বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ দেন। পাপমুক্ত জীবনযাপনের জন্য ইসলাম বেশ কিছু কার্যকর পথনির্দেশনা দিয়েছে, যা অনুসরণ করে একজন মুমিন পাপের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে আলোকিত জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কুরআন-হাদিসে বর্ণিত পাপমুক্ত জীবনের কয়েকটি পথরেখা নিম্নরূপ-
তওবা ও ইস্তিগফার : কারও দ্বারা কোনো পাপকাজ সংঘটিত হয়ে গেলে হতাশ হওয়া কিংবা ভেঙে পড়া যাবে না, বরং অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে তওবা ও ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা গুনাহগার বান্দাদের তার রহমত থেকে নিরাশ হতে নিষেধ করেছেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করেন। নিঃসন্দেহে তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু’ (সুরা জুমার, আয়াত : ৫৩)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এক বান্দা গুনাহ করে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমার গুনাহ ক্ষমা করে দাও। তারপর আল্লাহ তায়ালা বললেন, আমার বান্দা গুনাহ করেছে এবং সে জানে যে তার একজন প্রতিপালক আছেন, যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন ও গুনাহের কারণে পাকড়াও করেন। এ কথা বলার পর সে পুনরায় গুনাহ করল এবং বলল, হে আমার মনিব! আমার গুনাহ মাফ করে দাও। এরপর আল্লাহ তায়ালা বললেন, আমার এক বান্দা গুনাহ করেছে এবং সে জানে যে তার একজন প্রতিপালক আছেন, যিনি গুনাহ মাফ করেন ও গুনাহের কারণে পাকড়াও করেন। তারপর সে আবারও গুনাহ করে বলল, হে আমার রব! আমার গুনাহ ক্ষমা করে দাও। একথা শুনে আল্লাহ তায়ালা আবারও বলেন, আমার বান্দা গুনাহ করেছে এবং সে জানে যে তার একজন মালিক আছেন, যিনি বান্দার গুনাহ ক্ষমা করেন ও গুনাহের কারণে পাকড়াও করেন। তারপর আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে বান্দা! এখন যা ইচ্ছা তুমি আমল করো। আমি তোমার গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছি’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৭৩২)। তওবা হলো হৃদয়ের পরিশুদ্ধি। পানি যেমন ময়লা ধুয়ে সবকিছু পরিষ্কার করে দেয়, তওবাও পাপের পঙ্কিলতা ধুয়ে হৃদয়কে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে তোলে।
নিয়মিত নামাজ আদায় : নামাজ সব অশ্লীল কর্ম থেকে মানুষকে বিরত রাখে। নিয়মিত নামাজ মানুষের অন্তরে আল্লাহ তায়ালার ভয় সৃষ্টি করে এবং সব ধরনের পাপকাজ থেকে দূরে রাখে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)
কুরআন তেলাওয়াত : একের পর এক পাপাচারের ফলে মানুষের হৃদয়ে কালো দাগ ও জং সৃষ্টি হয়। পবিত্র কুরআনের তেলাওয়াত হৃদয়ের সে জং দূরীভূত করে হৃদয়কে আলোকিত করে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘লোহায় পানি লাগলে যেমন মরিচা ধরে, তেমনি মানুষের অন্তরেও মরিচা পড়ে। সাহাবায়ে কেরাম জিগ্যেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.) তা হলে হৃদয়ের সেই মরিচা দূর করার উপায় কী? নবীজি (সা.) বললেন, মৃত্যুর কথা অধিক স্মরণ করা এবং কুরআন তেলাওয়াত করা।’ (শুআবুল ইমান, হাদিস : ২০৪৪)
সৎসঙ্গ ও পরিবেশ : সৎসঙ্গ ও ভালো পরিবেশের প্রভাবেও অনেক সময় মানুষ পাপাচার থেকে বেঁচে যায়। খারাপ বন্ধুর প্রভাবে জাহান্নামি হওয়া এক ব্যক্তির আক্ষেপের কথা আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘জালেম সেদিন আপন হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, হায় আফসোস! আমি যদি রাসুলের সঙ্গে সৎপথ অবলম্বন করতাম। হয় আমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল। আর শয়তান তো অসহায় অবস্থায় ধোঁকা দেয়’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ২৭-২৯)। নবীজি (সা.) বলেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্মের অনুসারী হয়, তাই তোমরা কাকে বন্ধু বানাচ্ছ, তা ভেবে নাও।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৩৩)
খারাপ অভ্যাস পরিত্যাগ : যেকোনো কাজ হঠাৎ করে শুরু কিংবা বন্ধ করা যায় না। তাই ধীরে ধীরে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প সৎকাজের মাধ্যমে পাপের পথ থেকে সরে আসা মানুষের জন্য সহজ হয়।
আল্লাহভীতি (তাকওয়া) : তাকওয়া বা আল্লাহভীতি পাপকাজ থেকে দূরে থাকার সর্বোত্তম কার্যকর উপায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যেখানেই থাকো, আল্লাহকে ভয় করো; খারাপ কাজের পর ভালো কাজ করো, তা হলে খারাপ কাজের কাফফারা হয়ে যাবে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৯৮৭)
যদি আন্তরিকতা ও দৃঢ় সংকল্প থাকে, তবে পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন কোনো বিষয় না। তওবা, নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, সৎসঙ্গ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আল্লাহভীতি-এই ছয়টি মাধ্যম পাপমুক্ত জীবনযাপনের চাবিকাঠি। শয়তান আমাদের হতাশ করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা চান আমরা যেন ফিরে আসি। তাই যত বড় পাপই হোক না কেন, তওবার মাধ্যমে তা মোচনের চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে পাপমুক্ত জীবনযাপন করার তওফিক দান করুন।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
সময়ের আলো/এনএ