শঙ্কায় ৫০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী

এমএকে জিলানী

প্রবাস

চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে নানা ইস্যুতে নতুন করে সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক

2026-03-08T01:01:26+00:00
2026-03-08T01:01:26+00:00
 
  শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
প্রবাস
শঙ্কায় ৫০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী
এমএকে জিলানী
প্রকাশ: রোববার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ১:০১ এএম 
ফাইল ছবি
চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে নানা ইস্যুতে নতুন করে সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বাংলাদেশি শ্রমবাজারও বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি পর্যায়ে এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে সম্ভাব্য সাময়িক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। তবে যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিলে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। কারণ এ অঞ্চলের শ্রমবাজার থেকেই বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের সিংহভাগ আসে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাব্য দুই ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে।
প্রথমত বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যারা ইতিমধ্যে সেখানে কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন বা ‘পাইপলাইনে’ রয়েছেন, তাদের ভিসার মেয়াদ বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। পৃথক টেলিফোন আলাপে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা নিজ নিজ দেশে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন। 

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় অনেক প্রবাসী কর্মী ভিসাসংক্রান্ত জটিলতায় পড়েছেন। এ সমস্যা সমাধানে সরকার একটি বিশেষ ‘সেল’ গঠন করেছে। পাশাপাশি কাতার সরকার ইতিমধ্যে যেসব ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বা শেষ হওয়ার পথে, সেগুলোর মেয়াদ এক মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

দ্বিতীয়ত সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার রক্ষা এবং প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক নীতিনির্ধারক একযোগে কাজ করছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী।

কূটনৈতিক  সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি শ্রমশক্তি কর্মরত থাকলেও বাস্তবে গত কয়েক বছরে এসব শ্রমবাজারের অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বাহরাইন, ইরান, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এ ১০টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্ক রয়েছে। এসব দেশে বর্তমানে ৫০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত।

তবে এ ১০টি দেশের মধ্যে তিনটিতে জনশক্তি রফতানি বন্ধ রয়েছে। তিনটি দেশ শুধু দক্ষ কর্মী নেয়। জর্ডান মূলত দক্ষ নারী কর্মী নিয়োগ করে। ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অন্যদিকে ইরাকে বড় পরিসরে কর্মী পাঠানোর সম্ভাবনা থাকলেও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বর্তমান বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। অধিকাংশ দেশ এখন আর অদক্ষ শ্রমিক নিতে আগ্রহী নয়। এখানেই বড় সমস্যা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশে জনশক্তি প্রচুর থাকলেও দক্ষ কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রফতানি কমে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা না গেলে ভবিষ্যতে বিদেশি শ্রমবাজারে বড় ধরনের ধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নেই বলেও মনে করছেন তারা।
বাহরাইনে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি বন্ধ রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগ ওঠার পর এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

ইরানে জনশক্তি রফতানি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু থাকলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও স্থানীয় মুদ্রার মান কম হওয়ায় সেখানে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। এ ছাড়া অনেক বাংলাদেশি ইরানকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে তুরস্ক, আজারবাইজান হয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে।

ইরাকে শ্রমবাজার খোলা থাকলেও দেশটি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। সেখানে অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশি অবৈধভাবে কাজ করছেন।

জর্ডানে মূলত তৈরি পোশাক শিল্পে কাজের জন্য দক্ষ নারী কর্মীর চাহিদা রয়েছে। কুয়েতও অদক্ষ শ্রমিক নেয় না। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশ সেখানেও পর্যাপ্ত কর্মী পাঠাতে পারছে না।

লেবানন এখনও যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অস্থিতিশীল। সেখানে বাংলাদেশিদের জন্য আনুষ্ঠানিক ভিসা কার্যত বন্ধ। ওমানেও ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ রয়েছে, যদিও এ বাজার পুনরায় চালুর জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ চলছে।

কাতারেও শ্রমবাজার চালু থাকলেও দেশটি মূলত দক্ষ কর্মী নিতে আগ্রহী। পর্যাপ্ত দক্ষ জনশক্তি না থাকায় বাংলাদেশ চাহিদা অনুযায়ী কর্মী পাঠাতে পারছে না।

বাংলাদেশি শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় গন্তব্য সৌদি আরব। সেখানে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। তবে সৌদি আরবও এখন অদক্ষ শ্রমিক গ্রহণে নিরুৎসাহিত করছে। সেখানে কাজ করতে গেলে নির্দিষ্ট পেশাগত দক্ষতার প্রমাণ এবং ‘তাকামুল’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার শর্ত রয়েছে।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ অনেকটাই বন্ধ রয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, অনেক বাংলাদেশি এই দেশটিকে ইউরোপে অবৈধভাবে যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে। এ কারণে ইউরোপীয় দেশগুলোর অভিযোগের পর আমিরাত বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সীমিত করে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, সৌদি আরব ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের জন্য নিয়মিত শ্রমবাজার খুব বেশি খোলা নেই। অনেকেই অনিয়মিত পথে বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ।
তার মতে, ইরান যুদ্ধ সরাসরি শ্রমবাজারে বড় প্রভাব নাও ফেলতে পারে। তবে বর্তমানে কর্মরত শ্রমিক এবং যারা সেখানে যাওয়ার প্রস্তুতিতে আছেন, তারা বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়তে পারেন।

তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেলে তা প্রবাসী শ্রমিকদের ওপরও প্রভাব ফেলবে। এতে দেশে পাঠানো রেমিট্যান্সেও সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে।
আসিফ মুনীর বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখন থেকেই সরকারকে বিকল্প বাজার খোঁজা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। তার মতে, বর্তমান বৈশ্বিক শ্রমবাজারে অদক্ষ কর্মীর সুযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি দ্রুত দক্ষ ও শিক্ষিত কর্মী তৈরি করতে পারে, তাহলে সম্ভাব্য সংকট অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।



  বিষয়:   শ্রমিক  প্রবাস  যুদ্ধ 


Loading...
Loading...
প্রবাস- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: