ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি বাহরাইনসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশেও আঘাত হেনেছে তেহরান। একই সময়ে ইরানের ভেতরে ও লেবাননে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পাল্টা হামলা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
বিবিসি, আলজাজিরা, ব্লুমবার্গসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী যুদ্ধের দশম দিনে এসে সংঘাত শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, তেলের বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে তেলের স্থাপনায় ইসরাইলি হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। এদিকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে লেবাননের হামলায় অবৈধ সাদা ফসফরাস ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। যুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ পৌঁছেছে চরমে।
রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে নতুন সর্বোচ্চ নেতা : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। আলজাজিরা জানিয়েছে, দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ পরিষদ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
এদিকে বিবিসির লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আলি খামেনির মৃত্যুর পর দ্রুত নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই প্রক্রিয়ায় তার ছেলে মোজতবা খামেনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। ধর্মীয় পরিষদের বৈঠকে তাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয় এবং এরপর রাষ্ট্রীয়ভাবে তা ঘোষণা করা হয়। সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার পরপরই ইরান যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করে। আলজাজিরা জানায়, নতুন নেতৃত্বের অধীনে ইরান ইসরাইল ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা জোরদার করেছে।
ইসরাইলে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত একজন নিহত ও দুজন গুরুতর আহত হয়েছে। জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, ইসরাইলের জরুরি পরিষেবা ম্যাগেন ডেভিড অ্যাডম এই হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংবাদমাধ্যমটির খবর অনুযায়ী একটি ক্ষেপণাস্ত্র মধ্য ইসরাইলের একটি নির্মাণাধীন স্থাপনায় আঘাত হানে। ঘটনাস্থলেই প্রায় চল্লিশ বছর বয়সি এক ব্যক্তি মারা যান। আহত দুজনকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ম্যাগেন ডেভিড অ্যাডমের চিকিৎসাকর্মী লিজ গোরাল বলেন, সাইরেন বাজানোর পরপরই বিভিন্ন স্থান থেকে হামলার খবর আসে। উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন আহতদের শরীরজুড়ে শার্পনেলের গুরুতর আঘাত রয়েছে। টাইমস অব ইসরাইল জানিয়েছে, মধ্যাঞ্চলে আঘাত হানা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি ক্লাস্টার ধরনের যুদ্ধাস্ত্র ছিল এবং অন্তত ছয়টি এলাকায় এর আঘাত পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে ইয়েহুদ, হোলন ও বাত ইয়াম রয়েছে।
বাহরাইনসহ উপসাগরীয় দেশে ইরানের হামলা : ইসরাইলের পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলেও ইরান তাদের হামলা বিস্তৃত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডব্লিউইউএনসি জানায়, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব হামলার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন দেশ তাদের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরান ইতিমধ্যে উপসাগরীয় জলসীমায় চলাচলকারী কয়েকটি ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা চালিয়েছে। এর ফলে জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হয়েছে।
ইরান ও লেবাননে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের পাল্টা হামলা : ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আলজাজিরার লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইল তেহরান ও আশপাশের এলাকায় তিন দফায় হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় তেলের ডিপো, সামরিক ঘাঁটি এবং অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়। হামলার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যায়।
ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, লেবাননেও ইসরাইলের বিমান হামলা হয়েছে। সেখানে ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
হুরমুজ প্রণালি ও তেলের বাজারে অস্থিরতা : সংঘাতের কারণে হুরমুজ প্রণালি ঘিরে উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে। ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন হয়। যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি একশ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হয় তা হলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।
তেলের স্থাপনায় হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল মতবিরোধ : ইরানের তেল স্থাপনায় ইসরাইলের হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। সংবাদমাধ্যম এক্সিওস জানিয়েছে, তেল সংরক্ষণাগারে হামলার ঘটনায় ওয়াশিংটন বিস্মিত হয়েছে। ইসরাইল আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে হামলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। তবে হামলার ব্যাপ্তি যুক্তরাষ্ট্রের ধারণার চেয়েও বেশি ছিল। একজন মার্কিন কর্মকর্তা এক্সিওসকে বলেন, হামলার ব্যাপ্তি দেখে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী হতবাক হয়ে গেছে এবং তারা মনে করছে এটি ভালো সিদ্ধান্ত ছিল না।
দেশ ভেঙে তেল দখলের চেষ্টা : ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এস্মাইল বাঘাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার লক্ষ্য কেবল সামরিক নয়। বিবিসির খবর অনুযায়ী, তিনি অভিযোগ করেন যে এসব হামলার উদ্দেশ্য ইরানকে বিভক্ত করা এবং দেশের তেল সম্পদের অবৈধ দখল নেওয়া। তার ভাষায়, এসব হামলার মাধ্যমে ‘আমাদের দেশকে ভাগ করে আমাদের তেল সম্পদ দখল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
লেবাননে হামলায় বিষাক্ত সাদা ফসফরাস ব্যবহার : যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে, ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননের আবাসিক এলাকায় হামলায় সাদা ফসফরাস ব্যবহার করেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন। আজ সোমবার সংস্থাটি প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে এমনটি বলা হয়েছে। এইচআরডব্লিউ বলেছে, তারা সাতটি ছবির সত্যতা যাচাই করেছে।
এতে দেখা গেছে, ৩ মার্চ দক্ষিণ লেবাননের ইয়োহমোরে একটি আবাসিক এলাকায় সাদা ফসফরাস ছোড়া হয়েছে। এতে অন্তত দুটি বাড়িতে আগুন ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের লেবাননবিষয়ক গবেষক রামজি কাইস বলেন, ‘ইসরাইলি সেনাবাহিনী আবাসিক এলাকায় সাদা ফসফরাস ব্যবহার করেছে, যা অবৈধ এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে সাধারণ মানুষ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।’
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে : যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগও বাড়ছে। বিবিসি জানিয়েছে, বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয় তবে এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়; বরং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায়। নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণার পর ইরানের আক্রমণাত্মক অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের পাল্টা হামলা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
সময়ের আলো/এআর