মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হয়ে যাবে। তবে গত ১০ দিনের সংঘাতে ইরানে যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, সেটিকে তিনি ‘স্বল্পমেয়াদি সফর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ফ্লোরিডার ডোরাল শহরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেন। ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া অব্যাহত রাখে, তাহলে আরও বড় ধরনের হামলা চালানো হবে।
তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রায় ৫ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার প্রথম দিনেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন সময়ে সামনে এসেছে যখন ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতার নিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে এবং কট্টরপন্থীরা তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ শুরু করেছে। এর মধ্যেই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, বেসামরিক এলাকা, তেল শোধনাগার এবং পানি শোধন প্রকল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে মার্কিন–ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
রোববার সাবেক সর্বোচ্চ নেতার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়ার পর ইরানের কট্টরপন্থীরা তার প্রতি সমর্থন জানাতে শুরু করে। ঠিক সেই সময়েই ট্রাম্পের এই মন্তব্য সামনে আসে।
যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকলে আরও ভয়াবহ হামলা চালানো হবে। এই উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দামও বেড়ে গেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম একসময় ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
ট্রাম্প বলেন, আমি কোনো সন্ত্রাসী সরকারকে বিশ্বকে জিম্মি করতে বা বৈশ্বিক তেল সরবরাহ বন্ধের চেষ্টা করতে দেব না। ইরান যদি এমন কিছু করার চেষ্টা করে, তবে তাদের ওপর আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী আঘাত হানা হবে।
তিনি আরও জানান, হরমুজ প্রণালীতে যেকোনো ধরনের হুমকি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং পারস্য উপসাগরে চলাচলকারী তেলের ট্যাংকারগুলোর জন্য ‘রাজনৈতিক ঝুঁকি বিমা’ সুবিধা দিচ্ছে। প্রয়োজনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব জাহাজের পাশে মার্কিন বাহিনী অবস্থান নেবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তার দাবি, ইরানে ড্রোন তৈরির সব কারখানার অবস্থান এখন তাদের জানা এবং সেগুলোতে ধারাবাহিকভাবে আঘাত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এসব হামলার ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখন প্রায় ১০ শতাংশ বা তারও নিচে নেমে এসেছে।
এর আগে, ফ্লোরিডার ডোরালে নিজের গলফ ক্লাবে রিপাবলিকানদের এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ইরানে এই সামরিক অভিযান একটি ‘স্বল্পমেয়াদি সফর’। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, শত্রু পুরোপুরি ও চূড়ান্তভাবে পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান চলবে।
সমাবেশে উপস্থিতদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা একটি ছোট সফরে গিয়েছিলাম, কারণ আমরা মনে করেছি কিছু মানুষকে সরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তিনি আরও বলেন, আমরা ইতোমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে জয়ী হয়েছি, তবে আমাদের জয় এখনো যথেষ্ট নয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের পর ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন। তিনি জানান, পুতিন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিষয়ে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
ট্রাম্প বলেন, আমি তাকে বলেছি, আপনি ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে পারলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় সহায়তা। তবে আমাদের মধ্যে বেশ ভালো আলোচনা হয়েছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের বিপরীত অবস্থান নিয়ে পুতিন সোমবার মোজতবা খামেনিকে তার বাবার উত্তরসূরি হিসেবে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং তেহরানের প্রতি মস্কোর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
নতুন সর্বোচ্চ নেতার বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, এ ধরনের নির্বাচন তাকে ‘হতাশ’ করেছে। তার মতে, এর ফলে ইরানের জন্য একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
নতুন নেতাকে লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এ বিষয়ে মন্তব্য করা তার জন্য ‘অনুপযুক্ত’ হবে।
তবে ইসরায়েল ইতোমধ্যে জানিয়েছে, আয়াতুল্লাহ খামেনির স্থলাভিষিক্ত যেকোনো নতুন ইরানি নেতাকেও তারা গুপ্তহত্যার লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি যৌথভাবে ইরানের সক্ষমতা ধ্বংসের অভিযান না চালাত, তাহলে এতদিনে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেলত।
তিনি বলেন, তারা অনেক আগেই এটি ব্যবহার করত এবং অন্ততপক্ষে ইসরায়েল এতদিনে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেত।
/ইউএমএইচ