ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পথচারীদের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় একাধিক ফুটওভার ব্রিজ। দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর পর এলাকাবাসীর মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও মহাসড়ক অবরোধের দাবির মুখে এসব ব্রিজ নির্মাণ করা হলেও বাস্তবে সেগুলো এখন প্রায় ব্যবহারহীন।
সড়ক বিভাজকের লোহার ব্যারিকেড ভেঙে অধিকাংশ পথচারীই দ্রুতগতির যানবাহনের সামনে দিয়ে সড়ক পার হচ্ছেন। ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির শঙ্কা।
এমন পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানানো হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশও নজরদারি বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে কুমিল্লা অঞ্চলের সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, যেসব ফুটওভার ব্রিজে ভাঙাচোরা বা জং ধরার সমস্যা রয়েছে সেগুলো দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি সড়ক বিভাজকের ভেঙে ফেলা লোহার ব্যারিকেড মেরামত করা হবে বলেও আশ্বাস দেন সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা।
সরেজমিন চান্দিনা বাসস্ট্যান্ড, বড় গোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকা, মাধাইয়া বাসস্ট্যান্ড, কুটুম্বপুর বাসস্ট্যান্ড এবং তীরচর-গোমতা ইসহাকিয়া উচ্চ বিদ্যালয় এলাকার ফুটওভার ব্রিজগুলো ঘুরে দেখা যায়, ব্রিজগুলো কার্যত অব্যবহৃত বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও পথচারীরা ব্রিজ এড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন, আবার কোথাও সিঁড়িতে জং ধরেছে। অনেক জায়গায় ভাঙাচোরা অবস্থা তৈরি হওয়ায় সেগুলো এখন পথচারীদের জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
মাধাইয়া- জং ধরা সিঁড়ি, কাঠের তক্তায় চলাচল : মাধাইয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার ফুটওভার ব্রিজের অবস্থা সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সিঁড়ির একাধিক ধাপ জং ধরে ভেঙে গর্ত তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা ভাঙা অংশে কাঠের তক্তা বসিয়ে অস্থায়ীভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। তবে সেটিও নড়বড়ে হওয়ায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
পথচারী আবদুল মান্নান বলেন, সিঁড়ির ধাপ ভেঙে ফাঁকা হয়ে গেছে। কাঠের তক্তা বসানো হলেও পা পিছলে পড়ার ভয় থাকে। স্কুলশিক্ষক জয়নাল আবেদীন বলেন, দীর্ঘদিন কোনো সংস্কার না হওয়ায় ব্রিজটি এখন নিজেই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। রাতে চলাচল করা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
চান্দিনা বাসস্ট্যান্ড-ব্যারিকেড ভেঙে নিয়ন্ত্রণহীন পারাপার : চান্দিনা বাসস্ট্যান্ড এলাকার ফুটওভার ব্রিজের নিচে সড়ক বিভাজকের লোহার ব্যারিকেড ভেঙে ফেলা হয়েছে। ফলে পথচারীরা সহজেই বিভাজক ডিঙিয়ে চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। এতে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
কথা হয় বাসচালক মো. জসিম উদ্দিনের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, হঠাৎ সামনে মানুষ চলে আসে। বড় দুর্ঘটনা এড়াতে গিয়ে আমরাই বিপদে পড়ি।
কুটুম্বপুর ও গোমতা- ফাঁকা ব্রিজ, নিচে মৃত্যুদৌড় : কুটুম্বপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৃথক পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর এলাকাবাসী মহাসড়ক অবরোধ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরে সেখানে একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু নির্মাণের পর থেকেই সেটি প্রায় ব্যবহারহীন। ব্যস্ত সময়েও ব্রিজটি থাকে জনশূন্য, অথচ নিচে দ্রুতগতির বাস-ট্রাকের ফাঁক গলে দৌড়ে রাস্তা পার হন পথচারীরা।
সরেজমিন আলাপকালে স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ফুটওভার ব্রিজ আছে, কিন্তু মানুষ ব্যবহার করে না। তাড়াহুড়া আর অসচেতনতার কারণে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আবদুল কাদের বলেন, শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর পর এলাকাবাসী রাস্তায় নেমেছিল। এখন ব্রিজ আছে কিন্তু অনেকে সময় বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পার হয়।
একই চিত্র দেখা যায়, তীরচর-গোমতা ইসহাকিয়া উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায়। ২০২২ সালের ২৯ অক্টোবর নবম শ্রেণির ছাত্রী সাদিয়া আক্তার ট্রাকচাপায় নিহত হলে ক্ষুব্ধ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে সেখানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হলেও বর্তমানে সেটিও প্রায় ব্যবহারহীন। ব্রিজের নিচে সড়ক বিভাজকের লোহার ব্যারিকেড ভেঙে পথচারীরা সেখান দিয়েই পারাপার করছেন।