ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তা কাটেনি। সে দেশের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানে বিশেষ বাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। লক্ষ্য হচ্ছে, দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ নিরাপদ করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইউরেনিয়াম থেকে অন্তত ১০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করা সম্ভব।
ইরানকে পারমাণবিক বোমা অর্জন থেকে বিরত রাখা ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধ লক্ষ্যগুলোর একটি। ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদকে সবচেয়ে বড় পারমাণবিক হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ তুলনামূলক সহজেই এটিকে অস্ত্রমানের ইউরেনিয়ামে রূপান্তর করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও কংগ্রেসকে বলেছেন, ‘কেউ না কেউ গিয়ে এগুলো সংগ্রহ করতে হবে।’
রুবিও বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাননি। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি সূত্রে জানা গেছে, এই ধরনের অভিযান কীভাবে পরিচালনা করা যায় তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। সেই অভিযানে উভয় দেশের সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনী অংশ নিতে পারে। তবে পারমাণবিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন অভিযানের জটিলতা ও ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফয়েল গ্রসি জানান, জাতিসংঘের এই তদারকি সংস্থা মনে করে ইরানের প্রায় ২০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, যা গত জুনে বিমান হামলার পরও অক্ষত ছিল। ইসফাহান শহরের কাছে একটি পারমাণবিক স্থাপনায় গভীর সুড়ঙ্গের ভেতরে তা রাখা আছে। তিনি আরও বলেন, আরেকটি পারমাণবিক কেন্দ্র নাতাঞ্জে আরও কিছু ইউরেনিয়াম রয়েছে। সেখানে ইরান নতুন একটি শক্তভাবে সুরক্ষিত ও গভীরভাবে মাটির নিচে নির্মিত স্থাপনা তৈরি করেছে, যার নাম কুহ-এ কলাং গাজ লা। পশ্চিমা বিশ্লেষকরা এটিকে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে চেনেন।
এই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড আকারে। কক্ষ তাপমাত্রায় এটি কঠিন থাকে, কিন্তু উত্তপ্ত করলে গ্যাসে পরিণত হয়, যা পরবর্তী ধাপে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব করে। ধারণা করা হয় এটি ধাতব ক্যানিস্টারে সংরক্ষিত আছে, প্রতিটি প্রায় স্কুবা ডাইভিং ট্যাঙ্কের আকারের যা গভীর শ্যাফটের ভেতরে রাখা হয়েছে।
শত্রু পরিবেশ থেকে পারমাণবিক উপাদান উদ্ধার করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিশেষ বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘মোবাইল ইউরেনিয়াম ফ্যাসিলিটি’ নামে বিশেষ সরঞ্জামও তৈরি করেছে, যা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিরাপদভাবে ধারণ ও সরিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে এই সরঞ্জাম, বিশেষজ্ঞ দল এবং তাদের সুরক্ষার জন্য সেনা মোতায়েন করতে হলে অন্তত দুটি স্থানে বড় ধরনের স্থল অভিযান পরিচালনা করতে হবে; যেগুলো ইরানের গভীর অভ্যন্তরে অবস্থিত।
মন্টেরের মিডলবেরি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পারমাণবিক বিস্তার বিশেষজ্ঞ জেফরি লুইস বলেন, ‘এটা খুব কঠিন হবে। জায়গাটি খুব ভালোভাবে সুরক্ষিত এবং উপকরণগুলো বড় ও ভারী। সুতরাং আপনি সহজে ঢুকে এগুলো তুলে নিয়ে যেতে পারবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কী হবে, একটি সি-১৭ সামরিক পরিবহন বিমান মরুভূমিতে অবতরণ করবে, তারপর নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হবে এবং ক্রেন নেমে এসে এগুলো তুলে নেবে? নাকি ঢুকে সব উড়িয়ে দেওয়া হবে? এসব বিকল্প আমার কাছে বেশ অবাস্তব মনে হয়।’
গত শনিবার এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও স্বীকার করেন যে এমন অভিযানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং এটি শিগগিরই ঘটতে যাচ্ছে না বলে ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ইরানি প্রতিরক্ষা বাহিনী এতটাই ধ্বংস হয়ে যাবে যে তারা স্থলযুদ্ধে লড়তে পারবে না এমন পরিস্থিতি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সেনা পাঠাবে না। পারমাণবিক উপাদান নিরাপদ করতে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনা তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি, তবে বলেছেন সেটি সংঘাতের পরবর্তী পর্যায়ে হতে পারে। ট্রাম্প বলেন, ‘কোনো একসময় হয়তো আমরা করব। এখনও আমরা সেটা লক্ষ্য করিনি। এখনই করব না, পরে হয়তো করব।’
প্রশাসনের সমালোচকরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিরাপদ করার পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে তৈরি করা হয়নি। ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস সদস্য বিল ফস্টার গত সপ্তাহে যুদ্ধ নিয়ে একটি গোপন ব্রিফিং থেকে বেরিয়ে বলেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা মোকাবিলার কোনো পরিকল্পনার কথা শুনেননি। ফস্টার বলেন, ‘ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদই প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কিন্তু স্পষ্টতই তা হচ্ছে না।’
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের পারমাণবিক নীতি বিশ্লেষক ম্যাথিউ বুন বলেন, ‘পারমাণবিক ঝুঁকির কথা বলে এমন একটি সামরিক অভিযান শুরু করা, অথচ সেই ঝুঁকির সবচেয়ে জরুরি অংশ মোকাবিলার পরিকল্পনা না থাকা; এটা সত্যিই বিস্ময়কর।’ বুন বলেন, ‘ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো এই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ। তাই এটাকে মোকাবিলা করা জরুরি।’
তিনি যোগ করেন, যুদ্ধ পরবর্তী কোনো চুক্তির মাধ্যমে এই ইউরেনিয়ামকে কম মাত্রায় নামিয়ে আনা বা দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে ভালো সমাধান। এমন সমাধান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছিল, যা ওমানের
মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরু করার সময় সেই আলোচনা চলমান ছিল।
ইরানের সহযোগিতা ছাড়া এই ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া, সেটিকে মিশিয়ে কম মাত্রায় নামানো কিংবা যেখানে আছে সেখানেই ধ্বংস করা, সবকিছুই বিশাল সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে বলে বুন বলেন। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ওই স্থানগুলোর ওপর নিবিড় নজরদারি করছে, যাতে ক্যানিস্টারগুলো সরিয়ে নেওয়া না হয় এবং তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী হবে তা ঠিক করার চেষ্টা করছে।’
ইসরাইলের রাইখমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান বিশেষজ্ঞ মেইর জাভেদানফার বলেন, ‘যতক্ষণ এটি ইরানের ভেতরে আছে, পরিকল্পনা হলো যদি কেউ এর কাছে যেতে চায়, তাকে হত্যা করা হবে। এখনকার কৌশল এটিই।’ তবে তিনি বলেন, এই নজরদারি কৌশল পুরোপুরি নির্ভুল নয়। কেউ হয়তো সুড়ঙ্গ বানিয়ে সেখানে পৌঁছে যেতে পারে। আপনি শতভাগ নিশ্চিত থাকতে পারবেন না।
এমনকি যদি ইরান গোপনে এই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়েও ফেলতে পারে, তবু দেশটির অবশিষ্ট নেতৃত্ব যদি দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির পথে এগোয়, তা হলে তাদেরও বড় ঝুঁকি নিতে হবে। ইউরেনিয়াম আরও সমৃদ্ধ করা, সেটিকে ধাতুতে রূপান্তর করা, নির্দিষ্ট আকারে তৈরি করা, বিস্ফোরণ ঘটানোর যন্ত্র বানানো এবং সেটিকে ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো বাহনে বসানো, তাত্ত্বিকভাবে কয়েক মাসের মধ্যে করা সম্ভব। কিন্তু তা গোপনে করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
বাইডেন প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান বিষয়ক বিশেষ দূত ছিলেন রবার্ট ম্যালি। তিনি বলেন, বহু বছর ধরেই ইরানের নেতৃত্ব এই দ্বিধার মুখে ছিল। ম্যালি বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম, তখন ইরান ও অন্যান্য মাধ্যমে এমন আলোচনা বাড়তে দেখেছি, যা ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে তারা দীর্ঘ সময় পর প্রথমবারের মতো সত্যিই ভাবছে, তাদের কি পারমাণবিক বোমা অর্জন করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘সমস্যা হলো, সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে শুরু করে বোমা তৈরির লক্ষ্য অর্জন পর্যন্ত সময়টাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ এই সময়েই ধরা পড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।’ তিনি আরও বলেন, আর ধরা পড়লে প্রায় নিশ্চিতভাবেই আপনাকে বোমা হামলার মুখে পড়তে হবে। সেই সমস্যা এখনও দূর হয়নি।
ম্যালি বলেন, ‘আমি বলছি না এটা অসম্ভব। কিন্তু এটা হবে অত্যন্ত বিপজ্জনক এক জুয়া।’
সময়ের আলো/আআ