স্থানীয় সরকার হলো একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে নিকটবর্তী স্তর। যেখানে কোনো মানুষ সহজেই তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরতে পারে এবং যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি জনপ্রতিনিধিদের কাছে এসে নাগরিক সুবিধা ভোগ করতে পারে। এ জন্য সমাজে বসবাসরত নাগরিকরা যেকোনো দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে রাস্তাঘাট সংস্কারসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে স্থানীয় সরকারের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্যসহ সামাজিক ও বিচারিক কাজের জন্য সাধারণ মানুষ স্থানীয় সরকারের কাছে ছুটে আসে। একটি দেশের ক্ষমতাসীন সরকারের উন্নয়ন, সেবা এবং সুযোগ-সুবিধা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে স্থানীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকে।
দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য যেকোনো রাষ্ট্রের স্থানীয় সরকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ফলে স্থানীয় সরকারের যারা প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে থাকেন তাদের ওপর রাষ্ট্রের অনেক দায়-দায়িত্ব রয়েছে। সেগুলো ঠিকমতো পালন করতে না পারলে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। নাগরিকরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। সমাজ এবং দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। আর তাই সৎ, যোগ্য এবং জনপ্রিয় ব্যক্তি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি হয়ে এলে সমাজ পরিবর্তনের কাজ সহজে করতে পারেন।
কিন্তু আমরা দেখেছি, দেড় দশকের বেশি সময় ধরে আ.লীগ সরকারের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নানাবিধ বিতর্ক, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আস্থার সংকট দেখা দেয়। মানুষ তাদের পছন্দমতো প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারেনি। অনেক জায়গায় দেখা গেছে, ক্ষমতা আর টাকার বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তিরা দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে এসেছে। মনোনয়ন বাণিজ্যের মতো ঘটনা অহরহ ঘটতে দেখা গেছে। এতে যোগ্য এবং জনগণের পছন্দের ব্যক্তিকে তারা ভোট দিতে পারিনি। দেশজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় মারামারি ও সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। এতে একদিকে যেমন দলের মধ্যে অন্তর্কোন্দল বেড়েছে অন্যদিকে রাজনৈতিক দল যোগ্য নেতৃত্ব হারিয়েছে।
মোটা দাগে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্য একটি শক্তিশালী ও গতিশীল স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলতে নির্দলীয় এবং দলীয় প্রতীকমুক্ত রেখে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। ইতিমধ্যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সারা দেশের সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব জায়গায় মেয়র না থাকায় জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ কায়েম সনদসহ প্রতিদিনের নাগরিক সেবা প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছিল।
এতে সাধারণ মানুষকে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছিল। প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার ফলে ঝুলে থাকা কাজগুলো সমাধান করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে সাময়িকভাবে এ জাতীয় সমস্যার সমাধান করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পেতে অবশ্যই দ্রুত সময়ের মধ্যে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। আমরা দেখেছি, এ সরকারের অধীনে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, প্রথম সংসদ অধিবেশনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এখন কথা হলো, সংসদে যদি পুনরায় দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের কথা উঠে আসে তা হলে নিশ্চয় তা সুসংহত ও কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হবে। আর যখন দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে তখন তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়ে আরও বেশি দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি জন্ম নিয়ে সমাজে মারামারি, হানাহানি বাড়িয়ে দেবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনকল্যাণের চেয়ে দলীয় স্বার্থের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়বে। এতে যাদের সুবিধা দেওয়ার জন্য স্থানীয় সরকার গঠিত হয়েছিল সেসব সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর এভাবে চলতে থাকলে একসময় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পুরোপুরি পেশিশক্তি ও অর্থনির্ভর হয়ে পড়বে। যে আশঙ্কা থেকে বের হয়ে আসতে অবশ্যই আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক পরিহার করতে হবে।
সাধারণত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে সুপরিচিত এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিসম্পন্ন নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। সাধারণ ভোটারদের আস্থা অর্জন এবং দলীয় ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার লক্ষ্যে এ কাজ করা হয়। কিন্তু স্থানীয় সরকারে এমন চিন্তাভাবনা করার সুযোগ খুবই কম রয়েছে। কারণ এখানে দরকার এমন জনপ্রতিনিধি যার সমাজে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। যে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করবে। যার দ্বারা শুধু সমাজের একাংশ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবে না।
আমরা দেখেছি, স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকার বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়ন করে থাকে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা), বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন কাজ করে। যখন দেখা যায়, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করে একজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন তখন তিনি তার দলীয় লোকদের বেশি প্রাধন্য দেন। এতে প্রকৃত যারা এসব সুবিধা পাওয়ার দাবিদার তারা প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হয়ে থাকেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) একটি পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সালে যখন সর্বপ্রথম দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তখন নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা থেকে ফলাফল পরবর্তী সহিংসতা পর্যন্ত মোট ১৪৫ জন প্রাণ হারায়। পরবর্তী ২০২১-২২ সালেও প্রায় ২৭৪ জন নিহত হয়। এভাবে বিগত সময়ে দলীয় প্রতীকে সিটি করপোরেশন উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতায় দলীয় নেতাকর্মী এবং সাধারণ ভোটারদের মৃত্যুর পাশাপাশি হতাহতের সংখ্যাও কম নয়। এ জন্য সময় এসেছে স্থানীয় সরকারকে স্বশাসিত এবং স্বাধীন করার। যাতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষ ভোগান্তি ছাড়াই সেবা পেতে পারে।
আমরা আশা রাখি, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর এবং উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজন করবে। দল-মতের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষ যেন সম্মানিত এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিকে ভোট দিতে পারে। আর তার জন্য নির্দলীয় এবং প্রতীক ছাড়াই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, পাড়া-মহল্লা বা গ্রামের সমস্যাগুলো যখন স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে সমাধান করা যাবে তখন স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং সহজেই মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে যাবে।
শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা
সময়ের আলো/আআ