বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর বসা এই অধিবেশনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা ঘটেছে। আজকের অধিবেশনের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়েই এই আয়োজন।
স্পিকারের মাইকে ‘যান্ত্রিক বিভ্রাট’
অধিবেশনের শুরুতেই এক বিড়ম্বনাময় ও মজার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ যখন অধিবেশন শুরু করতে যান, তখন হঠাৎ তার মাইকে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পরও মাইক ঠিক না হওয়ায় তিনি হ্যান্ড মাইকে কথা বলেন এবং সবাইকে ধৈর্য্য ধরার আহ্বান জানান।
নতুন সংসদের প্রথম দিনেই এমন যান্ত্রিক গোলযোগ উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে হাসির উদ্রেক করে।
উল্লেখ্য, এর আগেও ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মাইক বিভ্রাটের কারণে ১ ঘন্টা সংসদ অধিবেশন বন্ধ ছিলো।
শূন্য চেয়ারে অধিবেশন শুরু
সংসদীয় ইতিহাসে বিরল এক দৃশ্য দেখা গেছে আজ। বিদায়ী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করায় এবং তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার কারাগারে থাকায় আজ স্পিকারের আসনটি খালি রেখেই অধিবেশন শুরু হয়।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের পর জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
গ্যালারিতে বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতি
আজকের অধিবেশনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সংসদের গ্যালারি। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
এছাড়াও সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবায়দা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানের উপস্থিতি উপস্থিত সদস্যদের নজর কেড়েছে।
স্পিকারের ‘নিরপেক্ষতা’র দৃষ্টান্ত
নতুন স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পরপরই মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ একটি দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি সংসদীয় নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রে তার এই অবস্থান সংসদীয় ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিরোধী দলের ‘ওয়াকআউট’
সংসদের ভেতরে প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন যখন ভাষণ শুরু করেন, তখন জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি (ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি)-র সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদ জানিয়ে কক্ষ ত্যাগ করেন। সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে এসে তারা বাইরের চত্বরে এবং মিডিয়া গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ‘জুলাইয়ের বিপ্লব’ এবং ‘জুলাই চার্টার’ নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন।
তাদের দাবি ছিল, বর্তমান প্রেসিডেন্টের ভাষণ দেওয়ার নৈতিক অধিকার নেই।
মির্জা আব্বাসের অনুপস্থিতি
মির্জা আব্বাস অসুস্থতার কারণে আজ সংসদে উপস্থিত থাকতে না পারলেও, স্পিকারের ঘোষিত সভাপতিমণ্ডলীর তালিকার শীর্ষে তার নাম থাকায় অনুপস্থিত থেকেও তিনি আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন।
বুধবার (১১ মার্চ) ইফতারের সময় পানি পান করার সময় হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় এই ঐতিহাসিক প্রথম অধিবেশনে তার আসনটি আজ শূন্য পড়ে থাকে।
মন্ত্রীর গাড়িতে সাইকেল আরোহীর ধাক্কা
প্রথম দিনেই সংসদের প্রবেশ মুখে এক মন্ত্রীর গাড়ির সাথে এক সাইকেল আরোহীর ধাক্কা লাগে। নিরাপত্তা কর্মীদের সামান্য অসতর্কতায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে, যার ভিডিও মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতি
সাদা শার্ট এবং নীল প্যান্ট পরিহিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন, তখন সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে তাকে উষ্ণ অভিবাদন জানান।
তিনি হাস্যোজ্জ্বল মুখে সবার দিকে তাকিয়ে নিজের আসনে বসেন।
সংসদে বড় পরিবর্তন
এবারের সংসদের ২৯৭ জন সদস্যের মধ্যে ২২৫ জনই প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। এত বিপুল সংখ্যক নতুন মুখের উপস্থিতি বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিদেশি কূটনীতিক ও বিশেষ অতিথির উপস্থিতি
দর্শক গ্যালারিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
তবে বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ গোলাম নাফিজকে বহনকারী রিকশাচালক নুর মুহাম্মদ, যাকে বিশেষ অতিথি হিসেবে সম্মান জানানো হয়।
শোক প্রস্তাব ও জাতীয় বীরদের স্মরণ
অধিবেশনের শুরুতে প্রয়াত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও জাতীয় বীরদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। এক মিনিট নীরবতা পালন শেষে মোনাজাত পরিচালনা করেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ।
শোক তালিকায় বেগম খালেদা জিয়া, মনমোহন সিং, পোপ ফ্রান্সিসসহ অনেকের নাম ছিল।
বিতর্কিত ও আলোচিত ব্যক্তিদের নামে নতুন শোক প্রস্তাব
সংসদ সদস্যদের বিশেষ অনুরোধে জুলাই অভ্যুত্থানের বীর আবু সাঈদ, মুগ্ধ, আবরার ফাহাদ এবং ফেলানীর নাম শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পাশাপাশি মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর মতো ব্যক্তিদের নামও নতুন করে যুক্ত করা হয়।
রাষ্ট্রপতির ভাষণে নাটকীয় মোড়
জামায়াত ও এনসিপির স্লোগানের মুখে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন কিছুটা ভড়কে গিয়েছিলেন এবং তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছিল। ঠিক সেই সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর টেবিল চাপড়ে তাকে সাহস জোগান।
সরকারি দলের এই জোরালো সমর্থনে রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে তার ভাষণ শেষ করতে সক্ষম হন।
সময়ের আলো/আরবিএন