ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রথম ধাক্কাই তুলে ধরছে যুদ্ধটির ভয়াবহ মাত্রা। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দেওয়া এক গোপন ব্রিফিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর মাত্র প্রথম দুদিনেই প্রায় ৫.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে মার্কিন বাহিনী।
বৃহস্পতিবারের বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার অনুযায়ী, বাংলাদেশি টাকায় দুদিনে ব্যয় করা এই অর্থের পরিমাণ ৬৮ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল ব্যয় শুধু যুদ্ধের তীব্রতাই নয় বরং আধুনিক যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতাও সামনে এনে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এত দ্রুত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, সামরিক ভান্ডারের চাপ এবং রাজনৈতিক বিতর্ক; সবকিছুকেই আরও জটিল করে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া এই আক্রমণের শুরুতেই হাজার হাজার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, কংগ্রেসে দেওয়া এক গোপন ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে যে যুদ্ধের প্রথম দুদিনেই শুধু অস্ত্র ব্যবহারের খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৫.৬ বিলিয়ন ডলার। এই ব্যয়ের বড় অংশই এসেছে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্র ব্যবহারের কারণে। সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যে ইরানের হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রথম ধাক্কায় হাজারো হামলা : মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম চার দিনের মধ্যেই দুই হাজারের বেশি অস্ত্র ব্যবহার করে প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ছিল তীব্র ক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র ও উচ্চপ্রযুক্তির বোমা।
সামরিক সূত্রগুলো বলছে, এই অভিযানে ব্যবহৃত অস্ত্রের মধ্যে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রও ছিল, যেগুলোর প্রতিটির মূল্যই অত্যন্ত বেশি।
কিছু সামরিক বিশ্লেষক বলছেন, এত বিপুলসংখ্যক ব্যয়বহুল অস্ত্র শুরুতেই ব্যবহার করা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভান্ডারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে প্রচুর অস্ত্র সরবরাহ করেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সামরিক সরঞ্জামের সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মানবিক ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ : ইরানের মানবাধিকার সংগঠন ও ত্রাণ সংস্থাগুলোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি হামলায় বিপুলসংখ্যক বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, হামলায় প্রায় ১০ হাজার বেসামরিক স্থাপনার মধ্যে আবাসিক ভবন, স্কুল এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ বলছে, নিহতের সংখ্যা এক হাজারের বেশি হতে পারে।
একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনাও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় এসেছে। ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলায় বহু শিশু নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। যদিও এই ঘটনার দায় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবে ঘটনাটি যুদ্ধের মানবিক মূল্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
যুদ্ধের খরচ প্রতিদিনই বাড়ছে : যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই সামগ্রিক ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরো অভিযানের দৈনিক খরচ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, প্রথম সপ্তাহেই মোট ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইতিমধ্যে কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে যে এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে ‘আমেরিকার যুদ্ধযন্ত্র’ : বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল ব্যয় ও ধ্বংসযজ্ঞ কেবল একটি নির্দিষ্ট সংঘাতের ফল নয় বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক নীতির প্রতিফলন। একাধিক গবেষক ও লেখক বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় শক্তি, প্রযুক্তি ও অর্থের বিশাল অংশ মূলত যুদ্ধ পরিচালনা এবং সামরিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান আক্রমণকে শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি বা আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তাদের যুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখা এবং সামরিক শক্তির প্রদর্শনও এই অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
ট্রুথআউটে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে নেগিন ওউলিয়াই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের বিশাল অংশ দীর্ঘদিন ধরেই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তিনি লিখেছেন, আমাদের যুক্তরাষ্ট্রে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে যে রাষ্ট্রের বিপুল সম্পদ, সক্ষমতা ও প্রযুক্তির এত বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের নিচে শিশুদের কবর দেওয়ার কাজেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
ওউলিয়াই আরও বলেন, বর্তমান সংঘাতকে শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বা আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। তার মতে, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
তার ভাষায়, এই যুদ্ধ কেবল ইরানের বিরুদ্ধে কোনো বিচ্ছিন্ন সামরিক অভিযান নয়; এটি সেই বৃহত্তর শক্তির রাজনীতির অংশ, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র পুরো অঞ্চলে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে চায়।
এফআর