পারিবারিক সহিংসতা একটি গুরুতর সামাজিক ও মানবাধিকার সমস্যা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে চলমান। যেভাবে উচ্চ রক্তচাপ ও বহুমূত্র রোগ আজ প্রায় প্রতিটি পরিবারে নীরব আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে, ঠিক তেমনি পারিবারিক সহিংসতাও সমাজ ও পরিবারের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউনাইটেড ন্যাশনাল পপুলেশন ফান্ড (ইএনএফপিএ) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) যৌথভাবে পরিচালিত ‘ভায়োল্যান্স এগাইন্সট উইম্যান সার্ভে, ২০২৪’ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় স্বামী বা সঙ্গীর দ্বারা শারীরিক, যৌন, মানসিক বা অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
জরিপের ফলাফল ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে প্রকাশ করা হয় এবং এতে দেখা যায় যে গত ১২ মাসেও প্রায় ৪১ শতাংশ নারী এই ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। জরিপে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে মোট ৭৫.৯ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যা দেশের নারী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নির্দেশ করে।
বিশ্বের গবেষণায়ও বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনকভাবে চিহ্নিত হয়েছে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ সংলগ্ন দেশগুলো পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে মূলত আইন প্রণয়ন, সুরক্ষা সেবা এবং সামাজিক সচেতনতা- এই তিনটি প্রধান কৌশল গ্রহণ করেছে। যেমন, ভারতে পারিবারিক সহিংসতা মোকাবিলায় প্রটেকশন অব উইম্যান ফ্রম ডমেস্টিক ভায়োল্যান্স অ্যাক্ট-২০০৫ কার্যকর রয়েছে, যেখানে শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং ভুক্তভোগীদের জন্য আদালতের মাধ্যমে সুরক্ষা আদেশ, বসবাসের অধিকার ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নেপালে- ডমেস্টিক ভায়োল্যান্স (অফেন্স অ্যান্ড পানিশমেন্ট) অ্যাক্ট-২০০৯ প্রণয়ন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, পাশাপাশি স্থানীয় কমিউনিটি ও নারী সংগঠনের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে প্রেটেকশন অব উইম্যান এগাইনস্ট ভায়োল্যান্স অ্যাক্টের মাধ্যমে নারীদের জন্য সুরক্ষা কেন্দ্র, হেল্পলাইন এবং আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যাতে নির্যাতনের শিকার নারীরা দ্রুত সহায়তা পেতে পারেন। শ্রীলঙ্কায় প্রিভেনশন অব ডমেস্টিক ভায়োল্যান্স অ্যাক্ট-২০০৫ অনুযায়ী আদালত থেকে প্রটেকশন অর্ডার প্রদান করে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রয়েছে। সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার এসব দেশ পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা, ভুক্তভোগীদের জন্য সহায়ক সেবা তৈরি করা এবং সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি, এই তিনটি দিককে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে, যা সহিংসতা কমাতে ভূমিকা রাখছে।
ডব্লিউএইচওর ২০০০-২০১৮ সময়ের প্রতিবেদনে ৬১টি দেশ ও অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে ১৫-৪৯ বছর বয়সি প্রায় ৫০ শতাংশ বাংলাদেশি নারী জীবনে অন্তত একবার সঙ্গীর দ্বারা শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বে প্রায় চতুর্থ সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। এ ধরনের তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের নারী অধিকার ও নিরাপত্তাবিষয়ক চ্যালেঞ্জকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
ইউনাইটেড ন্যাশনস পপুলেশন ফান্ড (ইউএনএফপি) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের তথ্য এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২১ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হন।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভিন্ন। ভারতে এই হার প্রায় ২৯-৩০ শতাংশ (জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য জরিপ, ২০১৯- ২০২১, পাকিস্তানে প্রায় ৩৪ শতাংশ (পাকিস্তান ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে, ২০১৭-১৮), নেপালে প্রায় ২৬-২৮ শতাংশ (নেপাল ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে, ২০১৬/২০২২) এবং শ্রীলঙ্কায় এই হার ২০ শতাংশের নিচে (ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে, ২০১৬)।
এই পরিসংখ্যানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পারিবারিক বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার হার তুলনামূলকভাবে বেশি, যা নারীর নিরাপত্তা, অধিকার এবং সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচিত। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতা একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা, যা নারীর মানবাধিকার, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক উন্নয়নের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতীয় জরিপগুলো দেখায় যে এই সমস্যা মোকাবিলায় আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
লিনা মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল। যে বয়সে তার খেলাধুলা আর পড়াশোনা করার কথা ছিল, সেই বয়সেই সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তিন সন্তানের মা হয় সে। সময়ের স্রোতে আজ তার বয়স ৪৪। হঠাৎ একদিন তীব্র পেট ব্যথায় লিনার স্বামী মারা যায়। সেই মানুষটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ- স্বামী, বন্ধু এবং মনের কথা বলার সঙ্গী। স্বামীর মৃত্যুর পর লিনার পৃথিবী পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়নি, কিন্তু আলোর মাঝেই যেন এক অন্তহীন মরুভূমিতে সে একা হয়ে পড়ে। দারিদ্র্য তাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী ছিল।
দিন এনে দিন খেয়ে চলা নিম্নবিত্ত জীবনে সন্তানদের শিক্ষা বা নিরাপদ ভবিষ্যৎ ছিল অপূর্ণ স্বপ্নের মতো। স্বামী চলে যাওয়ার পর সেই সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে ওঠে। জীবিকার তাগিদে লিনা নানা কাজ করতে শুরু করে, কখনো মানুষের বাড়িতে রান্না করা, কখনো দিনমজুরদের জন্য খাবার রান্না করা, আবার কখনো স্কুলে আয়ার কাজ। মানুষে ঘেরা এই পৃথিবীতেও লিনার কষ্ট বোঝার মতো কেউ নেই। একাকিত্ব তাকে ধীরে ধীরে রুক্ষ ও বদমেজাজি করে তুলেছে। সমাজের চোখে ৪০ পেরোলেই নারী যেন ‘বুড়ি’। নতুন করে ভালোবাসা বা জীবন শুরু করার অধিকার যেন তার নেই অথচ যদি পরিস্থিতি উল্টো হতো, স্বামী বেঁচে থাকত আর লিনা মারা যেত, তা হলে সমাজই হয়তো তাকে আবার বিয়ে করার পরামর্শ দিত। এই সমাজে পুরুষের একাকিত্বে সহানুভূতি থাকে, কিন্তু নারীর একাকিত্বে থাকে সন্দেহ ও সামাজিক নিষেধাজ্ঞা। লিনার শ্বশুরবাড়ি থেকে তাকে আর্থিক সহায়তা করার মতো তেমন উদ্যোগ কারও নেই, আবার তাকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করার মতো আপন মানুষের অভাব নেই।
জুলেখার বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১০ বছর আগে। বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় তার স্বামী কাজের জন্য কাতারে চলে যায়। তখনই জুলেখা অন্তঃসত্ত্বা ছিল। আজ তার মেয়ের বয়স ৮ বছর, আর জুলেখার বয়স মাত্র ২১। নিজের শৈশব পার হওয়ার আগেই সে মা হয়ে যায়। বিদেশে থাকার সময় তার স্বামী বিভিন্ন নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে দেশে জুলেখা শাশুড়ির গালাগাল সহ্য করে দিন কাটায়। স্বামীর ফোনও আসে বকাঝকার জন্য।
অবশেষে একদিন সে সিদ্ধান্ত নেয়, এই সম্পর্ক আর নয়। পরিবার রাজি না থাকলেও সে বিয়েবিচ্ছেদ করে এবং সন্তানের হাত ধরে নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করে। কিন্তু সমাজ তাকে সহজে গ্রহণ করেনি। তালাকপ্রাপ্ত নারী মানেই সমাজের চোখে ‘খারাপ মেয়ে’ এমন অপবাদ তার পিছু ছাড়েনি। কেউ কেউ তাকে ‘বেশ্যা’ বলেও অপমান করেছে। তবু জুলেখা থেমে থাকেনি। পোশাক কারখানায় কাজ করে সে সন্তানের মুখে অন্ন জোগায়। কিন্তু পরিবারের কাছ থেকে এখনও তাকে গালাগাল শুনতে হয়। জুলেখার অপরাধ একটাই সে মিথ্যা সম্পর্কের শিকল ভেঙে নিজের মর্যাদা বেছে নিয়েছে।
প্রজ্ঞা স্বনামধন্য একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবার থেকে আসা এই মেয়েটি প্রেম করে বিয়ে করেছিল। শুরুতে তাদের সংসার খুব সুন্দরভাবেই চলছিল কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতা বদলে যায়। প্রজ্ঞার স্বামী বন্ধুদের আড্ডা আর ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। অন্যদিকে শাশুড়ির ক্রমাগত হস্তক্ষেপ প্রজ্ঞার জীবনকে কঠিন করে তোলে।
প্রতিদিন ফোন করে শাশুড়িকে খোঁজ নেওয়ার পরও তাকে শুনতে হয় তিক্ত কথা। সংসার শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই সন্তান নেওয়ার চাপ আসে, যদিও তার স্বামী সে বিষয়ে অনাগ্রহী ছিল। ধীরে ধীরে দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল ধরে। একদিন তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তুমুল ঝগড়ার পর তার স্বামী বিচ্ছেদের কাগজ দিয়ে দেয়। দুই বছরের প্রেম আর তিন বছরের সংসার যেন মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়। পরে তার স্বামী আবার বিয়ে করে। অন্যদিকে প্রজ্ঞা একা হয়ে যায়। একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও অনেক পুরুষ সহকর্মীর কাছ থেকে তাকে অশালীন প্রস্তাব শুনতে হয়। এমনকি একা নারী হওয়ায় অনেকেই তাকে বাড়ি ভাড়া দিতেও চায় না।
হোসনেয়ারা মা-বাবার একমাত্র মেয়ে। অনার্স শেষ করে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়। স্বামী সমাজের একজন সম্মানিত ব্যক্তি। কিন্তু বিয়ের পর দেখা যায়, তার স্বামী প্রায় সারা দিন বাইরে থাকে এবং গভীর রাতে বাড়ি ফেরে। একসময় জানা যায় তিনি জুয়া খেলেন। অবশেষে পারিবারিকভাবে তাদের বিচ্ছেদ হয়। বছর না ঘুরতেই বাবা তাকে আবার বিয়ে দেন। কিন্তু দ্বিতীয় সংসারেও তাকে বারবার শুনতে হয় ‘তুমি তো তালাকপ্রাপ্ত নারী’। স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন তার জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায় অথচ হোসনেয়ারার চাওয়া ছিল খুব সাধারণ, স্বামীর সঙ্গে একটু সময় কাটানো, মাঝেমধ্যে কোথাও ঘুরতে যাওয়া। লিনা, জুলেখা, প্রজ্ঞা ও হোসনেয়ারা- চারজন ভিন্ন মানুষ, কিন্তু তাদের গল্প একই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
আমাদের সমাজে এখনও অসংখ্য নারী আছে- বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা বা তালাকপ্রাপ্ত যাদের একাকিত্বকে সমাজ সম্মানের মোড়কে বন্দি করে রাখে। কিন্তু সেই সম্মানের আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর নিঃসঙ্গতা, বৈষম্য এবং অবহেলার দীর্ঘ ইতিহাস। এই সমস্যা শুধু নারী বা পুরুষের নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যা। সংসার মানে শুধু দায়িত্ব নয়, পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান এবং সহমর্মিতা।
যতদিন না আমরা এই মানসিকতা বদলাতে পারছি, ততদিন এগুলো আমাদের সমাজের প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) যৌথভাবে পরিচালিত ‘ভায়োল্যান্স এগাইন্সট উইম্যান সার্ভে, ২০২৪’ অনুযায়ী বাংলাদেশের নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জরিপে দেখা যায়, নারীদের জীবনের কোনো পর্যায়ে সহিংসতার অভিজ্ঞতা অর্জনের জাতীয় হার ৭৫.৯ শতাংশ, যেখানে গ্রামীণ এলাকায় হার ৭৬ শতাংশ এবং শহুরে এলাকায় ৭৫.৬ শতাংশ। আঞ্চলিকভাবে বরিশাল অঞ্চলে এই হার সর্বোচ্চ (৮১.৫ শতাংশ) এবং সিলেটে সর্বনিম্ন (৭২.১ শতাংশ)। নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার হারও উল্লেখযোগ্য, জাতীয়ভাবে এটি ২৯ শতাংশ। আঞ্চলিকভাবে বরিশাল (৩৫.৭ শতাংশ) এবং চট্টগ্রামে (৩৪.১ শতাংশ) বেশি, আর ময়মনসিংহ (২৩ শতাংশ) ও রংপুর (২৬.৬ শতাংশ) তুলনামূলকভাবে কম।
শহরাঞ্চলে নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার হার ৩১.১ শতাংশ এবং গ্রামীণ এলাকায় ২৮ শতাংশ। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের নারীরা বিভিন্ন আঞ্চলিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে নানা রকম সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা সমাজে নারী নিরাপত্তা এবং সমতা বৃদ্ধির জন্য যথাযথ নীতিমালা ও সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। অন্যদিকে পুরুষদের ওপর পারিবারিক নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান বাংলাদেশে খুবই সীমিত কারণ অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক কারণে পুরুষরা এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ করেন না।
পারিবারিক সহিংসতা শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও ঘটতে পারে। কিন্তু সমাজে অনেকেই পারিবারিক সহিংসতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না। অনেকে মনে করেন এটি মূলত পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে ঘটে, তবে প্রকৃত সত্য হলো, আমরা কখনো কখনো একটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে অন্য বিষয়কে অগ্রাহ্য করি। ঠিক যেমনটি প্রচলিত প্রবাদ বলে-‘আঙুলে সমস্যা হলে হাত কেটে ফেলা।’ সমাজের অনেক সমস্যা যদি আমরা উপেক্ষা করি বা চাপা দিয়ে রাখি, তখন তা সময়ের সঙ্গে আরও প্রকট আকার ধারণ করে।
পারিবারিক সহিংসতা শুধু পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করে না, এটি সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মানসিক স্বাস্থ্যও এর থেকে মুক্ত নয়। এ থেকে বিভিন্ন অরাজকতা জন্ম নেয়-পরিবারে দ্বন্দ্ব, পারস্পরিক অবিশ্বাস, মাদকাসক্তি, নারীর নিরাপত্তাহীনতা ও শালীনতা হ্রাসের মতো সমস্যা দিন দিন বাড়ছে।
সুতরাং পারিবারিক সহিংসতা একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক সমস্যা এবং এর প্রভাব প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হয়। সমাজকে সচেতন ও সক্রিয়ভাবে এই বিষয়টির মোকাবিলা করতে হবে। পারিবারিক সহিংসতা বলতে পরিবারের বা ঘরোয়া পরিবেশে কাউকে শারীরিক, মানসিক, যৌন বা আর্থিকভাবে ক্ষতি করা বোঝায়। এর মধ্যে শারীরিক সহিংসতা যেমন মারধর, ঠেলা, ছুরিকাঘাত বা গুরুতর আঘাত অন্তর্ভুক্ত, মানসিক সহিংসতা যেমন হুমকি, অপমান বা সামাজিক লজ্জা প্রদানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা, যৌন সহিংসতা যেমন জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক বা শিশু ও কিশোরদের প্রতি অযাচিত যৌন আচরণ এবং আর্থিক সহিংসতা যেমন পরিবারের অর্থ ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে নির্ভরশীল করে রাখা বা শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা।
বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনগত কাঠামো রয়েছে। বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী মারধর, চোট বা প্রাণহানির চেষ্টা শাস্তিযোগ্য এবং পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ) আইন, ২০১০ যৌন ও শারীরিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করে। আইন অনুযায়ী আক্রান্ত ব্যক্তি নিরাপত্তা আদেশ, অবস্থান পরিবর্তন বা আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন। যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এবং শিশু অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০১৩ প্রযোজ্য। আক্রান্ত ব্যক্তি থানায় অভিযোগ দাখিল, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আদালতে মামলার মাধ্যমে সুরক্ষা ও ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন।
পারিবারিক সহিংসতা শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সংঘাত, বিয়েবিচ্ছেদ বা স্বামী কর্তৃক পরিত্যাগের ফলে শিশুরা গভীর মানসিক চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। এর ফলে তাদের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণভাবে অন্ধকারে নিমজ্জিত না হলেও তারা সামাজিক পরিবেশে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে, যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশ ও সফল জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে।
দেশে প্রতি দশ শিশুর মধ্যে প্রায় ৯ জনই পরিবারের সহিংস পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় (সূত্র : ইউনিসেফ বাংলাদেশ, স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ড‘স চিলড্রেন, ২০২১)। এ ছাড়া নারী সমাজে স্বামী বা সহবাসিকের সহিংসতার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সাধারণ; প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার এই ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন (সূত্র : ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ, ভায়োল্যান্স এগাইন্সট উইম্যান সার্ভে, ২০২৪)।
পারিবারিক সহিংসতার অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে এর মোট সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ১৪,৩৫৮ কোটি টাকা হিসেবে নিরূপণ করা হয়েছে, যা দেশের জিডিপির প্রায় ২.১০ শতাংশ সমান (সূত্র : কেয়ার বাংলাদেশ, ইকোনোমিক অ্যান্ড সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট স্টাডি অব ডোমেস্টিক ভায়োল্যান্স, ২০২০)। এ ধরনের সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতি সৃষ্টি করে না, বরং পরিবারের উৎপাদনক্ষমতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণকেও হ্রাস করে।
সামাজিক ও মানসিক দিক থেকেও পারিবারিক সহিংসতা মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এর ফলে শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিক্ষার সুযোগ কমে যায়, এবং পরিবারে সামাজিক সম্পর্কের ভাঙন দেখা দেয় (সূত্র : উইম্যানস এইড, দ্য ইমপ্যাক্ট অব ডোমেস্টিক এবিউস, ২০১৯)। ফলে পারিবারিক সহিংসতা শুধু ব্যক্তি ও পরিবারকেই নয়, সমগ্র সমাজকেও প্রভাবিত করে।
আর্থিক সহায়তা প্রায়ই হাল ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতেও এটি প্রায়ই চোখে পড়ে। পরিবারের আর্থিক সংকটের সময় স্বামী বা স্ত্রী একে অন্যকে সহযোগিতা করেন। কিন্তু যখন আর্থিক চাপ বা দৈন্যতা কমতে থাকে, তখন দেখা যায় যে প্রায়শই পুরুষই প্রতারণার পথ বেছে নেন।
যারা এই প্রতারণার শিকার হন, তাদের জন্য এর প্রভাব অত্যন্ত দুঃখজনক। শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, সময়ের অপচয় এবং মানসিক স্বাস্থ্যও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়। এই ক্ষতির ভার অনেক সময় নারীদের ওপর বেশি পড়ে। অনেক নারীর অভিযোগ রয়েছে, ‘আমার কষ্টার্জিত অর্থ এবং পরিশ্রম তার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে ব্যবহার করেছি। নিজের সব স্বপ্ন ও শখ ত্যাগ করেছি। অথচ আজ সে অন্য নারীর কাছে চলে গেছে বা পরিবারের কাছে আমি ‘খারাপ’ হিসেবে উপস্থাপন হয়েছি। এই কারণে আমাকে আমার মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে।’এমন পরিস্থিতিতে, শূন্য হাতে নতুন করে শুরু করা সহজ নয়।
পারিবারিক সহিংসতা একটি গভীর সামাজিক সমস্যা হিসাবে থেকে যাচ্ছে এবং এর মানসিক ও জীবনগত প্রভাব অনেকের জীবনে চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানসিক ও জীবনগত চাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে কিছু নারী ও পুরুষ জীবনের প্রতি আশা হারিয়ে আত্মসমর্পণ বা আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন এমন তথ্য বিভিন্ন গবেষণা ও রিপোর্টে উঠে এসেছে।
৩ জানুয়ারি ২০২৪ প্রকাশিত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে ২০২৩ সালে নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ২ হাজার ৯৩৭টি ঘটনা ছিল এবং ২৪১টি আত্মহত্যাসহ সহিংসতায় আক্রান্তদের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি ছিল; একই সঙ্গে ১৪ জন ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে (নিউজিবিডি.নেট, ২০২৪). এ ছাড়া ৬ নভেম্বর ২০২৫‑এর এখন টিভির প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে পারিবারিক কলহ ও সহিংসতায় মোট ৪৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছে, যেখানে এটি লক্ষ করা যায় এমন পরিস্থিতিতে অনেক নারী মানসিক চাপ ও সহিংসতার কারণে নিজেকে শেষ করার পথ বেছে নেয়, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে ৩৯ জন ব্যক্তি পারিবারিক অত্যাচারের ফলে আত্মহত্যা করেছে, যেখানে ১৪৯ জন নারীকে স্বামী দ্বারা হত্যা করা হয়েছে, যা মানসিক ও সামাজিক চাপের গম্ভীর চিত্র তুলে ধরে- এসব প্রামাণ্য তথ্য নির্দেশ করে যে পারিবারিক সহিংসতা শুধু শারীরিক ক্ষতি করে না দীর্ঘ সময়ের মানসিক অত্যাচার অনেকের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং কিছু ক্ষেত্রে জীবন শেষ করার মতো কঠিন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
২০১৯-২০২৩ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে ২ হাজার ৬০৩ জন নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন এবং এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা মানসিক চাপ ও সহিংসতার দীর্ঘতর প্রভাবের কারণে চরম সিদ্ধান্তে গিয়েছিলেন, যা ২০২৪ সালের এপ্রিল ৩০ পর্যন্ত গবেষণা করে প্রকাশিত হয়েছিল (মাশরুফস ব্লগ ৩০ এপ্রিল, ২০২৪)। এ ছাড়া ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি অনলাইন রিপোর্টে বলা হয়েছে গত বছর দেশে পারিবারিক সহিংসতায় মারা যাওয়া নারীদের মধ্যে কিছু ঘটনার পেছনে মানসিক অত্যাচার ও সহিংস পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রতি বছর নভেম্বরের ১৬ তারিখ থেকে ডিসেম্বরের ৯ তারিখ পর্যন্ত বিশেষ দিন পালন করা হয়। এ ছাড়া ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়। সমাজে নারী ও পুরুষ উভয়ই উপস্থিত থাকেন, যেভাবে আমরা নারী দিবস উদযাপন করি, তেমনি বিশ্ব পুরুষ দিবসও পালিত হলেও তা যথাযথ গুরুত্ব পায় না। পুরুষদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের বিষয়ও সমাজে তেমন আলোচিত হয় না।
আমি মনে করি, নারী ও পুরুষ-উভয় মিলেই একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ গঠিত হয়। পরিবারের মধ্যে নারীর পাশাপাশি পুরুষকেও সচেতন করা জরুরি। পুরুষ দিবস পালন করে তাদের করণীয় ও দায়িত্ব সম্পর্কে মানুষকে জ্ঞাত করা এবং নারী দিবসে পুরুষদের অন্তর্ভুক্ত করা সমাজে সহিংসতা নামক সামাজিক ব্যথা কমানোর একটি কার্যকর পন্থা হতে পারে।
ঠিক যেমন আঙুলের সমস্যায় হাত না কেটে সঠিক চিকিৎসা নিয়ে হাতকে সুস্থ করা যায়, তেমনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে প্রতিহত করার পাশাপাশি নারীদের ভেতরেও যারা পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব সম্পন্ন নারী রয়েছেন তাদের প্রতিহত করা দরকার এবং পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এ ছাড়া সমাজে নারী-পুরুষ উভয় যাতে ন্যায়বিচার পায় সেদিকে কঠোরভাবে মনিটরিং করা।
আদালত পাড়ায়, থানায় কোনো নাগারিক যাতে সেবা পেতে হয়রানি না হয় পাশাপাশি যে অভিযোগগুলো সালিশির মাধ্যমে সমাধানযোগ্য তা বিলম্ব না করে সমাধান করা ও জেলা আদালতগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে কঠোর ভূমিকা পালন করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখক : সহযোগী গবেষক ও উন্নয়নকর্মী
সময়ের আলো/কেএইচও